হরিশঙ্কর জানতে চাইলেন, অমৃত ফলটা কী? আপনার কাছে আর একটা আছে? তা হলে অ্যানালিসিস করে দেখতুম, অ্যাক্টিভ ইনগ্রিডিয়েন্টস কী আছে? বিজ্ঞানের উপকার হত।
সন্ন্যাসী বললেন, হিমালয়ের ফল হিমালয়েই থাক। সাধুসন্ন্যাসীদের সহায়। ও জেনে কোনও লাভ নেই। দুর্গমের ফল দুর্গমেই থাক। আমাদের কাজ হয়ে গেছে, আবার কী? আর তো আমাদের প্রয়োজন নেই। সোমরস ছিল। ফর্মুলা ইজ লস্ট। সমুদ্রমন্থনে অমৃত উঠেছিল। সেই অমৃতের ফর্মুলা কী? জেনে লাভটা কী হবে? আমরা তো ব্যবসা করব না। তবে আপনি সায়েন্টিস্ট, আপনার কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক।
অলৌকিককে আমি লৌকিকে আনতে চাই, যাতে জড়বাদীরা ধাপ্পা বলে উড়িয়ে দিতে না পারে।
দরকার নেই। অবিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীই থাকুক। দ্যাট ইজ গড়স ডিজায়ার।
জয়নারায়ণ বললেন, মহারাজ, আপনি আমার বাবাকে দেখলেন? কেমন আছেন তিনি? কোথায় আছেন?
মামা এমন আকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, যেন সাধুজি ঠিকানাটা বললেই তিনি এখনই ছুটে যাবেন দেখা করতে। কিন্তু সে এমন একটা জায়গা যেখানে দেহ নিয়ে যাওয়া যায় না। দেহ ফেলে যেতে হয়। সেই লোকের অধিবাসীরা মায়াদেহ ধারণ করে হয়তো আসতে পারেন।
সন্ন্যাসী বললেন, তিনি কোন লোকে আছেন বলা সম্ভব নয়। জীবনের পরপারে অনন্ত লোক। কে-ই বা জানে তার কথা, সবই কল্পনা, সবই অনুমান। মৃত্যু আর পুনর্জন্ম এই বৃত্তাকার পথে আত্মার ভ্রমণকে চিন ও তিব্বতি ধর্মশাস্ত্রে বলে বার্দো জার্নি। ভারী সুন্দর ধারণা। মৃত্যুর পর দেহমুক্ত আত্মা পরলোকের পথ ধরে ভ্রমণে বেরোয়। একটা পাক মেরে ফিরে আসে মাতৃজঠরে। এই স্বাধীন ভ্রমণে তারা আমাদের কাছে আসতে পারেন, আমরা যেতে পারি না, কারণ আমরা দেহে আবদ্ধ, পৃথিবীর নিয়ম মেনে আমাদের চলতে হয়।
জয়নারায়ণ জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি আবার জন্মগ্রহণ করবেন?
সেটা তার ইচ্ছে। যদি করেনও আমরা জানতে পারব না। তিব্বতি সাধকদেরই সেই ক্ষমতা আছে। আমাদের নেই। কী আর করা যাবে! বৌদ্ধরা বেশ মজা করেছেন। তারা ফর্ম, মানে জীবাকারকে বলছেন ‘সে’, আর শূন্যাকারকে বলছেন, কুং’, এইবার দুটি অবস্থাকে একটি সূত্রে গেঁথেছেন। সেই সূত্রের নাম হৃদয়সূত্র। সেই সূত্রে সব একাকার, That which is form is just that which is emptiness. আমরা আছি, আকার, আকৃতি, দেহ, জীব, বস্তু, আছি শূন্যতাকে ঘিরে। একটা বুদবুদ। ভেতরটা ফাঁকা, and that which is emptiness is just that which is form. বেটা, হোয়াট ইজ এ উইন্ডো, হোয়াট ইজ এ ডোর? একটা ফাঁকা জায়গা। এ প্যাঁচ অফ এম্পটিনেস, কিন্তু প্রয়োজনীয়। দরজা আর জানলা ছাড়া ঘর হয় না, অ্যান্ড উই মেক ইট। প্ল্যান করে তৈরি করা হয়। একটা ফর্ম কিন্তু শূন্য। নাথিং ইজ দেয়ার। আকার নিরাকার, নিরাকার আকার, দুটোই সত্য, দুটোই মিথ্যা অ্যান্ড ভেরি ইন্টারেস্টিং। বেটা, আমি এখন যাই। দেখা করে গেলুম। আবার কবে আসব জানি না।
হরিশঙ্কর বললেন, আজ আপনাকে কিছু গ্রহণ করতে হবে।
করেছি। সংগীত। আর কিছুর প্রয়োজন নেই। ওটা বাহুল্য। ভাল থাকুন। বি হ্যাপি। সন্ন্যাসী চোখ বুজিয়ে স্থির হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কেউ পেলেন কি না জানি না, আমার নাকে একটা সুগন্ধের ঝাঁপটা এল।
সন্ন্যাসী আঙুল দিয়ে মেঝেতে একটা ত্রিভুজ এঁকে আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর বললেন, নিজেকে জানতে চান? দি স্টাফ, হুইচ ইউ আর মেড অফ?
সবার আগে মাতুল উৎসাহী হলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই জানতে চাই।
হরিশঙ্কর বললেন, কীভাবে জানা যাবে?
সন্ন্যাসী হেসে বললেন, জাস্ট পুট ইয়োর ফাস্ট ফিঙ্গার অন দি সেন্টার অফ দি ইম্যাজিনারি ট্রাংগল। মাতুল আঙুল দিতে গিয়েও থমকে গেলেন। সন্ন্যাসী বললেন, টাচ ইট।
জয়নারায়ণ আঙুল ছোঁয়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে মুখের চেহারা করুণ হয়ে উঠল। কতদিনের বেদনা ফুটে উঠল মুখে। জলে ভরে এল চোখ। অসীম বিষণ্ণতায় নিমজ্জিত হলেন।
সন্ন্যাসী বললেন, ইউ আর মেড অফ সরো। দুঃখ দিয়ে তৈরি। দুঃখের পথেই রিয়েলাইজেশন। একে একে সবাই এগিয়ে এলেন। আঙুল রাখলেন অক্ষয় কাকাবাবু। ছটফট করে উঠলেন। সন্ন্যাসীর দিকে তাকালেন। তিনি বললেন, এনার্জি। মুকু হাত ছোঁয়াল। পাথরের অহল্যার মতো বসে রইল কিছুক্ষণ। সন্ন্যাসী বললেন, তুমি রিজিডিটি। অনমনীয়তা দিয়ে তৈরি। সুরঞ্জনার পালা এল। আঙুল ছুঁইয়েই সে টানটান খাড়া। কে যেন তাকে ওপর দিকে টানছে। ধারালো মুখ আরও ধারালো। সন্ন্যাসী বললেন, ইউ আর অল অ্যাম্বিশন। তুমি বড়, আরও বড় হতে চাও। আমার পালা এল। ভয়ে। ভয়ে আঙুল রাখলুম। সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরটা কুঁকড়ে ছোট হয়ে এল। জমির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। সন্ন্যাসী বললেন, ইউ আর মেড অফ ফিয়ার। তোমার উপাদান হল ভয়। এইবার হরিশঙ্কর। আমরা তাকিয়ে আছি। অসীম কৌতূহল। এমন একজন বজ্ৰপুরুষের সত্তাটা কী? কী দিয়ে তৈরি? হঠাৎ মেনিদা বললেন, আমি আগে সেরে নিই। হরিশঙ্কর বললেন, অলরাইট। সব শেষে আমি। মেনিদা আঙুল রাখলেন। পাগলের মতো হাসতে লাগলেন। সন্ন্যাসী বললেন, হি ইজ এম্পটি। এ ম্যান উইদাউট সোল। এইবার হরিশঙ্কর। তার প্রথম আঙুল ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ত্রিভুজের দিকে।
২.৩৩ যেন রে তোর হৃদয় জানে
উৎকণ্ঠা তো বটেই। হরিশঙ্কর আঙুল রাখবেন ত্রিভুজে। কী প্রকাশ পাবে তার স্বভাবে! নিষ্ঠুরতা, দয়া, মায়া, জ্ঞান? চরিত্রের কোন দিকটা প্রবল হবে? সন্ন্যাসী কী দেখবেন তার ভেতরে। হরিশঙ্করের স্থির অকম্পিত আঙুল কাঙিক্ষত স্থান স্পর্শ করল। তার ঋজু শরীর আরও ঋজু হল। মুখে একটা জ্যোতি। যেন একটা বিদ্যুৎ-তরঙ্গ খেলছে শরীরে। মনের বা চোখের ভুল কি না জানি না, আঙুল ভূমি স্পর্শ করামাত্রই একটা স্পার্ক খেলে গেল। এমনও হয় নাকি! চোখের দেখা আর মনের বিশ্বাসকে এক করতে পারছি না। তবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা, হরিশঙ্কর স্থির দৃষ্টিতে কারও দিকে তাকালে তার আর নড়বার চড়বার ক্ষমতা থাকে না। আমার মনে আছে, একবার একটা মরচে-ধরা টিনের কৌটোর ঢাকনা কিছুতেই খোলা যাচ্ছিল না, অথচ তার মধ্যে একটা কেমিক্যালস ছিল, যেটা খুবই জরুরি প্রয়োজনের। আমরা সবাই ব্যর্থ হলুম। হরিশঙ্করও প্রথমটায় পারলেন না। সকলেই রায় দিলেন, ঢাকনা এমন আঁটা এঁটেছে ও আর খোলা যাবে না। হরিশঙ্করের চোখে একটা স্পার্ক খেলে গেল। মুখের চেহারা পালটে গেল। কৌটোটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন স্থির হয়ে, তারপর মারলেন এক টান। ঢাকনা খুলে গেল। একবার একটা ড্রয়ারের তালা খুলছিল না। সবাই পরাজিত। হরিশঙ্কর চাবি ঢোকালেন, ঘোরানোমাত্রই খুলে গেল। সবাই জিজ্ঞেস করলেন, কী করে হল? হরিশঙ্কর অদ্ভুত উত্তর দিয়েছিলেন, তোমরা খুলবে না ভেবে চাবি ঘোরাচ্ছিলে, আর । আমি ঘুরিয়েছিলুম খুলবে ভেবে। এই সামান্য তফাত। বলেছিলেন, দেশলাই কাঠি জ্বালাবার আগেই যদি ভাবো নিবে যাবে, তা হলে নিববেই; আর সেটা যদি একেবারেই ভুলে যাও কাঠি কখনওই নিববে না। একে বলে অ্যাপ্রোচ। একে বলে উইল। দুটো কথা আছে, আই ক্যান আর আই ক্যান নট। আমি পারি আর আমি পারি না। একটা শক্তি আর একটা দুর্বলতা। হরিশঙ্কর একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন, কাউন্ট মেরালের উদাহরণ। ইতালির এক মাননীয় মানুষ। হাত অথবা চিরুনি ছাড়াই তিনি চুল আঁচড়াতে পারতেন যেমন খুশি। যেদিকে খুশি টেরি বাগাতে পারতেন। ইচ্ছাশক্তির উদাহরণ। আর একটা গল্প বলেছিলেন জন কাউপারের। নিউ ইয়র্কে ওয়েস্ট ফিফটি সেভেন্থ স্ট্রিটে কাউপারের এক অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকতেন। তার নাম ছিল ড্রেইসার। কাউপার রোজ বিকেলের দিকে তাঁর বাড়িতে আসতেন। কাউপার তখন হাডসন নদীর ধারে ছোট একটা গ্রামে থাকতেন। প্রায় তিরিশ মাইলের দূরত্ব। বেলাবেলি বন্ধুর বাড়িতে ডিনার শেষ করে ট্রেন ধরে তিনি ফিরে যেতেন। গ্রামে। একদিন ডিনার শেষ হয়ে যাবার পর দুই বন্ধুতে খুব গল্প হচ্ছে। কাউপার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন, কথায় কথায় সময়ের খেয়াল ছিল না। তাড়াতাড়ি উঠে পড়লেন। আর বসলে ফেরার ট্রেন পাবেন না। বন্ধু একটু হতাশ হলেন। গল্প বেশ জমেছিল। কাউপারকে ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না। কাউপার বিদায় নেওয়ার আগে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, মনখারাপ কোরো না, আমি আজই আবার আসছি তোমার কাছে। বন্ধু বললেন, চলে গেলে আবার আসবে কী করে, সেই তিরিশ মাইল দূর থেকে? কাউপার বললেন, তা জানি না, তবে আমি আসব। তোমার সামনে এসে দাঁড়াব আমি। ড্রেইসার বন্ধুর কথা কিছুই বুঝলেন না। কাউপার চলে যাওয়ার পর বই নিয়ে বসলেন। ঘণ্টাদুই কেটে গেছে। হঠাৎ কী খেয়াল হল দরজার দিকে তাকালেন। অবাক কাণ্ড। দরজা আর ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় কাউপার দাঁড়িয়ে আছেন। স্পষ্ট। কোনও ভুল নেই। ড্রেইসার তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে বন্ধুর দিকে এগিয়ে গেলেন। জন, তুমি তোমার কথা। রেখেছ। এসো এসো। বন্ধুর হাত ধরার জন্যে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন। কাউপার কোনও কথা বলছেন না। ড্রেইসার যখন আরও কাছে গেলেন, দূরত্ব মাত্র তিন ফুট, কাউপার হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ড্রেইসার প্রথমটায় ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। পরে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বন্ধুকে টেলিফোন করলেন। কাউপারের গলা ভেসে এল। ড্রেইসার এই গলার সঙ্গে পরিচিত। কাউপার বললেন, আমি তোমাকে বলেছিলুম যাব। তুমি তার প্রমাণ পেয়েছ। এর বেশি আর আমাকে কিছু। জিজ্ঞেস কোরো না। গল্প শেষ করে হরিশঙ্কর বলেছিলেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে মানুষের পক্ষে অ্যাস্ট্রাল প্রোজেকশনও সম্ভব। হরিশঙ্কর নিজেও তা পারেন, যেমন পারতেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মশাই। অস্বীকার করেন, কিন্তু আমার কাছে অজস্র প্রমাণ আছে। হালফিল তার প্রমাণ পেয়েছি। আমার রোগশয্যায় মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বপ্ন না-ও হতে পারে।
