জমজমাট ব্যাপার, সেই কালী কীর্তনের মতো, হতেছে পাগলের মেলা খেপাতে খেপিতে মিলে/ আনন্দেতে সদানন্দে আনন্দময়ী/ পড়ছে ঢলে ॥ বড় ধুম লেগেছে হৃদকমলে। হু করে বেজে উঠল চটকলের বাঁশি। দক্ষিণেশ্বরে বসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই বাঁশি শুনে গেছেন। শ্রীশ্রীমা এই বাঁশিকে বলতেন শ্যামের বাঁশি। ঠাকুরের আহারাদির পর এই বাঁশি শুনে তিনি সেবায় বসতেন। এই বাঁশি শুনতে শুনতে আমার মাতামহ উত্তরের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে তেল মাখতেন। সবসময় তাঁর বিভোর অবস্থা। দেহ একখানে মন আর একখানে। হরিদ্বার, হৃষীকেশ, লছমনঝুলা, কেদারনাথ। আজ এই আসরে তিনি থাকলে কী মাতনই না হত! যখন তানপুরা কাঁধে নিয়ে গান ধরতেন, যদি দান দিলে আমায় এ বিপুলধরণী।/ তবে কেন প্রাণ দিলে না, দিলে না ॥/ আঁখি যদি দিলে মা গো এ বিশ্বমাঝারে।/ তবে আঁখিজল কেন দিলে না, দিলে না ॥
ভেঙে গেল আসর। শেষ হল আহারাদি। বাগানের রোদ পলাতক বালকের মতো পাঁচিল টপকে সারগাছের মাথায় গিয়ে চড়ল। ডালে ডালে বিষণ্ণ পাখি। উজ্জ্বল একটি দিনের মৃত্যুতে শোকার্ত। হঠাৎ হরিশঙ্কর ঘোষণা করলেন, কালই তিনি চলে যাবেন। জানলার কাছে বসে আছি আমি। বিভোর আমার স্বপ্নে। সব হারিয়ে আবার সব ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন। সওদাগরের জাহাজ ডুবে গিয়েছিল, মা-লক্ষ্মীর কৃপায় আবার ভেসে উঠেছে। হঠাৎ এ কী সিদ্ধান্ত? ঘরে যেন বজ্রপাত হল। কোথায় যাবেন? কেনই বা যাবেন! প্রশ্ন করলুম, কোথায় যাবেন?
প্রশ্নটা একটু বোকার মতো হল। তোমার কী ধারণা? আমার কোনও যাওয়ার জায়গা নেই? তোমার কি ধারণা, এতকাল আমি ছেঁড়া কম্বল কাঁধে ধর্মশালায় ধর্মশালায় ঘুরছিলাম, লাইক ওয়ান অফ দি সো মেনি আইডলারস!
আমি তা মনে করিনি। ভেবেছিলুম সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। কারণ আপনি কিছুই নিয়ে যাননি। একবস্ত্রে গৃহত্যাগ করেছিলেন।
ইয়েস মাই সান, হরিশঙ্কর কনভেনশনাল সন্ন্যাসে বিশ্বাসী নয়। হরিশঙ্কর গুরুবাদে বিশ্বাসী নয়। হরিশঙ্কর কনভেনশনাল ধর্ম বিশ্বাস করে না। মন্দির, মসজিদ, গির্জা সব তার কাছে সমান। সন্ন্যাসী হবার জন্যে কোথাও যাবার দরকার হয় না। অন্তরের কয়েকটা ময়লা জিনিস বাইরে ফেলে দিতে পারলেই একজন সন্ন্যাসী। যে-কোনও জায়গায়, যে-কোনও অবস্থায়। এম্পটি ইয়োর ডার্টি বাস্কেট অ্যান্ড ইউ আর এ সেজ। দেয়ার আর থ্রি ক্যাটস, কাম, ক্রোধ, লোভ, তিনটেকে বিদায় করো, তুমি সন্ন্যাসী। আর একবস্ত্র? যখন এসেছিলুম সঙ্গে ক’টা বস্ত্র এনেছিলুম? ওইটাই হরিশঙ্করের আত্মবিশ্বাস। যেচে, সেধে চ্যালেঞ্জ নেওয়া। অলওয়েজ এক্সপ্লোর নিউ হরাইজন। নতুন দিগন্ত। এ। নিউ স্ক্র্যাচ, অ্যান্ড বিগিন। নতুন একটা আঁচড় থেকে তৈরি করো নতুন ভবিষ্যৎ। ফ্রম নাথিং টু সামথিং। জগতের হাটে হরিশঙ্কর নিজেকে বাজাতে জানে। অ্যাডভেঞ্চার ইজ লাইফ। তুমি ভীরু, তুমি ঘরকুনো, তোমার পক্ষে জীবনের বিশালতা বোঝা সম্ভব নয়। ইউ আর এ পেটিকোট ম্যান।
ভয়ংকর আক্রমণে স্তব্ধ হয়ে যেতে হল। এই কারণেই আমার যত অভিমান, যত হতাশা। বয়সটা কাদার নয়। মুখ গোঁজ করে থাকার। আমি পেটিকোট ম্যান! বারনার্ড শ র কথা থেকে শব্দটা নিলেন, শ বলেছিলেন, A woman is really only a man in petticoats, or, if you like that a man is a woman without petticoats: আমি সামান্য প্রতিবাদ জানাতে চাইলুম। আপনি এখনও আমার ওপর রেগে আছেন?
তুমি এটাকে রাগ ভাবছ? একটু তলিয়ে দেখলে বুঝতে পারতে, এ রাগ নয়, এ তোমার শক থেরাপি। মিনমিনে ঘিনঘিনে জীবন থেকে তোমাকে বের করে আনার চেষ্টা। এই বয়েসে আমি যা পারি, তুমি তা পারো না? মুখে পাউডার লেপে ফিনফিনে কথা বলে মেয়েদের প্রিয় হতে চাও। ওমর খৈয়াম, গালিব পড়ো। কেন মিলটন, হোমার, ভার্জিল পড়তে পারো না? গোলাপি কাগজে প্রেমপত্র লেখো। লাইফ ইজ নট দ্যাট রোজি পিন্টু। জীবন অবশ্যই একটা কবিতা, তবে বীররসের কবিতা। লাইফ ইজ এ হিরোয়িক পোয়েম, রাইমড় আর আনরাইমড়। তোমাকে আমি তোমার মুখ । দেখাতে চাই। মনে আছে সেই গল্প! সিংহশাবক ভেড়ার পালে বড় হতে হতে ভেড়াই হয়ে যাচ্ছিল। একদিন এক সিংহ এসে তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল জলার ধারে। জলে পাশাপাশি দু’জনের প্রতিবিম্ব। দেখ, তোর আর আমার দু’জনের মুখই একরকম দেখতে। তুইও সিংহ আমিও সিংহ। এই নে চেখে দেখ এক টুকরো মাংস। তুমি আমার ছেলে হয়ে, আমার উপহাস হয়ে জীবন নষ্ট করছ। তোমার লজ্জা করে না। আমি এক ধরনের জীবন শেষ করে আর এক ধরনের জীবন শুরু করেছি। অবসরভোগী বৃদ্ধ হয়ে ছেলের রোজগারে অলস জীবন আমি কাটাতে চাই না।
ছেলের সেবাও আপনি নেবেন না?
সেবা খুব কঠিন জিনিস পিন্টু। বলা সহজ, করা শক্ত। বিরক্ত না হয়ে সেবা ক’জন করতে পারে? আর শক্তি থাকতে সেবা নোব কেন?
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, আপনি এখন কী করছেন? যদি আমাকে একেবারেই পর না ভাবেন তা হলে বলবেন, আর যদি ভাবেন আমি আপনার কেউ নই তা হলে বলবেন না। আমি আমার পথ আপনারই আশীর্বাদে ঠিক খুঁজে নিতে পারব। ছোট মুখে বড় কথা মার্জনা করবেন, একটা উদাহরণ মনে আসছে, পাখির মা পাখিকে যখন উড়তে শেখায় তখন কিন্তু ঠোকরায় না। পাহারা দেয় ডালে বসে, অন্য পাখির ঠোকরের হাত থেকে বাঁচায়।
