শুনব না? আপনার হাই টেস্ট। তা কালই যাবেন ঠিক করছেন?
না না, আমরা একটা ব্যাবসা করার পরিকল্পনা করছি। ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি।
জয়নারায়ণ লাফিয়ে উঠলেন, উঃ, সেই কারণেই বলে গ্রেট মেন থিঙ্ক অ্যালাইক। আমিও সেই কথাই ভাবছি বেশ কয়েক মাস ধরে। আসুন তা হলে লেগে পড়ি। মিউজিক্যাল ইনমেন্ট। হারমোনিয়ম তৈরি হবে। স্কেলচেঞ্জ, কাপলার। টিউনিংটা আমি ভালই পারব। কোম্পানির নাম হবে চ্যাটার্জি ফুট। রিডে মাদার অফ পার্লস। বেলোয় রুপোর পাতের ডেকরেশন। এক একটা হারমোনিয়ম বেরোবে যেন ওয়ার্ক অফ আর্ট। সুর ঝরবে ঝরনাধারার মতো।
মিউজিক্যাল ইনমেন্টস পারবে না জয়। ওর জন্যে একটা ট্র্যাডিশন গড়ে তুলতে হয়। একটা হাউস। তোমাদের গানের ঘরানার মতো বাদ্যযন্ত্রেরও ঘরানা আছে। সেই ট্র্যাডিশন গড়ে উঠতে উঠতেই আমরা ভবসাগরের পারে চলে যাব।
তা হলে আর কী করা যাবে? জয়নারায়ণের উৎসাহ ভেঙে পড়ল।
হরিশঙ্কর বললেন, আমার মাথায় একটা এসেছে। সেটা আমার লাইন। পারফিউমস।
মানে সেন্ট! জয়নারায়ণ নড়েচড়ে বসলেন, তা হলে আমি হব পাবলিসিটি অফিসার। যেসব আসরে যাব গায়ে মেখে যাব। একেবারে মাত হয়ে যাবে। সবাই জিজ্ঞেস করবেন, কী মেখেছেন? কোথায় পাওয়া যায়? ওয়াইড পাবলিসিটি। নাম রাখা হবে সমীরণ। নাঃ বাংলা নাম চলবে না। ইংরিজি নাম রাখতে হবে। প্রাইভেট অ্যাফেয়ারস, সিক্রেট টাচ, অ্যাফেকশন, কিস, এইসব।
হরিশঙ্কর মৃদু হাসছেন, বললেন, এ পারফিউম সে পারফিউম নয় স্যার। এ হবে স্পেশ্যাল ব্লেন্ড। বড় বড় সাবান কোম্পানি, পাউডার-স্নো কোম্পানি, এমনকী ওষুধ কোম্পানিও এই ব্লেন্ড কিনবে। তারাই ব্যবহার করবে। এর বেশির ভাগটাই এখনও বিদেশ থেকে আসে। বম্বেতে একটা মাত্র প্রতিষ্ঠান হয়েছে। এই ব্লেন্ডিং একটা মস্ত বড় আর্ট। জানেনা তো পারফিউমকে ফিক করতে হয়।
মানে? সুগন্ধী কি ফার্নিচার যে ফিকস করতে হবে?
ভাল পারফিউম মানে শুধু ভাল গন্ধ নয়, লাগাবার পর অনেকক্ষণ যেন গন্ধটা থাকে। লাগালুম আর সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গেল, তা যেন না হয়। এর জন্যে প্রয়োজন হয় ফিকসেটিভের। বেড়ালের নাড়িভুড়ি থেকে তৈরি হয় সিভেট। সিভেট, স্যান্ডাল এইসব হল ফিকসেটিভ। যাক, এইসব আলোচনা অর্থহীন। আমরা ভাবছিলুম ডক্টর রায়ের কাছে একবার যাব আমাদের এই পরিকল্পনা নিয়ে। তোমার কী মত?
খুব ভাল হবে। ওয়ান্ডারফুল।
তুমি এখন চললে কোথায় সেজেগুজে?
সুরঞ্জনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। বাড়ি যাবে বলছে।
এই যে বললে আজ থাকবে, রাতে আমার কাছে বসবে অঙ্ক নিয়ে।
মেয়েদের মত তত মিনিটে মিনিটে বদলায়।
ওকে ডেকে আনন।
সুরঞ্জনা এল। কোনও সাজগোজই নেই। এলোমেলো হয়ে আছে। মাতুল জয়নারায়ণের মতোই। লম্বা। চেহারার ধার কী! তরোয়ালের মতোই। সুরঞ্জনাকে দেখলে আমার লজ্জা আসে নিজের ওপর। যেমন স্মার্ট, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত। আমি এক ম্যাদামারা। বাসী লুচি। ভিজে দেশলাই। শরীরে একটু শক্তি এলেই নিজের সংস্কারে লেগে যাব। সাদা ফিনফিনে শাড়ি, হালকা হলুদ রঙের ব্লাউজ।
হরিশঙ্কর বললেন, তুমি চলে যাচ্ছ?
কই না তো! কোথায় যাব? বাড়িতে তো কেউ নেই। এই জমজমাট বাড়ি ছেড়ে কেউ যেতে পারে? আনন্দের হাটবাজার।
জয়নারায়ণ বললেন, কী বলেছিলুম আপনাকে? মিলিয়ে নিন।
হরিশঙ্কর সুরঞ্জনাকে বললেন, যাও। এই প্রশ্ন করার জন্যেই ডেকেছিলুম। তোমরা কী করছ?
আমরা কাকিমার গল্প শুনছি। কিছু বলবেন? কিছু করতে হবে?
জয়নারায়ণ বললেন, করতে হবে না? চা না খেয়ে কতক্ষণ থাকা যায়? এক রাউন্ড হয়ে যাক।
সুরঞ্জনা বললে, আর কিছু? চায়ের সঙ্গে কোনও টা?
নো টা। সিম্পল চা।
সুরঞ্জনা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। এই মেয়েটির প্রতি হরিশঙ্করের একটা মমতা জন্মেছে বেশ বোঝাই যাচ্ছে। বোধহয় বিজ্ঞানের ছাত্রী বলে। কিংবা বন্ধুকন্যা বলে। মুকুর ওপর এই স্নেহটা কিন্তু আসেনি। মুকুর দুর্ভাগ্য।
আমরা তিনজনেই থম মেরে বসে আছি। হঠাৎ খোলা জানলা দিয়ে হুস করে একটা চামচিকি ঢুকে ঘরের মধ্যে পাক মারতে লাগল। বোমারু বিমানের মতো। জয়নারায়ণ সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে খসে পড়লেন মেঝেতে। পারলে খাটের তলায় ঢুকে যান। হরিশঙ্করের দৃষ্টি জয়নারায়ণের দিকে। গভীর আগ্রহে দেখছেন আরও কী করতে পারে। কত দূর যেতে পারে। চামচিকির যা স্বভাব। উন্মাদের মতো ঘরময় লাট খাচ্ছে। জয়নারায়ণের ঘাড় নিচু। মাথার ওপর দু’হাতের আড়াল।
হরিশঙ্কর বললেন, যতটা নিরাপদ ভাবছ নিজেকে ততটা নিরাপদ জায়গা ওটা নয়। মাঝে মাঝে ডাইভ মারছে। তুমি বুকে হেঁটে খাটের তলায় গেলে ভাল করতে। তার আগে অবশ্য ভেবে নাও, কোনটা তোমার ভাল লাগবে, চামচিকির লাথি না আরশোলার খোঁচা!
জয়নারায়ণ করুণ কণ্ঠে বললেন, আমার এই বিপদের মুহূর্তে আপনারা কোনও সাহায্যেই আসছেন না! চামচিকির ব্যালে দেখছেন।
হরিশঙ্কর বললেন, আর দেখাচ্ছে কোথায়? সবচেয়ে সমঝদার দর্শক যাকে ভেবেছিল তার এই দশা দেখে লজ্জায় ঘরের আকাশ ছেড়ে বাইরের আকাশে ফিরে গেছ। তুমি এইবার ভূমিতল ছেড়ে চেয়ারতলে ফিরে আসতে পারো। তোমার অমন সাদা ধবধবে ধুতি ময়লা হয়ে গেল।
জয়নারায়ণ ঘাড় তুলে সাবধানে চারপাশ দেখতে দেখতে বললেন, আত্মরক্ষার সময় জামাকাপড় তুচ্ছ হয়ে যায় চাটুজ্যেমশাই। চামচিকির লাথি খেলে কী হয় জানেন? অস্টিওম্যালাইটিস। হাড়ে চুন জমে সব গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পড়ে যায়।
