কোথায় পড়বে? বাইরে?
না, দেহের থলের মধ্যেই।
বাবা, এটা তো জানা ছিল না। কোন ডাক্তারি শাস্ত্রে লেখা আছে জয়?
সব কি আর শাস্ত্রে থাকে চাটুজ্যেমশাই? কিছু থাকে মানুষের বিশ্বাসে। চামচিকি হল ইল-ওমেন। অশুভকারী।
হরিশঙ্কর বললেন, চামচিকি হল আত্মা। সেকথা জানো কি? হয়তো কোনও ভাল সোল এসেছিল। তুমি তাকে উপেক্ষা করলে।
জয়নারায়ণ শিশুর মতো মুখের ভাব নিয়ে তাকিয়ে রইলেন হরিশঙ্করের দিকে।
২.৩৫ জীব আজ সমরে
সিল্ক টুইলের সাদা ধবধবে শার্ট। গলার একেবারে ওপরের বোতামটা পর্যন্ত টাইট করে লাগানো। একমুখ পান। বেঁটেখাটো হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। সামনে সিঁথি। বসে আছেন হরিশঙ্করের ছোটমামা। অকৃতদার। তন্ত্রসাধক। বেশিরভাগ সময় তারাপীঠেই থাকেন। শবসাধনা করেছেন। অলৌকিক শক্তির অধিকারী। বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যাবে না। যারা অন্তরঙ্গ তারা ভয় আর ভক্তি দুটোই করেন। একটু খোঁচাখুঁচি যিনিই করেছেন তিনিই মরেছেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনেরই একটা গোপন দিক থাকে। সর্বসমক্ষে তার গোপনীয়তা উন্মোচিত হলে লজ্জার একশেষ। এই সাধক তার অহংকার চূর্ণ বিচুর্ণ করে দেন, তখন আর তিনি পালাবার পথ পান না। এঁর অন্তর্দৃষ্টির সামনে সবাই কাঁচের মানুষ। আমার সামনেই কতবার এমন ঘটনা ঘটেছে।
একবার এক বড় ডাক্তার এসেছেন খোঁচাখুঁচি করতে। সন্দেহবাদী, অলৌকিকে বিশ্বাস নেই। বিলিতি ডিগ্রিধারী। বিশাল পসার। এসেছেন শক্তি পরীক্ষা করতে। খুব দগদগে কথা বলছেন, শবসাধনা? কী আছে মশাই শবে! জাস্ট এ ডেডবডি। বরং একটা কঙ্কালের প্রয়োজনীয়তা আছে। অ্যানাটমির ছাত্রের কাজে লাগে। অমন ডেডবডি আমরা বহুবার ডিসেক্ট করেছি। তা হলে তো । আমরাও অলৌকিক শক্তির অধিকারী, কী বলেন মিস্টার ব্যানার্জি?
ছোটদাদু মিচকি হাসছেন।
ডাক্তার বলছেন, আমাদের ধর্ম থেকে এই বুজরুকিটা না গেলে শিক্ষিত লোক কোনওদিনই ভিড়বে না। বোকা আর অশিক্ষিত মানুষরাই এই ফঁদে পা দেবে। গুরুদের এই ব্যাবসাদারি ক্রিমিনাল অফে।
ছোটদাদুর মুখে পান ছিল। ছিবড়েটা ফেলে মুখ খালি করলেন। ভঁজ করা সাদা রুমালে পাতলা ঠোঁটদুটো সাবধানে মুছলেন। প্রস্তুত হচ্ছেন। আমরা যারা জানি, বসে আছি থম মেরে। পরিচিত
যে-ভদ্রলোক ডাক্তারবাবুকে এনেছেন তিনি মহা বিব্রত।
ছোটদাদু বললেন, কেন এসেছেন?
ডাক্তার বললেন, খুব প্রচার আপনার, মুখ দেখে মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেন!
ছোটদাদু বললেন, তিনটেই জানতে চান, না চারটে? ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান এই নিয়ে ইহকাল, তারপর একটা আছে পরকাল।
ডাক্তার বললেন, পরকাল তো একটা আজগুবি গল্প, যা বলবেন তাই মানতে হবে! ইহকালটাই হোক। তবে তাই হোক, বলে ছোটদাদু অদ্ভুত হাসলেন। এক টিপ নস্যি নিলেন। এইবার জামার পকেট থেকে একটা রুমাল বেরোল। খাড়া খঙ্গের মতো নাক। নাক মুছলেন, তারপর বললেন, অফিসের ক্যাশ ভেঙে জেলে যেতে হচ্ছিল, আত্মহত্যা করলেন, তারপর মামার বাড়িতেই মানুষ। মামাদের প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতা জানালেন মামাতো বোনটিকে নষ্ট করে। ভালই করেছেন। কিন্তু আপনার এমন স্বাস্থ্য, পারেন না কেন? ইমপোটেন্ট হয়ে পড়েছেন। স্ত্রী তো অন্যভাবে অন্য লোকের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছে। ডিসগ্রেসফুল। রোজগার তো কম নয়, জীবনের শান্তি কোথায় ডাক্তার? আমাকে পরীক্ষা না করে নিজেকে পরীক্ষা করান। ফিজিশিয়ান হিল দাইসেলফ। নিজের স্ত্রীকে অন্যের সঙ্গে দেখতে ভাল লাগে ডাক্তার? ডিসগ্রেসফুল। মাত্রাতিরিক্ত সেলফ অ্যাবিউজের ফল। বউ এখন ব্ল্যাকমেল করছে। সো স্যাড। আপনারই পয়সা অন্যের জন্যে দু’হাতে ওড়াচ্ছে। ছেলেটা যে আপনার নয় সে আপনি ভালই জানেন। বাবা বলে যখন ডাকে লজ্জা পান, তাই না ডাক্তার?
ডাক্তার স্তম্ভিত। মুখ কালো। মাথা হেঁট। শেষে কাঁদোকাঁদো অবস্থা।
ছোটদাদু বলেই চলেছেন, আপনার বাড়ির উত্তর দিকের হলদে বাড়ির ফরসামতো ছেলেটা এখন আপনার স্ত্রীর ইজারা নিয়েছে। অতীত আর বর্তমানের একটুখানি হল, এইবার ভবিষ্যৎ। পাঁচ বছরের মধ্যেই আপনার স্ত্রী পাগল হয়ে যাবে। আর যে আপনার ছেলে বলে পরিচিত, সে । আপনাকে বাড়ি ছাড়া করবে। ভবিষ্যতের দিকে আর একটু এগোই? আপনার পার্কিনসনস ডিজিজ হবে। সেটা কী নিশ্চয় জানেন। ভেবে দেখো, শেষের সেদিন কী ভয়ংকর! কেন এমন হবে! প্রারব্ধ। কেন এমন হবে? তামসিক অহংকার হল আপনার ঘোড়ার জকি। সে যেমন চালাচ্ছে, তেমনি চলছেন আপনি। টাকার গরম, পসারের গরম, মোসায়েবদের মালিশ আর আলগা চরিত্রের কিছু মহিলা দিলে সর্বনাশ করে। এরপর ময়লা বিছানায় শুয়ে থরথর করে কাপবেন। কাপড়েচোপড়ে মাখামাখি। পাশে থাকবে একজন, সে আপনার বিধবা বোন, যাকে আপনি এখন বাড়ি ঢুকতে দেন না। আর কিছু জানতে চান ডাক্তার? সামথিং কংক্রিট? অ্যান্ড হিয়ার ইট ইজ। আপনার কাছে এখন তিন হাজার সাতশো কুড়ি টাকা বারো আনা আছে। দুটো মরফিনের অ্যাম্পুল আছে, সন্ধেবেলা আপনার নিজেরই লাগবে। গাড়িতে এক বোতল বিলিতি হুইস্কি আছে। নোংরা ছবির বই আছে। একটা। আরও গভীরে যাব? আপনার প্রাইভেট পার্টসে সম্প্রতি একটা ঘা হয়েছে। ওপাশে ক’দিন হল পাইলস খুব ভোগাচ্ছে। ফিসচুলার দিকে যাচ্ছে। আরও চাই ডাক্তার? এনিথিং মোর ইউ। ওয়ান্ট!
