হরিশঙ্করের উজ্জ্বল মূর্তির দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বললেন, ইউ আর অল পাওয়ার ভাইব্রেটিং ইন এ ডিভাইন প্লেন। শাবাশ বেটা। সাইলেন্টলি চালিয়ে যাও তোমার সাধনা। জল একটু বেশি খাবে। চিত হয়ে শোবে, অ্যান্ড ইউস এ ব্ল্যাঙ্কেট। হোয়াইট ছাড়া কিছু পরবে না। তোমার ইষ্ট হলেন। লর্ড ভিষ্ণু।
সন্ন্যাসী হাত দিয়ে সেই অদৃশ্য ত্রিভুজ মুছে দিলেন। তারপর হাত জোড় করে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই আমাদের শেষ দেখা, আপনারা সবাই ভাল থাকুন। ঈশ্বরের ইচ্ছা পূর্ণ করুন। সন্ন্যাসী সিঁড়ির দিকে এগোলেন। মেনিদা বললেন, আমি একটু এগিয়ে দিয়ে আসি। আর তো দেখা হবে না।
.
জয়নারায়ণের গবেষণা শুরু হল, ব্যাপারটা কী? এমনও হয় নাকি? জাদু? হিপনোটিজম? হরিশঙ্কর বললেন, প্লেন অ্যান্ড সিম্পল সাইকোলজি। চালপড়া বলে একটা জিনিস আছে জানো? চালপড়া খাইয়ে চোর ধরা। যে-চোর তার মুখে চাল ভিজবে না। শুকনোই থেকে যাবে। ভয়ে থুতু বেরোবে না। মুখ শুকনো কাঠ। মনস্তাত্ত্বিক কারণে। এও সেইরকম। আমরা সবাই আত্মসচেতন হয়ে উঠেছিলুম। নিজের ভেতরটাকে দেখার চেষ্টা করছিলুম, যেটা সবসময় আমাদের বাইরের তুচ্ছতায় চাপাই পড়ে থাকে, খড়ের গাদায় ছুঁচের মতো। ধরো মানুষ একটা মোটরগাড়ি, তার দু’জন চালক। একজন বসে আছেন সূক্ষ্মে, অন্যজন স্কুলে। স্কুলে যিনি আছেন তার ভূমিকা হল মেন্টিনেনস্ ইঞ্জিনিয়ারের। তার নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিদ্রা, আমাদের স্মৃতি, পরিপাকযন্ত্র ও পরিবর্জন ব্যবস্থা। সূক্ষ্ম মনের উপস্থিতি আমরা ভুলেই যাই। স্কুলের কাজকর্মের দিকেই আমাদের নজর। সরষের ভেতর তেল আছে। বোঝার উপায় নেই। পিষতে হবে। ঘোলে মাখন আছে, মন্থন করতে হবে, মেহেদিতে রং আছে বাটতে হবে। একটা মোহর পড়ে আছে এক বালতি ঘোলা জলে। দেখার। উপায় নেই। ফটকিরি ফেলে জল পরিষ্কার করে নাও, সব দেখতে পাবে। শান্ত হয়ে বোসো। স্কুলের। ক্রিয়া থেকে চিন্তা তুলে নাও। স্থির হও আর তখনই দেখতে পাবে সূক্ষ্মকে। সেই সূক্ষ্মেই আছে। আমাদের স্বভাব। সন্ন্যাসী অলৌকিক কিছুই করলেন না, কায়দা করে আমাদের স্বরূপ দর্শন। করালেন। একসঙ্গে এতজনকে দীক্ষা দিয়ে গেলেন। ভাবে বলে গেলেন, অখণ্ডং সচ্চিদানন্দমবা মনসগোচরম্। আত্মানম্ অখিলাধার অভীষ্টসিদ্ধয়ে আশ্রয়ে। চিত্তের অনন্তবৃত্তি। স্টপ ইট। আত্মাতে যুক্ত হও। সিট স্টিল অ্যান্ড মেডিটেট। আমরা যা করলুম তা এক ধরনের ধ্যান। করেছি। এক মহাশক্তির উপস্থিতিতে। নিজেরা করলে অত সহজে হত না। ওইটাই হল সন্ন্যাসীর সম্মোহন। সাপকে ঝাঁপিতে এককথায় ঢোকাতে পারেন বেদে। সন্ন্যাসী সেই বেদে। আমি বোধহয় একনাগাড়ে বহুক্ষণ বকবক করছি! আমার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। ছিছি তোমরা কী মনে করছ! আই বেগ টু বি এক্সকিউজড ফর মাই অসভ্যতা। এজ হ্যাঁজ মেড মি এ ফুল। তা না হলে কেনই বা ভুলে যাব, নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো ন মেধয়া ন বহুনা শুতেন। একমাত্র প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে মানুষ নিজের শক্তিকে খুঁজে পেতে পারে!
.
হরিশঙ্কর উঠে পড়লেন। শ্যালক জয়নারায়ণ বললেন, অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আরও কিছুক্ষণ চললে বেশ হত। আর কতকাল নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন? আসুন আমরাও এইবার শুরু করি। এই পানসে সংসার থেকে বেরিয়ে যাই। শ্যামা সুধা তরঙ্গিণীতে ভেসে যাই।
হরিশঙ্কর বললেন, নাক তেরে কেটে তাক বোল মুখে বলা সহজ, হাতে ফোঁটানোই মুশকিল। এই তো তবলা, অক্ষয় একবার চেষ্টা করো না!
অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, এমনি হবে? সাধতে হবে।
হরিশঙ্কর বললেন, তারও আগে একটা কথা আছে, কেন সাধবে? মোটিভেশন? বেশ তো আছি! রোগে-ভোগে। বউ ঝাটা মেরেছে? ভাই মামলা ঠুকেছে? চাকরি চলে গেছে? শেয়ার মার্কেটে দেউলে হয়ে গেছি? সংসারের একদল ঝড়তি-পড়তি মানুষ, গালভাঙা, কোলকুঁজো, চোখে ছানিকাটা-চশমা। বুকে ব্রঙ্কাইটিস, কাতরাতে কাতরাতে চলেছে, প্রভু প্রভু করতে করতে, খিচুড়ি আর মালসাভোগ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, হৃষ্টপুষ্ট মহিলা দেখলেই অক্ষম দেহ হায় হায় করে উঠছে। পেট-চুক্তি হরিনাম। ছ’ঘন্টা নাগাড়ে করতে পারলেই একপাতা খিচুড়ি। হরে কৃষ্ণ হরে রাম-এর বদলে ক্রমান্বয়ে বলে চলেছে, হচে কিষ্ণ হচে রাম। মূল গায়েনের কোনও মাথাব্যথা নেই সংশোধন করে দেবার। লক্ষ্য তো রাম নয়, কৃষ্ণও নয়। লক্ষ্য উদর ও উদরের নিম্নভাগ। এই মিছিল ঈশ্বরের দিকে যত এগোতে থাকে, ঈশ্বর ততই পেছোতে থাকেন। শবযাত্রীর দল আসছে গামছা কাঁধে। স্বর্গের দেউড়ি বন্ধ করো। পূর্ণ প্রাণে চাবার যাহা রিক্ত হাতে চাস নে তারে, সিক্ত চোখে যাস নে দ্বারে। তোমায় আমায় মিলন হবে বলে, যুগে যুগে বিশ্বভুবনতলে, পরান আমার বন্ধুর বেশে চলে চিরস্বয়ম্বরা। রাজার ছেলে রামচন্দ্র, রাজার ছেলে বুদ্ধ, জনকরাজা, মহাপণ্ডিত কন্দর্পকান্তি শ্রীচৈতন্য, সেই পথের পথিকের এই হল চেহারা। রাজসমারোহে এসো। কার অভিসারে তুমি চলেছ! রাজসভায় ভোজ খেতে চলেছ তুমি। তুমিও যাও রাজার মতো। টু মিট এ কিং, বি এ কিং, নট এ বেগার। ভিখিরি রাজার দর্শন পায় না। ওহো, ধরো গান, জয় সুর লাগাও,
একমনে তোর একতারাতে একটি যে তার সেইটি বাজা–
ফুলবনে তোর একটি কুসুম, তাই নিয়ে তোর ডালি সাজা ॥
যেখানে তোর সীমা সেথায় আনন্দে তুই থামিস এসে,
যে কড়ি তার প্রভুর দেওয়া সেই কড়ি তুই নিস রে হেসে।
লোকের কথা নিস নে কানে, ফিরিস নে আর হাজার টানে,
যেন রে তোর হৃদয় জানে হৃদয়ে তোর আছেন রাজা–
একতারাতে একটি যে তার আপন-মনে সেইটি বাজা ॥
