রমেশবাবু যেভাবে গান, সেইভাবে গাইবার চেষ্টা করছি। হচ্ছে না। তবু চেষ্টা আপ্রাণ।
অনাদিকাল অনন্তগগন সেই অসীম-মহিমা-মগন
তাহে তরঙ্গ উঠে সঘন আনন্দ-নন্দন-রে ॥
২.৩৪ The people that walked in darkness
ভগবান কে, এই প্রশ্নের সমাধান কোনওকালেই হবে না। আমিও ভগবান হতে পারি। পিতা হরিশঙ্কর হয়তো একটু পরেই বলবেন, ওয়র্ক ইজ গড। আবার হয়তো পরমুহূর্তেই বলবেন, ম্যাথেমেটিক্স ইজ গড। আমার কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়, হরিশঙ্করকে যেভাবেই হোক আটকানো। বালিশের তলা থেকে পিসিমার চিঠিটা বার করে তার হাতে দিলুম।
নিতে নিতে বললেন, কার চিঠি?
উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে পড়তে শুরু করলেন। মুখের চেহারা পালটাচ্ছে। পড়া শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কী সিদ্ধান্ত?
ভয়ংকর সমস্যা।
হরিশঙ্কর বাজ পড়ার মতো চমকে উঠলেন, সমস্যা বলছ কেন?
এত বড় একটা পরিবার ঘাড়ে এসে পড়বে।
নোংরা একটা বাথরুমে ঢুকলে মানুষের মুখের চেহারা যেমন হয়, হরিশঙ্করের মুখের চেহারা সেইরকম হল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এমন একটা কথা তুমি বলতে পারলে? ঘাড়ে এসে পড়বে। অসহায় একটা পরিবার অনাহারে নির্যাতনে দিন কাটাচ্ছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব। তোমার নেই?
আপনি চলে গেলে আমি একা কী করে সামলাব?
আমি যদি মরে যেতুম, তুমি তোমার পিসিমাকে সাহায্য করতে না? না আমার বোন বলে দায়িত্বটা একা আমারই? কী তোমার মনোভাব? কী শিক্ষা পেলে তুমি? মঠ-মিশনে গিয়ে কী পেলে তুমি? কী হল তোমার? এখনও গেল না আঁধার!
শরীর খারাপের জন্যেই বোধহয় মেজাজ হঠাৎ বিগড়ে গেল। বলেই ফেললুম, আমার একার রোজগারে অত বড় একটা ফ্যামিলি সামলানো সম্ভব? কারও পক্ষেই কি সম্ভব?
হরিশঙ্কর হাঁটুতে চাপড় মেরে বললেন, আলবাত সম্ভব। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই, যদি মানুষের ইচ্ছে থাকে। কম রোজগারে এর চেয়ে কত বড় পরিবার প্রতিপালিত হচ্ছে। তুমি দেখতে চাও? একসময় আমাদের যৌথ পরিবার কত বড় ছিল, আমার বাবার সামান্য রোজগার। আমরা কি মরে গেছি? ভেসে গেছি? ধরো তোমার যদি আরও কয়েকটি ভাইবোন থাকত, আর আমি যদি মরে যেতুম, তা হলে তুমি কী করতে? বাবার বউ বাবার ছেলেমেয়ে বলে সব ফেলে রেখে পালাতে?
সেটা অন্য কেস।
অন্য কেস নয়। দুটো কেসই সমান। কেবল মনটা অন্য। নিজের ভাবতে পারলে দুটোই সমান। তোমার স্বার্থ জেগেছে। তুমি এখন নিজের সংসারের স্বপ্ন দেখছ। নিজের সুখের স্বপ্ন, নিজের ভোগের স্বপ্ন। এই বাড়িটা খুব পুরনো হয়ে গেছে, তোমার একটা নতুন বাড়ি চাই। সেখানে তোমার সুন্দরী স্ত্রী। একটি-দুটি ছেলেমেয়ে। সম্ভব হলে ছোট একটা গাড়ি। সুখী পরিবার ভোগ আর স্বার্থের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ত্যাগ কাকে বলে তোমার ধারণা নেই। ছেলেবেলা থেকে একা মানুষ হয়েছ, একাই থাকতে চাও।
আমার মাথা ঝাঝা করছে। কানদুটো গরম আগুন। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার ক্ষুদ্র আমি রাগে তিড়বিড় করছে। চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, তীব্র ভাষা ব্যবহার করতে ইচ্ছে করছে। ক্ষণকাল। আগের আধ্যাত্মিক শিক্ষা অকেজো মনে হচ্ছে। নৌকো যেমন মাঝনদীতে ঝড়ের ঢেউয়ে টলমল করে, আমাতেও সেই ক্রোধের দুলুনি। কণ্ঠস্বর অতি কষ্টে স্বাভাবিক রেখে বললুম, এ আমার। স্বার্থপরতা নয়, ভয়। আমার ভয় করছে।
হরিশঙ্করের ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসি, ভয় থেকেই স্বার্থপরতা আসে। সহোদর ভাই। হারাবার ভয়েই মানুষ স্বার্থপর হয়। নাথিং টু লুজ অ্যান্ড নাথিং টু ফিয়ার। তোমার ভয়টা কীসের? কমফর্ট হারাবে, হারাবে যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা। জীবন বাঁধা পড়ে যাবে। জীবনের এতটা পথ ফাঁইট করতে করতে আসার পর আমি ভেবেছিলুম, এইবার একটু মুক্তি অর্জনের অধিকার সংসার। আমাকে দেবে। তা আর হল না। আবার আমাকে কোমর বেঁধে জলে নামতে হবে। আবার শুরু করতে হবে গোড়া থেকে। এই বুড়ো বয়সে আবার আমি চাকরির সন্ধানে বেরোব, দশটা-পাঁচটা। আবার ঠেলব সংসারের চাকা।
সাহস করে বললুম, আমরা যদি না থাকতুম।
থেকে কী করে ভাবা যায় আমি নেই! আমি আমার জন্যেই আছি আর কারও জন্যে নেই, এ। ভাবনা তো আমার পক্ষে অসম্ভব। অল রাইট, তুমি তোমার ভাবনা ভাবো, আমি আমার ভাবনা। যে-বোন আমার কোলে-পিঠে মানুষ হয়েছে, তাকে আমি ফেলতে পারব না। বরং ফেলে দেব আমার গবেষণা।
গবেষণা? অবাক হয়ে গেলুম। হরিশঙ্কর গবেষণা করতে গিয়েছিলেন। জানতে ইচ্ছে করছে, কী গবেষণা? কোথায় সেই গবেষণাগার? এখনই সেই প্রশ্ন করলে কোনও উত্তর দেবেন না। তার আগে নিজের দুর্বল চরিত্রের পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। হরিশঙ্করের চোখে নিজের উজ্জ্বল মূর্তি তুলে ধরতে হবে। তিনি ধরেছেন ঠিক, নিজের সুখ বিসর্জন দিতে হবে এই ভয়েই আমি কাতর। আমার ফুরফুরে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। সেই গান মনে পড়ছে এক হাতে মোর পূজার থালা আর এক হাতে মালা। এক হাতে আমার ত্যাগের বড়াই, আর এক হাতে নারীদেহের স্পর্শ। এমন একটা ভণ্ড শয়তান কী করে হরিশঙ্করের পুত্র হল! দেবতা সৃষ্টি করলেন অপদেবতা। মধ্যপ্রাচ্যের আমির হবার কিংবা মোগল বাদশা হবার সব গুণ আমার মধ্যে বর্তমান। হারেম, ঝরোখা, গোলাপবাগিচা, ঝুলা, কোয়েলিয়া, বাইনাচ, রাঙা পানীয়ের গেলাস। মনে একেবারে মথুরা। ধরেছেন ঠিক। হরিশঙ্কর ধরবেন না তো কে ধরবেন! অন্তর্দর্শী।
