অবশ্যই। কালই চলো বেরিয়ে পড়ি অসুর নিধনে।
একটা ব্যাপারে আমাদের সাবধান থাকতে হবে, সেটা হল সংযম। এমন কিছু করব না, যাতে থানা-পুলিশ হয়। অ্যাবসলিউট সংযম।
অ্যাবসলিউট। প্রথমে আমরা ভয় দেখাব। তাতে না হলে লোভ দেখাব। লোভ দেখিয়ে বের করে আনব, তারপর আমাদের এলাকায় এনে দাঁড়া হুল, সব ঘেঁটে দেব।
তোর অলৌকিক কিছু করবি নাকি?
এই অলৌকিক শব্দটা সম্পর্কে আমার সামান্য আপত্তি আছে। তোর কাছে যা অলৌকিক আমার কাছে তা ভীষণ স্বাভাবিক। তুই অবিশ্বাসী, তোকে বোঝাতে হলে বিজ্ঞানের রাস্তায় যেতে হবে। যেমন ধর, একটা দেশলাই কাঠি। দেখলে বোঝা যায় আগুন আছে? যায় না। এইবার বারুদের গায়ে ঘষো, ফাঁস! এটা কি অলৌকিক! কিছু শক্তি ধারণ করা যায় বৎস! একটু সাধনা করলেই হয়। তুই যে এসরাজ বাজাস, ওটা কি অলৌকিক? কেউ দশ সেকেন্ড দম বন্ধ করে থাকতে পারে না, আমি দশ মিনিট পারি। আমি অভ্যাস করেছি। আমি প্রাণায়াম করে আসন ছেড়ে ভেসে উঠতে পারি, আমি পারি। কেন পারি, কীভাবে পারি, তা আমি কী করে বলব! প্রবল ইচ্ছাশক্তিতেই পারি হয়তো। ত্রৈলঙ্গস্বামী সারাটা দিন কাশীর গঙ্গায় পদ্মফুলের মতো ভেসে বেড়াতেন। হাঁস জলে ভাসে, পাখি আকাশে ওড়ে, এর মধ্যে অলৌকিক তো কিছু নেই। সেই আর্ট আমার আয়ত্তে এসেছে গুরুর কৃপায়। আমি কী করতে পারি! এখনই দেখবে, বিনা চেষ্টায় আমার ভেতর থেকে কোন অনাহত শব্দ বেরোবে? ঠোঁট ফাঁক হবে না, নড়বে না, বুক পেটে কোনওরকম আন্দোলন হবে না। সেই শব্দে ঘরের সমস্ত জিনিস কাপবে। তোমাদের শরীর শিরশির করবে। শুনতে চাও?
হরিশঙ্কর কিছু বলার আগে আমিই লাফিয়ে উঠলুম। আজ্ঞে হ্যাঁ।
হরিশঙ্কর বললেন, অকাল্টের দিকে এর খুব ঝোঁক।
ছোটদাদু চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে নেমে বসলেন পদ্মাসনে। দেহ স্থির। চোখ নিমীলিত। প্রথমে আকাশের অনেক উঁচু দিয়ে এক ঝাঁক প্লেন উড়ে গেলে যেরকম শব্দ হয়, সেইরকম শব্দ শুরু হল। তারপরেই উঠল সেই ভয়ংকর শব্দ, একটানা। কোনও ছেদ নেই। টানেলের ভেতর দিয়ে রেলগাড়ি যাচ্ছে। গোমুখে গঙ্গার অবতরণ হচ্ছে। একটা দড়িতে ছোট একটা লোহার পাত বেঁধে কেউ বনবন। করে ঘোরাচ্ছে। একাক্ষর শব্দ, ওঁ। হচ্ছে তো হচ্ছেই। কী তার রেজোনেন্স। ঘরের সমস্ত জিনিস চিনচিন করে কাঁপছে। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে ঝংকার হচ্ছে। মনে হচ্ছে পাউডার হয়ে যাব।
হরিশঙ্কর বললেন, স্টপ ইট। স্টপ ইট।
ধীরে ধীরে শব্দ স্তব্ধ হল। ছোটদাদু আবার চেয়ারে ফিরে এলেন।
হরিশঙ্কর বললেন, এ হল সাউন্ড স্প্যাজম। নাদ-সাধনায় এটা হয়।
ছোটদাদু বললেন, আমি এটা সাধনায় পেয়েছি, বাঘ পেয়েছে জন্মসূত্রে। যে-কোনও বাঘই এটা পারে। শব্দটা একটু অন্যরকম হবে। বাঘের ভাষায় হবে, কিন্তু সাউন্ড-কোয়ালিটি এক। এটা কি অলৌকিক?
না। এটা টেকনোলজি।
এখন দেখো, এই শব্দের পিচ যদি আমি আরও বাড়াই, এই ঘরের সবকিছু ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো?
করি। অনেক সময় প্লেনের শব্দে আলমারির কাঁচ ভেঙে যায়।
আমি এইরকম কিছু ভেলকি দেখাতে চাই ওখানে। অলৌকিক নয় তবে হাইলি-টেকনিক্যাল। তোর আপত্তি আছে?
না। সে তুই করতে পারিস। সাউন্ডকেই অনেক ভাবে ব্যবহার করা যায়, যেমন ভেনট্রিলোকুইজম।
সে বিদ্যাটাও আমার আয়ত্তে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে চেপে ধরলুম, ছোটদাদু একবার, কখনও শুনিনি।
বলামাত্রই শুনলুম, নীচের রাস্তা থেকে কে আমার নাম ধরে ডাকছে। বোকার মতো রাস্তার দিকের জানলায় ছুটছিলুম। ছোটদাদু হেসে ফেললেন। ওপাশে রান্নাঘরের দিক থেকে কে বললেন, ওদিকে নয় এদিকে এসো।
হরিশঙ্কর বললেন, বাঃ, বেশ ভালই আয়ত্ত করেছিস। দিস ইজ অ্যান আর্ট।
ছোটদাদু বললেন, তোর কন্ট্রোলে এইরকম কিছু আছে?
নাঃ, আমার কন্ট্রোলে আছে শক্তি। আমি মেঘের মতো হাসতে পারি। বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠতে পারি। হাতির মতো সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিতে পারি। আবার একটু একটু করে সব গড়ে তুলতে পারি। আমি কখনও শ্মশানের চিতা, কখনও উনুনের আগুন। জীবন আর মৃত্যুর সীমানায় মহাকালের দোলকের মতো দোল খাচ্ছি।
ছোটদাদু বললেন, তোমার একটা জিনিস হয়, রঙের পরিবর্তন। কখনও ছাইয়ের মতো ধূসর, কখনও লোহার মতো কালো, কখনও রক্তের মতো লাল, কখনও মঠের মতো সাদা।
শুনেছি বটে, তবে কোনওদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখিনি। মনের ভাবের সঙ্গে রঙের পরিবর্তন হয়। আমার ভিতরে মনে হয় বহুরূপীর মশলা আছে। স্কিনের পিগমেন্টেশন পালটে যায়। বলে না! রেগে লাল। আমি হয়তো সত্যিসত্যিই লাল হয়ে যাই। মনের ভাব অনুসারে। আমার দেহের উত্তাপ বাড়ে কমে। পঁচানব্বই থেকে একশো এক চলাফেরা করে। এর কোনওটাই বিভূতি নয়। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, ভাই! অষ্টসিদ্ধির একটা সিদ্ধি থাকলে আমায় আর পাবে না। তোমার একটু শক্তি হতে পারে, এই মাত্র! গুটিকা সিদ্ধি, ঝাড়ানো, ফেঁকানো, দাওয়াই। তবে লোকের একটু উপকার হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, সিদ্ধাইয়ের জন্যে লোক পঞ্চ-মকার তন্ত্রমতে সাধন করে। কিন্তু কী হীনবুদ্ধি! সিদ্ধাই থাকলে মায়া যায় না, মায়া থেকে আবার অহংকার। কী। হীনবুদ্ধি! ঘৃণার স্থান থেকে তিন টোসা কারণবারি খেয়ে লাভ কী হল? না মোকদ্দমা জেতা! তুই তো এইসব করেছিস!
