হরিশঙ্কর অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং খুশিই হলেন, বাঃ, ওয়েল সেড। সুন্দর উপমা। ভেরি পোয়েটিক। বাট মাই সান, ইফ ইট ইজ নট এ বার্ড? যদি পাখি না হয়ে একজন প্যারালিটিক মানুষ হয়? এ ক্রিপল? তাকে বকে, ধমকে, তিরস্কার করে, যন্ত্রণা দিয়ে হাঁটাতে হয়। দয়া করলে, অনুকম্পা দেখালে তার ক্ষতি হয়। জীবনের দীর্ঘপথ পড়ে আছে তোমার সামনে, যে-পথে তোমার সঙ্গী হবে না কেউ, সেই পথে হাঁটার শক্তি তোমাকে অর্জন করতে হবে। প্রেমের কাছে, সহানুভূতির কাছে, সাহায্যের কাছে, মানুষের করুণার কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিয়ো না। এই তো আসল কুরুক্ষেত্র পিন্টু। কেউ কারও নয়। না ঘর মেরা, না ঘর তেরা। নিজের এই অসুস্থতার সময় অবশ্যই বুঝে গেছ নির্ভর করার মতো একজনই আছেন, তিনি কে? তুমিও জানো না, আমিও জানি না। কেউই জানে না। জাস্ট এ ওয়াইল্ড গেস। একটা অনুমান মাত্র। ডপেলগ্যাঙ্গার বলে একটা শব্দ কখনও শুনেছ?
আজ্ঞে না।
শব্দটা জার্মান। ইংরেজি মানে হল তোমার সাইকিক ডবল। তোমার দ্বিতীয় সত্তা। চুয়াল্লিশ সালের ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তখন এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। ফরাসি রণাঙ্গনে এক আমেরিকান ইনফ্যান্ট্রি সার্জেন্ট। তাঁর নাম গ্রিফিথ। গ্রীষ্মের শেষবেলায় তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়েছেন টহলে। জায়গাটার নাম রেনে। চারপাশ শান্ত। সরু একটা পথ। ধুলোয় ঢাকা। দলের আগে আগে চলেছেন গ্রিফিথ। হঠাৎ গ্রিফিথের সামনে মাত্র কয়েক গজ দূরে এক মূর্তির আবির্ভাব হল। গ্রিফিথ চমকে গেলেন। সামনে পথ আগলে যে দাঁড়িয়ে সেও গ্রিফিথ। একই আকৃতি, একই পোশাক, এমনকী দাড়ির ক্ষতে যে স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো, দ্বিতীয় গ্রিফিথের দাড়ির ঠিক সেই জায়গাতেও প্লাস্টার। দ্বিতীয় গ্রিফিথ হাত নেড়ে ইশারা করছে, ফিরে যাও। গ্রিফিথ ভয় পেয়ে গেলেন। শুনলেন সেই নির্দেশ। ফিরে চললেন তার বাহিনী নিয়ে। তিনি ফিরছেন এমন সময় সৈন্য-বোঝাই একটা জিপ তার পাশ দিয়ে তিনি যে-দিকে যাচ্ছিলেন সেই দিকেই গেল। পরক্ষণেই তার কানে এল স্পন্ডাই মেশিনগানের শব্দ। জিপগাড়িটার উলটে যাওয়ার শব্দ। ওই জায়গায় জার্মান সৈন্যরা একটা গোপন ঘাঁটি গেড়েছিল। গ্রিফিথের মূর্তি যদি গ্রিফিথকে সাবধান না করত তার বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। বিজ্ঞানে এর কোনও ব্যাখ্যা পাবে না। একবার নয় গ্রিফিথের জীবনে এই ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটল কুড়ি বছর পরে। গ্রিফিথ তখন বিয়ে করেছেন। দুটি ছেলে। ঘটনাস্থল কানাডা। সপরিবারে বেড়াতে বেরিয়েছেন। দু’সার প্রাচীন গাছের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গেছে। আবহাওয়া সুন্দর, তবে দমকা বাতাস বইছে। তারা একটা ফাঁকা জায়গায় এসে সবে দাঁড়িয়েছেন, হঠাৎ সামনে আবির্ভূত হলেন সেই দ্বিতীয় গ্রিফিথ। যুদ্ধের পোশাক, চিবুকে প্লাস্টার। ইশারায় বলছে, পালাও, গো ব্যাক। গ্রিফিথ এক মুহূর্ত দেরি না করে পেছন ফিরে সপরিবারে ছুটতে লাগলেন। দমকা বাতাস তখন ঝড়ের চেহারা নিয়েছে। গ্রিফিথ যে-জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেইখানে হুড়মুড় করে বিশাল একটা গাছ ভেঙে পড়ল। সরে না এলে সপরিবারে মারা পড়তেন। এই ডপপেলগ্যাঙ্গারের অভিজ্ঞতা। পৃথিবীতে আরও অনেক ভাগ্যবানের জীবনে ঘটেছে। বার্লিনের ঘটনা। থিওলজির অধ্যাপক বাড়ি ফিরছেন সন্ধেবেলা। উলটো ফুটপাথে আর একজন। দেখেই চমকে গেলেন। আর একজন তিনি নিজেই। অধ্যাপক দ্রুত পা চালালেন। তার দ্বিতীয় মূর্তির চলার গতিও বাড়ল। অধ্যাপক পাশের রাস্তায় ঢুকলেন। এড়াতে পারলেন না। বাড়ির দরজার কাছে মূর্তি তাঁকে অতিক্রম করে গিয়ে নিজেই বেল টিপল। অধ্যাপক স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন উলটো ফুটপাথে। দর্শক হয়ে। পরিচারিকা বাতি হাতে দরজা খুলল। দু’জনে দোতলায় উঠছেন। দোতলার ঘরে আলো দেখা গেল। পরমুহূর্তেই পুরো ছাতটা ভেঙে পড়ল সশব্দে। এর কী ব্যাখ্যা হবে পিন্টু? তুমিই তোমার ভগবান। কারও দর্শন হয়, কারও হয় না।
হরিশঙ্কর নিঃশব্দে উঠে গেলেন বারান্দায়। কেন আমি ওঁর জ্ঞানকে স্পর্শ করতে পারি না! কেন পারি না ওঁর মতো একটা মনের উত্তরাধিকারী হতে! নিজের মর্তসীমা চূর্ণ করে কেন মিশে যেতে পারি না বিশালের বিশালে! অনেকদিন পরে আদেশ এল, এসরাজটা নামাও। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলছেন।
এসরাজ নামালুম। ঘরে এসে বললেন, আমাদের সেই মলসন্দটা বিছাও। ঠিক আছে না ইঁদুরে কুটি কুটি করেছে?
আজ্ঞে না ঠিকই আছে।
বহুত আচ্ছা! তা হলে পেতে ফেলো। হারমোনিয়মটা সাবধানে বের করে আনন। এসরাজের সিল্কের তৈরি ঢাকা খুললেন। ঝকঝকে শরীরে মিহি ধুলো। নরম কাপড় দিয়ে সযত্নে মোছা হল। ছড়িতে রজন ঘষলেন। রজন ঘষার সরঞ্জাম তার এক অসাধারণ কারিগরি। ছোট্ট একখণ্ড কাঠ। বাটালি দিয়ে কুঁদে নৌকোর মতো আকৃতিতে এনেছেন। মসৃণ। ওভ্যাল। ভেতরের খোলে রজন গলিয়ে ঢেলে দিয়েছেন। তৈরি হয়েছে রজনের খোপ। বস্তুটা অপূর্ব এক কারুকর্ম। নাম– রজন কাঠ। ছড়ির ছড় বারকয়েক ঘষলেই তারে স্বচ্ছন্দ গতি।
এসরাজ বাঁধা হল। আমাকে বললেন, ওই গানটা গাইবার চেষ্টা করো। তাহারে আরতি করে…। এসরাজে ছড় টানলেন। মিঠে মোলায়েম সুর ডানা মেলে উড়ে গেল।
তাঁহারে আরতি করে চন্দ্রতপন, দেব মানব বন্দে চরণ–
আসীন সেই বিশ্বশরণ তার জগতমন্দিরে ॥
