খুটুস করে কনকদের ঘরের দরজা খুলে গেল। রাম ভুলে চোখ চলে গেল ঘরের দিকে। কায়দা। করে তিন তেহাই মেরে কালোয়াতের কালোয়াতি শেষ হল। কনক অবাক হয়ে গেছে। রাতের এখন কোন প্রহর! চাঁদের আলো আরও ম্লান হয়ে এসেছে। বৃষ্টিভেজা প্রেয়সীর ওষ্ঠের মতো। পিতাপুত্র সেই আলোতে বসে আছি বিবর্ণ ছবির মতো।
কনক এগিয়ে এসে বললে, মেসোমশাই, কখন উঠলেন?
তিড়িং করে তবলায় চাটি মেরে বললেন, শুতেই যাইনি, তো ওঠা! নাও ধরো ধরো। মন্দ হচ্ছে না। ঘষামাজা করলে হতে পারে।
আমারও তর সইছে না। গলায় সুর এসেছে। সামনে কনক এসেছে। চার পাশে দুধ-গোলা অন্ধকার। মলিন উত্তরীয় জড়িয়ে পৃথিবী চেয়ে আছে পুবের দিকে। আর তো কিছু জানা নেই। ভয়রোই চলুক। জাগিয়ে রঘুনাথ কুবর। পঞ্ছি বন বোলে। আহা সুর যা লাগছে! আকাশের গায়ে সিঁদুরে রং ধরার মতো।
কনক পা মুড়ে বসে পড়েছে। মেসোমশাইয়ের নাসিকা গর্জন থেমে গেছে। এরকম ভীষণ উৎপাতে কে ঘুমোবে! পুরো পরিবার জেগে উঠেছে। ঝাঁপসা পাখি উড়ছে। কুমার রঘুনাথকে জাগাবার জন্যে গাইয়ের কী ব্যাকুলতা! রহস্যময়ী রাত চলে গেল। অচেনা পৃথিবী আবার চেনা হয়ে, উঠছে। স্পষ্ট প্রত্যক্ষ।
চোখদুটো জ্বালাজ্বালা করছে। কনক কাপড়জামা ছেড়ে প্রাইমাস স্টোভে চায়ের জল চাপিয়েছে। মেসোমশাই ঠাকুরঘরে ধ্যানস্থ। পিতা দাঁতে কড়া বুরুশ ঘষছেন। স্টোভের শব্দের সঙ্গে বুরুশের শব্দ মিশে বেশ একটা ঐকতান তৈরি হয়েছে। সকালের গায়ে যেন শিরিষ কাগজ ঘষা হচ্ছে।
মেসোমশাই ঘরের বাইরে এসে ধ্যান-ভাঙা চোখে জগৎসংসারের দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থেকে বললেন, হরিদা, আপনাদের এখানে কোথাও খাঁটি দুধ পাওয়া যায় না। খাঁটি দুধ!
পিতা ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, এ বাজারে খাঁটি কিছু আছে কি? খাটাল আছে, গোরু আছে, বাঁট থেকে সাদা জলও বেরোবে: তবে সে দুধে সরও পড়বে না, গোঁপে ঘিয়ের স্বাদও পাবেন না।
সেই ছেলেবেলা থেকেই সকালে দুধ খাওয়া অভ্যাস, যদি অনুমতি করেন একরার চেষ্টা করে। দেখি।
কটার সময় খাওয়া অভ্যাস?
এই আটটা নাগাদ।
তার আগেই পাবেন। বালতি হাতে রামখেলোয়ান এল বলে।
তা হলে এই এক মাসের জন্যে দুধ একটু বাড়িয়ে দেবার আজ্ঞা করুন।
করলুম। তবে চাদির চাকতি ছোঁড়া চলবে না।
ভদ্রলোক একটু ঘাবড়ে গেলেন। সুটকেসে নোট গজগজ করছে, খরচ করার সুযোগ মিলছে না। কনক চায়ের কাপ হাতে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললে, বাব্বাঃ, কখন দাঁত মাজতে বসেছেন মেসোমশাই! এবার উঠুন। চা এসে গেছে।
ব্রাশ হাতে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পিতা বললেন, সকালের চা আমি যে গেলাসে খাই মা। ওইটুকু মধুপরি কাপে কি সানাবে?
খালি পেটে এক গেলাস চা?
ও বাপকো বেটি! লিভারাতঙ্কে ভুগছ! চা আমার লিভারকে কাবু করতে পারবে না। তুমি কিচ্ছু ভেবো না। মেসোমশাই এবার দ্বিতীয় ফাঁকড়া বের করলেন, আপনাদের সকালের বাজারটা একবার দেখে এলে হত না। গামছায় হাত মুছতে মুছতে পিতা বললেন, আপনি মশাই মহা ছটফটে লোক। শান্ত হয়ে একটু বসুন তো! বাজারে গিয়ে গোত্তা খেয়ে কী হবে? এ কি আপনি মধুপুরে চেঞ্জে এসেছেন? ড্যাঞ্চিবাবু হয়ে বাজারে ঘুরবেন? তিন দিনের বাজার বাড়িতে ঠাসা। আগে খেয়ে শেষ করুন।
আমি যে মাছ কিনতে বড় ভালবাসি।
সে সুযোগ রোববারে পাবেন।
পড়ার টেবিল থেকে মুকু ডাকল, বাবা।
পিতৃদেবের ভুরু ক্রমশই কুঁচকে উঠছে।
মেসোমশাই চলে গেলেন। পিতা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, তুমি বাজার থেকে দেখেশুনে একটু মাছ আনতে পারবে?
কেন পারব না?
তা হলে নেমে পড়ো। তোমার মেকআপ টেকআপ নিয়ে নাও।
কথায় একটু হুল থাকবেই। বসরাই গোলাপেও কাটা থাকে। মাতুল একটি মুখে ঘষার ক্রিম উপহার দিয়েছিলেন। সেই বস্তুটি একদিন মাখতে দেখে, কী অট্টহাসি! ওহে লালিমা পাল পুং, বঙ্গের বীর সন্তান, চুলে পমেটম, গালে রংচং, পকেট ঢনটন, মুখে মিহিমিহি বুলি, চায়ের কাপে তুফান তুলি, বেড়াবি আর কতকাল। সেই দর্শনের দর্শনী আজও দিতে হচ্ছে।
হরি আছ? হরিশঙ্কর?
বেশ ভারী গলা। সিঁড়ি ভেঙে উঠছেন আর হক মারছেন। এত সকালে কার আগমন? বিধুজ্যাঠা। গায়ে আসাম সিল্কের পাঞ্জাবি। চওড়াপাড় দিশি ধুতি। কপালে লাল চন্দনের টিপ। তার মাঝে একটি চাল আটকে আছে। চুলে অ্যায়সা তেল ঢেলেছেন কপালের দুপাশে গড়াচ্ছে। মাতুল দেখলেই বলতেন, কলুর বলদ। সাতসকালে কারুর শুভাগমন কোনওকালেই তিনি ভাল চোখে দেখেন না।
বিধুজ্যাঠা আর একবার হাঁক পাড়লেন, হরি আছ? হরিশঙ্কর? আমাকে সামনে দেখে বললেন, ও তুমি! বাবা উঠেছেন?
কথায় আছে, তিন তিসি, লোটা গর্দান, দোনো হায় শয়তানকা নিশান। এই মানুষটি সেই লক্ষণাক্রান্ত। চোখে আবার ফ্যান্সি চশমা! আমার পেছনে দাঁড়িয়ে পিতা বললেন, আসুন। হঠাৎ এই সকালে!
এক সার বাঁধানো দাঁত মেলে বিধুজ্যাঠা বললেন, বাধ্য হলুম আসতে। তুমি যেরকম ন্যাজে খেলছ!
তার মানে?
তুমি যেন আকাশ থেকে পড়লে হে!
হ্যাঁ, আকাশ থেকেই পড়লুম। আপনার ন্যাজ আছে সে স্বীকারোক্তি এক ধরনের আত্মপ্রকাশ। মেনে নিতে রাজি আছি। তবে সে সোঁটা ন্যাজ নিয়ে আমি কোন দুঃখে খেলতে যাব।
রেগো না, রেগো না। ভেতরে চলল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা চলে না! ব্যাপারটা যখন দেনাপাওনার।
