ছোটদাদু বললেন, ক্যালকুলেটেড রিস্ক নেওয়া চলে, ডেয়ারডেভিল হওয়া ঠিক নয়। অকারণে নিজেকে বিপদে ফেলে বোকারা। এগিয়ে চল। বেলা বেড়ে যাচ্ছে।
তোরা না থাকলে আজ আমি এই নদীগর্ভেই দিন কাটাতুম। জল এলে আমার কী হত, ভেসে চলে যেতুম। মৃত্যুকে ভয় পেলে জীবনকে উপভোগ করা যায় না।
মৃত্যুকে ভয় না পেলেও জেনেশুনে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাওয়া বোকামি। আত্মরক্ষার পথ খোলা রেখে বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। জল এসে গেলে এই অবস্থায় আমাদের পালাবার কোনও রাস্তা নেই। ওরা যখন বলে গেল তখন আমাদের সাবধান হওয়াই উচিত। সাধ করে মরে লাভ কী! সে তো আত্মহত্যার সামিল।
হরিশঙ্কর বললেন, মৃত্যু থাকলে মৃত্যু হবে। তা বলে এমন একটা দৃশ্য ছেড়ে ভয়ে পালাব! ওরা কী জানে?
ওরা স্থানীয় লোক। আমাদের চেয়ে বেশিই জানবে।
ক্ষুণ্ণ হরিশঙ্কর হাটা শুরু করলেন। ছোটদাদু বললেন, তোর কাণ্ড দেখে আমার একটা গল্প মনে পড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণের গল্প। একটা হাতি আসছে। হাতির পিঠে মাহুত। সামনে একটি লোক পড়েছে। হাতির পিঠ থেকে মাহুত চিৎকার করছে, সাবধান! সাবধান! লোকটি শুনেছিল, সমস্ত জীবই নারায়ণ। হাতিও নারায়ণ। নারায়ণ তার ক্ষতি করবে কেন? লোকটি মাহুতের কথায় কান দিল না। হাতি এল। শুড় দিয়ে তুলে এক আছাড়। প্রায় মরোমরো। একজন এসে বললেন, বাবা, সবাই নারায়ণ এই জ্ঞানই যদি তোমার হয়েছে, তা হলে মাহুত নারায়ণের কথা কেন শুনলে না? তোকেও বলি, ওয়ার্নিং শুনতে হয়। এখন গোঁগো করে বাকি পথটুকু হেঁটে চল। এখানে দ্রুত পলায়ন ছাড়া আর কোনও বিজ্ঞান আপাতত নেই।
হরিশঙ্করের এই পলায়নটা তেমন পছন্দ হল না। তার মুখ দেখেই বোঝা গেল। হঠাৎ বললেন, চাঁদের আলোর রাতে এই ধুধু বালির বিস্তারে আসন পেতে বসতে হয়। সামনে জ্বলবে ধুনি। আর সেই গান, শ্মশান ভালবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি।
ছোটদাদু বললেন, ওই গান তো তোমার ভাল লাগার কথা নয়। নেগেটিভ গান। মৃত্যুর ইঙ্গিত আছে।
হরিশঙ্কর বললেন, মৃত্যুর মতো মহান কিছু আছে! এমন একটা চলে যাওয়া, যা একেবারে একশো ভাগ সত্য। একশো ভাগ নিশ্চিত। কোনওভাবেই আর ফেরা যাবে না। থাকা আর না-থাকার মধ্যে সময়ের ব্যবধান বাড়তেই থাকবে, ক্রমশই অনন্তে গিয়ে ঠেকবে। জার্নি টু ইনফিনিটি। এই একটা কারণেই মৃত্যু আমার কাছে ভীষণ আকর্ষণীয়। সব চলার শেষ আছে, এ চলার শেষ নেই। জীবনই এই পথে পৌঁছে দেয় বলে জীবনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
তা হলে তুই আমার সঙ্গে চল, দ্বারকা নদীতে আমরা বসব আসন করে। অমাবস্যার রাতে। প্রহরে প্রহরে শেয়াল ডাকবে। মড়ার মাথায় বাতাস হাহা করবে। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। অচেনা দিগন্তে ভ্রমণের মতো।
দুজনে কথা বলছেন। আমি কিন্তু ভয়ে ভয়ে ডাইনে-বামে তাকাচ্ছি। কোন বাঁক থেকে জল ছুটে আসবে তা তো জানি না। হঠাৎ দেখি ডান দিকে বহু দূরে সাদা একটা ঢেউয়ের মতো কী ফুলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমি চিৎকার করে উঠলুম, জল আসছে।
দুজনেই সচকিত হয়ে তাকালেন। হরিশঙ্কর হাহা করে হেসে উঠলেন, আরে ওটা একটা কাপড়। দু’জনে দু’পাশ থেকে একটা কাপড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলেছে। কাপড় শুকুতে শুকুতে চলেছে। এটা জলের নদী, দুধের নদী নয়। জল এত সাদা হয় না।
অবশেষে আমরা নদীর গর্ভ ছেড়ে পাড়ে উঠে এলুম। দোকানপাট, মানুষজনের হইচই। ধড়ে প্রাণ ফিরে এল। শরীর আর চলছে না। মনে হচ্ছে ধড়াস করে শুয়ে পড়ি। যেমন তৃষ্ণা, সেইরকম খিদে। ছোটদাদু মনে হয় আমার মনের তরঙ্গ ধরতে পারলেন। বললেন, এইখানে একটা ভাল দোকান দেখে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নেওয়া যাক। একটু বিশ্রামেরও দরকার। বেশ পরিশ্রম হয়েছে।
হরিশঙ্কর বললেন, ভাত খাওয়া চলবে না। হোটেলের ভাত আমি অ্যালাউ করব না।
ভাত কে খেতে চাইছে! শুকনোশাকনা।
কোনও দোকানই মনে ধরে না। পরিচ্ছন্নতার অভাব। হঠাৎ হরিশঙ্কর বললেন, হোয়াট এ ফুল! বাড়ির বাইরে এসে বাড়ির সুখ খুঁজছি, মূর্খ আমরা। যে-কোনও দোকানে ঢুকে যা খুশি তাই খাব আমরা। কোনও বাছবিচার করব না। একটা জিনিস ভেবে দেখেছিস, যেখানে যাচ্ছি আমরা, সেখানে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হলে কোনও পাকা ব্যবস্থা নেই!
ছোটদাদু বললেন, খুব জানি। প্রকৃতির কাজ প্রকৃতিতেই সারতে হবে। মাঠ আর পুকুর। আর লজ্জা! নিজের চোখদুটো বন্ধ করে রাখো। আমাকে দেখো, আমি তো দেখছি না।
হরিশঙ্কর সদর্পে একটা আটচালায় ঢুকে পড়লেন। সবই আছে সেখানে। অদ্ভুত চেহারার মিষ্টি। গুড়ের রসে পাক করা কালচে রঙের বেসনের লাড্ড। ঠান্ডা জিলিপি। টক দই। প্রচুর মুড়ি। চিড়ে। ভেলিগুড়। মনমরা তেলেভাজা। এক ঝাক মাছি ছাড়া কারওকেই তেমন আনন্দিত উৎফুল্ল মনে হল না।
দোকানের মালিক পরিচ্ছন্ন খদ্দের পেয়ে বেশ উৎসাহিত হলেন। প্রমাণ মাপের একটা গামছা পরে বসে ছিলেন। নিজেকে একটু গোছগাছ করে বললেন, সবরকমের ব্যবস্থাই আছে। চিঁড়ের ফলার করতে পারেন মণ্ডা দিয়ে। এক ছড়া কলা আনিয়ে দিচ্ছি।
তেড়াবাঁকা কালোকালো লাড্ডগুলোর নাম মণ্ডা। এই অঞ্চলের লোকপ্রিয় মিষ্টান্ন, মণ্ডামেঠাই।
হরিশঙ্কর বললেন, আজ আমরা একাদশী করতে চাই।
আজ্ঞে বাবু আজ যে চতুর্দশী, পূর্ণিমা।
তাতে কী হয়েছে, একাদশী মানে আটাদশী। গরম লুচি কুমডোর ছক্কা, হতে পারে? হবে না কেন, অর্ডার দিলেই হবে। মোহনের অসাধ্য কিছু নেই। একটা হুংকার ছাড়লেন, বিমলা!
