একটু নড়েচড়ে বসতে হল। এখনই ঠিক করে ফেলতে হবে জীবন আমার কোন পথে চলবে। বিদ্রোহী হওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। একটা ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করতেই হবে। এ ছাড়া আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। বেশ জোর গলায় বললুম, আমি আপনার সঙ্গেই আছি। বলুন আমাকে কী করতে হবে?
হরিশঙ্কর স্থির চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আমিও তোমার সঙ্গে আছি। আমাদের দুজনকেই আবার সংসারে ঢুকতে হবে। অন্যের সংসারে। আমি পুরুলিয়ার ঝালদায় গালা দিয়ে একটা রিসার্চ শুরু করেছিলুম। ফল সংরক্ষণে গালার ব্যবহার। গালার সঙ্গে রং মিশিয়ে ল্যাক পেন্ট, যা দিয়ে শিল্পীরা ছবিও আঁকতে পারবেন। আর চেয়েছিলুম চাচগালা তৈরি করতে গিয়ে যেসব কর্মীর দু’হাতের আঙুল ক্ষয়ে গিয়ে পঙ্গু হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসন। মিশনারিরাই আমাকে সাহায্য করছিলেন, আমার সেই কাজটা বন্ধ হয়ে যাবে। এখানেই আমাকে একটা কিছু করতে হবে। কোনও ব্যাবসা কি ছেলে পড়ানো। এ জীবনে বড় কিছু আর করা গেল না। স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।
না, তা হবে না। আপনি যা শুরু করেছেন শেষ করুন। আমি একাই টানব।
কী করে? তোমাকে তো দেরাদুনে যেতে হবে।
বলে কয়ে কলকাতাতেই থাকব। প্রোমোশনের দরকার নেই।
তা হয় না। আমি জীবন শেষ করতে চলেছি, তুমি চলেছ শুরু করতে।
আচ্ছা এমন হয় না, আমরা সবাই পুরুলিয়ায় সেটল করলুম। আপনার কাজে আমিও সাহায্য করলুম। আমাকে ওঁরা মাইনে দেবেন না?
পিন্টু, এ-ও এক ধরনের কর্মসন্ন্যাস। এটা ঠিক চাকরি নয়। সেবা।
তা হলে আসুন আমরা দুজনে মিলে এখানেই একটা কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রি করি। আপনার বহুদিনের স্বপ্ন। ছেলেবেলায় আমাকে বলতেন, কারও দাসত্ব যাতে করতে না হয় সেই চেষ্টা কোরো। আমি পারিনি। তোমার মধ্যে আমি আমার স্বপ্নের রূপায়ণ দেখতে চাই। আসুন না, আমরা একটা পরিকল্পনা তৈরি করি। কত কী-ই তো করা যায়। অনেকেই তো অনেক কিছু করছেন।
এইরকম একটা ইচ্ছে আমারও হচ্ছে। সাত্ত্বিক থেকে রাজসিক।
আপনি চেষ্টা করলে অসম্ভবও সম্ভব হবে। আপনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন। আমার অনেক কল্পনা আপনাকে ঘিরে। আপনি একজন বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হয়েছেন। কত মানুষ কাজ করছেন আপনার প্রতিষ্ঠানে। সাদা অ্যাপ্রন পরে নিজের ল্যাবরেটরিতে নিজের কাজ করছেন আপনি। চোখে সোনার চশমা। এই বাড়িটা ভেঙে নতুন একটা বাড়ি হয়েছে। চারপাশে সুন্দর বাগান। গ্যারেজে সাদা রঙের ঝকঝকে একটা গাড়ি। মাঝে মাঝেই আপনি বিলেতে যাচ্ছেন। বিদেশিরা আসছেন আপনার প্রতিষ্ঠানে। সুন্দর একটা অফিস। টাইপরাইটারের খটখট শব্দ। কেমিকেলসের গন্ধ।
উত্তেজনায় আমি ঘরে পায়চারি শুরু করলুম। একটা কিছু করতে হবে। নিজেদের জন্যে, অন্যের জন্যে। এপাশ থেকে ওপাশ, ওপাশ থেকে এপাশ। মনে হচ্ছে আমিই হরিশঙ্কর। যত পাক মারছি ততই মনে হচ্ছে আমি বড়লোক হয়ে যাচ্ছি, লাখোপতি, কোটিপতি। হালকা লাগছে শরীর। সব বিষণ্ণতা কেটে যাচ্ছে। ঘরের আলোর পাওয়ার বাড়ছে। তখন আমি ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রাখব। ড্রেসিংগাউন পরে বাথরুম থেকে বেরোব। স্লিপিং সুট পরে নেটের মশারিতে শোব।
হরিশঙ্কর বললেন, এইবার তুমি একটু স্থির হয়ে বসতে পারো। প্রায় মাইলখানেক পায়চারি হল। ইন্ডাস্ট্রি ইজ নট ওয়াকিং। লোকে হজমের জন্যে বেড়ায়।
আমার ভেতরে একটা শক্তি আসছে। ডু আই মাস্ট।
ইংরেজি ভাষার একটা শক্তি আছে, কিন্তু আমাদের কিছু করতে হলে করতে হবে বাংলায়। তুমি বোসো। দেখো ডক্টর রয় এখন চিফ মিনিস্টার। আমাকে একটু পছন্দও করেন। কংক্রিট একটা স্কিম তার সামনে ফেলতে পারলে টাকার অভাব হবে না।
আমার আর তর সইছে না, বললুম, কালই তা হলে চলুন।
দরজার কাছ থেকে জয়নারায়ণ বললেন, না না কাল কী করে যাবেন? এখনও দিন সাতেক আমাকে কলকাতায় থাকতেই হবে। রেকর্ডিং আছে, রিহার্সাল আছে। ট্রেনের টিকিট কেটে রিজার্ভেশন করতে হবে।
জয়নারায়ণ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আমার কথার শেষটা শুনেছেন। প্রথম দিকটা শুনতে পাননি। ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি, কঁচি ধুতি। হরিশঙ্কর বললেন, চললে কোথায়? বরযাত্রী?
জয়নারায়ণ বললেন, ড্রেস দেখে বলছেন? বেশি মিহি হয়ে গেছে, তাই না?
ভেতরের গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে। একটু অবসিন হয়ে গেছে। তোমার মতো একজন কালচারড মানুষের এটা নজরে পড়ল না? আরে ছি ছি।
জয়নারায়ণ লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে গেলেন। নিজের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা তা হলে পালটানো দরকার?
অফকোর্স! এই পোশাকে লোক চরিত্রহীন হয়ে যায়।
জয়নারায়ণ বললেন, আসল কালপ্রিট তা হলে এই পাঞ্জাবিটা?
হ্যাঁ, তোমার শাঁস দেখা যাচ্ছে।
এ তো তা হলে আর কোনওদিনই পরা যাবে না। তা হলে কী করব এটাকে? ভাল করে কাচিয়ে মেয়েমহলে চালান করে দাও, চা কার কাজে লেগে যাবে। এটা আসলে। ফিল্টার ক্লথ। তোমাকে ভুল করে পাঞ্জাবির কাপড় বলে গছিয়ে দিয়েছে।
পাঞ্জাবিটা চা কার কাজে ব্যবহার করা যাবে জেনে মাতুল জয়নারায়ণ ভয়ংকর খুশি হলেন, যাক একটা ভাল কাজে লাগবে। কোনও চায়ের পাতাই আর লিক করবে না। গুঁড়ো চা-ও ব্যবহার করা যাবে। গুঁড়ো চায়ে বেশ আয় দেয়। সংসারের সেভিংস হবে।
তা হবে। তবে ছাকনিটা একটু কস্টলি হয়ে গেল।
না, খুব একটা কস্টলি হবে না। সাড়ে তিন গজ কাপড় আছে, অনেকগুলো পিস বেরোবে। জয়নারায়ণ বেশ খুশি হয়ে ভিতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসে হরিশঙ্করের সামনে দাঁড়ালেন। যেন পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে, এখন অভিভাবক কী বলেন। হরিশঙ্কর বললেন, হ্যাঁ এইবার ঠিক হয়েছে। ট্রানসপেরেন্ট থেকে ওপেক। তা তুমি যে বড় বাধ্য ছেলের মতো আমার কথা শুনলে?
