ছোটদাদু বললেন, যে-সাধনের যা নিয়ম তা তো আমায় করতেই হয়েছে গুরুর নির্দেশে। সিদ্ধাই এসেই পড়ে, যেমন বৃষ্টিতে দাঁড়ালে মানুষ ভেজে। আটটা সিদ্ধিও আমার এসেছে-অনিমা লঘিমা ব্যাপ্তি কাম্য মহিমা ঈশিত্ব বশিত্ব কামাবসায়িতা, এই হল অষ্টসিদ্ধি; কিন্তু আমি প্রকাশ করি না। সবই আমার আছে, প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষ ভয় পেয়ে যাবে। যেমন ধর অনিমা, আমি নিজেকে ছোট করতে করতে একেবারে অদৃশ্য করে ফেলতে পারি গুরুর কৃপায়। ব্যাপ্তি, সেটাও এসেছে। বিশালও করে ফেলতে পারি নিজেকে। নিজেকে ভারী করে ফেলতে পারি পর্বতের মতো।
আমি আবার লাফিয়ে উঠলুম, ছোটদাদু অনিমাটা একবার দেখাবেন?
হরিশঙ্কর ধমকে উঠলেন, কী ভেবেছ তুমি? এটা কি যোগের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস? যাও, তোমার কাজে যাও।
ছোটদাদু বললেন, তোমার যখন আকাঙ্ক্ষা এত প্রবল, সাধনভজনে চলে এসো না?
হরিশঙ্কর বললেন, ঈশ্বর কে চায়, সবাই চায় ম্যাজিক! ও প্রসঙ্গ বাদ দে, এখন প্রস্তুত হবাঁকুড়ায় যাওয়ার জন্যে। সেখানেই দেখা যাবে তোর অনিমালঘিমাদি অষ্টসিদ্ধি। আজই গেলে কেমন হয়?
না আজ নয়। আজ আমাদের দিন ভাল নয়। কাল হল উৎকৃষ্ট দিন।
২.৩৬ জন্ম-জরার ঝরাধানে ফোটে নয়ন-চারা
বহুকাল পরে একটা অজ গাঁ দেখার সুযোগ পাওয়া গেল। হাঁটছি তো হাঁটছিই। সামনে বিশাল দামোদর। এখন তেমন জল নেই। ধুধু বালি। সামান্য জল চিকচিক করছে কোথাও কোথাও। বালির নদী দেখলে বুকটা কেমন করে ওঠে। আতঙ্ক হয়। আবার নদীর নাম যদি হয় দামোদর, তা হলে তো কথাই নেই। দামোদর নদীনয় নদ। দুঃখ-নদ। নদীতে নামার আগে তিনজনেই থমকে দাঁড়ালুম।
পরম সাহসী হরিশঙ্কর বললেন, একটাই ভয়, চোরাবালি। চোরাবালিতে পড়লে আর রক্ষে নেই।
ছোটদাদু বললেন, স্থানীয় মানুষ যারা পার হচ্ছেন তাদের অনুসরণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
হরিশঙ্কর বললেন, তা হলে চল কপাল ঠুকে নেমে পড়ি। এখানে তোর অলৌকিক বিদ্যা কাজে লাগবে না। লৌকিক বিদ্যাই ভরসা। সে বিদ্যার নাম অনুসরণ। ওই যে তিনজন যেখান দিয়ে যেভাবে নামছে, আমরাও সেইভাবে নেমে পড়ি।
ঢালু গড়ানে পাড় বেয়ে ছোট ছোট আগাছা মাড়িয়ে আমরা নেমে এলুম নীচে। সঙ্গে সঙ্গে আকাশ উঠে গেল অনেকটা উঁচুতে। সাদা বালি প্রখর রোদে ঝলসাচ্ছে। চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। সামনে, পেছনে, ডাইনে, বামে শুধু বালি আর বালি। নিজেকে মনে হচ্ছে ছোট্ট একটা পুতুল। হাতের দিকে তাকালুম, মনে হল পোড়া কাঠ। এত কালো দেখাচ্ছে। সামনের তিনজন পরপর যেমন চলেছেন, আমরাও ঠিক সেই কায়দায় চলেছি। পাশাপাশি নয়। একের পিছনে আর এক। রোদে মাথার চাঁদি ফেটে যাচ্ছে। নেশার মতো লাগছে। বালির নেশা। সবার আগে হরিশঙ্কর, তারপর আমি, আমার পেছনে ছোটদাদু। ভয় একমাত্র আমারই করছে, কারণ আমি ভিতু। হরেক রকমের আশঙ্কায় কণ্ঠতালু শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ যদি বান আসে, সেই বিখ্যাত দামোদরের বান, তা হলে কী হবে? কীভাবে প্রাণে বাঁচব? ফসফসে থসথসে বালিতে তো দৌড়োতে পারব না। এই প্রথম অনুভব করলুম, পথ না থাকলে পথ চলা কত অস্বস্তিকর। পথহারা। পথিক আমরা। কোনও ধরাবাঁধা নেই। কেউ পথ পেতে না রাখলে চলার সুখ কীভাবে হারিয়ে যায়! বাঁ পাশে পড়ে আছে বিশাল এক গোরুর কঙ্কাল। হাড়ের আঁচায় বাতাস বইছে ঝুমঝুম শব্দে। মৃত্যু যেন ঘুঙুর পায় নাচছে।
আমরা যখন মাঝামাঝি এসে গেছি, সামনের তিনজনের মধ্যে একজন বললেন, আজ বোধহয় ড্যাম থেকে জল ছাড়বে।
হরিশঙ্কর বললেন, শুনছিস?
ছোটদাদু বললেন, আর শুনে কী হবে? আমরা এখন মাঝনদীতে। এপারও যত দূরে ওপারও তত দূরে। জল ছাড়লে ডুবে মরতে হবে।
কথা শুনে, মরার আগেই আমি মরে গেলুম। পায়ের জোর কমে এল। বালির নদী এঁকেবেঁকে ডাইনে-বামে নিজেকে খেলিয়ে দিয়েছে। মহাতঙ্কের মহাসংকীর্তন যেন নেচে নেচে চলেছে। বুগযুগ একটা শব্দ কানে এল। কে যেন আলগোছে জল খাচ্ছে। দেখি, সামনেই বালির মধ্যে একটা গর্ত, সেখানে জল ফুটছে। উঠছে, ঢুকছে, ঢুকছে, উঠছে।
হরিশঙ্কর থেমে পড়লেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মুখে চোখে অসীম কৌতূহল। ছোটদাদু স্মরণ করিয়ে দিলেন, ওরা তিনজন কিন্তু অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আজ জল ছাড়তে পারে।
হরিশঙ্কর সে কথায় কান না দিয়ে বললেন, সায়েন্সটা কী? ব্যাপারটা কী হচ্ছে! ও বুঝেছি, ক্যাপটিভ ওয়াটার। বালির তলায় জল আটকে আছে। রোদ আর বালির গরমে ফুটতে শুরু করেছে। এ দেশে কেন যে সোলার এনার্জিকে কাজে লাগায় না! জলের টেম্পারেচারটা হাত দিয়ে দেখব?
ছোটদাদু বললেন, কী দরকার তোর? ওখানে চোরাবালিও থাকতে পারে।
চোরাবালি নেই। তলায় একটা হার্ড সারফেস আছে। তা না হলে জল জমত না।
তুই এখন দয়া করে এগিয়ে চল।
তোরও ভয় করছে?
আমি ঠান্ডা বাতাসের গন্ধ পাচ্ছি, তার মানে জল আসছে। ওই দেখ সেই তিনজন মানুষ দুরে বিন্দুর মতো হয়ে গেছে। আমাদের পেছনে আর কেউ নেই।
হরিশঙ্কর এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন, দেখে বললেন, ভয় আর বিপদ নিয়ে খেলা করতে আমি ভীষণ ভালবাসি। ও দুটো আমার প্রিয় খেলনা। যারা ভয় পায় তাদের আরও ভয় দেখাতে ভীষণ মজা লাগে, আজ সেই সুযোগ এসেছে। আহা! প্রকৃতির কী ভয়ংকর রূপ! মাথার ওপর অসীম অনন্ত ফিকে নীল আকাশ। বালির বিশাল নদী খেলে খেলে চলে গেছে এপাশ থেকে ওপাশে। প্লাবনের আতঙ্কে ভরা পরিমণ্ডল। এমন পরিবেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ না করে চলে যাব!
