ডাক্তার কেঁদে ফেললেন। একটা তালগোল পাকানো মাংসপিণ্ডের মতো হয়ে গেলেন। অতিকষ্টে বললেন, আমাকে বাঁচান।
ছোটদাদু বললেন, বাঁচানো যায় না, তবে সহ্যশক্তিটা বাড়িয়ে দেওয়া যায়, টলারেন্স। ফুটবাথের মতো। ভীষণ গরম জল। ধীরে ধীরে সহ্য করার শক্তি বেড়ে গেলে আর পা ডুবিয়ে বসে থাকতে অসুবিধে হয় না। সহজ ব্যাপার। এর জন্যে কী করতে হবে? স্লেটের সব লেখা সাত্ত্বিক ন্যাকড়া দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। ত্যাগ আর তিতিক্ষার পেনসিল দিয়ে ফোঁটাতে হবে নতুন বর্ণমালা।
সেই ডাক্তার এখন দাদুর প্রধান শিষ্যদের একজন। বেশিরভাগ সময় আশ্রমেই থাকেন। শান্ত সমাহিত এক নতুন মানুষ। এইরকম অজস্র ঘটনা আছে দাদুর জীবনে। একবার একদল গুন্ডা। কালীপুজোর রাতে দাদুকে মারতে এসেছিল। সামনে গিয়ে দু’হাত তুলে দাঁড়ালেন। সব স্থাণু। কেউ আর নড়েও না চড়েও না। শেষে ছোটদাদু বললেন, আচ্ছা! তা হলে তোমরা এইবার যাও। একটা মৌন মিছিল ধীরে ধীরে চলে গেল। সব যেন নেশায় বুঁদ।
হরিশঙ্কর মুখে না বললেও এই ঘোটদাদুকেই গুরু বলে মেনে নিয়েছেন। হরিশঙ্কর অলৌকিক কিছু বিশ্বাস করেন না। বিশ্বাস করেন বিজ্ঞান, কর্ম, সাধনা আর পবিত্র জীবন। বিয়ে করে কেউ সংসারে ঢুকলে আক্ষেপ করে বলেন, যাঃ হয়ে গেল। জীবনের ডানা ভেঙে গেল। ছোটমামা বিয়ে। করেননি, সেটা একটা পয়েন্ট। বিয়ে তো করেননি, অনেকে বিয়ে না করেও নারীসঙ্গের জন্যে ছেকছেক করেন, ছোটমামা তা করেন না। কামজয়ী সাধক। পয়েন্ট দুই। তিন নম্বর, প্রবল সাধনভজন করেন। চার নম্বর, পবিত্র জীবনযাপন, কদাচারী তান্ত্রিক নন। পরমাশক্তির উপাসক। ছোটদাদুকে আমি শ্রদ্ধা করি, কারণ তিনি আমাকে ভয়ংকর ভালবাসেন। আমার চোখের সামনে তুলে ধরেন আমার ভবিষ্যৎ মহৎ জীবনের ছবি। কেবল বলেন, তুমি কী হবে তুমি নিজেই জানো না। আমার সব হতাশা সব দুর্বলতা ঝরে যায়, একটা আকাঙ্ক্ষা জাগে। শ্রদ্ধার দ্বিতীয় কারণ, আমি তার মধ্যে অলৌকিক শক্তির বিকাশ দেখেছি। সেটা কী, তার মধ্যে বিজ্ঞান আছে না তন্ত্র আছে না ম্যাজিক আছে আমার জেনে দরকার নেই। ছোটদাদুকে প্রশ্ন করেছি। তিনি হেসে বলেছেন, সাধনাই সব। সেইটাই দেখবে। বিভূতির দিকে নজর দেবেনা। অমন হয়। সাধনভজন করলে সকলেরই হবে।
সেই ছোটদাদু বসে আছেন দক্ষিণের জানলার দিকে পেছন ফিরে, হাতলঅলা চেয়ারে। সামনে একটা গোল কাঠের টেবিল। মুখোমুখি বসে আছেন হরিশঙ্কর। আমি ঘুরঘুর করছি। হঠাৎ হরিশঙ্কর টেবিলে একটা আঙুল ঠুকে বললেন, হোয়াই? ক্যান ইউ টেল মি হোয়াই? কেন এমন হবে? আমরা মানবই বা কেন?
দুজনেই সমবয়সি। একই সঙ্গে লেখাপড়া করেছেন, তাই তুই-তোকারির সম্পর্ক।
ছোটদাদুও হরিশঙ্করের প্রশ্নের প্রতিধ্বনি করলেন, হোয়াই। কেন মানব আমরা! আমাদের অধিকার কেন ছাড়ব? হোয়াই!
হরিশঙ্কর আর একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, দ্যাটস রাইট। একজন মহিলা যেই বিধবা হবে, অমনি পুত্র-কন্যা সমেত তাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে দূর করে দেওয়া হবে কেন? বাঙালির এ কী অসভ্যতা! প্রতিবাদ করা হয় না বলে, বেড়েই চলেছে, বেড়েই চলেছে। আমরা তা হলে কী করতে আছি! উই মাস্ট ফাঁইট। জীবনটা বড় শান্ত হয়ে আসছে। বহুকাল বড় ধরনের কোনও মারামারি হয়নি। এখনও দশ-বিশটা লোকের মহড়া নিতে পারি। ছোটদাদু খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, লাস্ট কবে মারামারি করেছিস?
তা বছর দশেক হল। কলকাতার ময়দানে গোটা পাঁচেক বাঁদরকে দিনকতকের জন্যে শুয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলুম।
তোর টেকনিকটা কী?
বেধড়ক ঘুসি আর যুযুৎসুর প্যাঁচ, রদ্দা।
আমি আবার কুস্তির লাইনটা প্রেফার করি। একবারে মাথার ওপর তুলে বারকতক ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিই। মহাভারতের স্টাইলটাই আমার হাতে খোলে ভাল। দুটো পা ধরে ফেঁড়ে ফেললুম, কি মুণ্ডটা ঘুরিয়ে দিলুম। ঝামেলা অনেক কম। সময়ও অনেক কম লাগে।
তুই লাস্ট কবে করেছিস?
পরশু দিন। তারাপীঠের শ্মশানে। খুব মাস্তানি করছিল। সবকটাকে ল্যাংটা করে রামপুরহাটে পাঠিয়ে দিলুম।
বেশ করেছিস। দু-একটাকে নিরামিষ করে দিতে পেরেছিস?
হ্যাঁ, পালের গোদাটার মনে হল সবকটা দাঁতই ঝরে গেছে।
মানুষের মধ্যে পশুও আছে দেবতাও আছে। সব এক ট্রিটমেন্ট হলে তো হবে না। পশুদের শায়েস্তা করার জন্য প্রয়োজন পশুবলের। ধর্মের কথা, জ্ঞানের কথা, সদুপদেশ, কিছুই কিছু হবে না। মায়ের নাম করো, মায়ের নাম, তারা শালা বলে তেড়ে আসবে। যেমন রোগ তার তেমন দাওয়াই হওয়া উচিত। ভূত ছাড়াতে ওঝার ঝাটা। গ্রীক মাইথোলজিতে আছে সেন্টর-এর কল্পনা, যার আধখানা পশু আর আধখানা মানুষ। মানব-দানব কমবাইন্ড। তিনি আবার শিক্ষক। রাজপুত্রদের গুরু। ভবিষ্যৎ রাজা কী শিখতেন? দানবদলনে দানব হবে, মানবপালনে দেবতা হবে। আমাদের নৃসিংহ-অবতার! সেই একই কল্পনা। আমাদের দশ মহাবিদ্যা। ত্বং কালী তারিণী দুর্গা সোড়শী ভুবনেশ্বরী/ ধূমাবতী ত্বং বগলা ভৈরবী ছিন্নমস্তকা ॥ ত্বমন্নপূর্ণা বাগদেবী ত্বং দেবী কমলালয়া/ সর্বশক্তি-স্বরূপা ত্বং সর্বদেবময়ী তনুঃ ॥ আমাদের দশাবতার– মীন, কূর্ম, শূকর, নরহরি, বামন, ভৃগুপতি, ক্ষত্রিয়-রুধিরময়ে, রঘুপতি, হলধর, বুদ্ধ, কল্কি। কী কনসেপশন! জগৎ যেমন, শাসনও ঠিক তেমন। কী, তুই আমার সঙ্গে একমত তো?
