আপনি কোনওদিনই আমার মধ্যে ভাল কিছু দেখতে পাননি।
তা বটে। তোমাকে তো আমি সুযোগ দিয়েছিলুম, তুমি তোমার আশ্রমে গেলে না কেন? কেন এই বাড়িতে নববৃন্দাবন খুলে বসলে? তোমার জন্যে এই বাড়িতে একটা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে গেল। এই কেন-র কোনও সন্তোষজনক উত্তর কি তুমি দিতে পারবে?
আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলুম।
তা হলে আমি যখন তোমার হাত ধরেছিলুম, তখন তুমি সেই হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলে কেন?
ভেবেছিলুম আমি লায়েক হয়ে গেছি, তারপর দেখলুম আমি একেবারে অসহায়। আমি কোনও ডিসিশন নিতে পারি না, ভিতু। অতীত আর স্মৃতির মধ্যে বসে প্যানপ্যান করে কাদি। আপনি যতদিন ছিলেন না, প্রতি মুহূর্তেই বলেছি, ও ফাদার! টেক মাই হ্যান্ড। আপনি ছাড়া আমার জীবন অচল।
হরিশঙ্কর আমার কপালে হাত রাখলেন। তার চোখদুটো এইবার ছলছল করছে। আমার শরীরে অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলছে। শক্তির এক তরঙ্গ। প্রবল এক ইচ্ছার স্রোত। হাত যেন নীরব ভাষায় বলছে, উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত। ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি ॥ জীবনের একেবারে নীচের তলায় ইন্দ্রিয় সুখভোগের লালসায় পড়ে আছ। ওঠো। উচ্চজ্ঞান, উন্নত জীবনলাভের চেষ্টা করো। আত্মজ্ঞানে জ্ঞানী হও। নিজের চেষ্টায় হয়তো পারবে। না। টেক মাই হ্যান্ড। আমার হাত ধরো। পথ যতই দুর্গম হোক আমি তোমাকে নিয়ে যাব।
আমার হাত রাখলুম কপালের সেই হাতে। মনে মনে অনুভব করলুম এই সেই হাত, যে-হাত কখনও কোনও অপবিত্র কাজ করেনি। কারও কাছে নতি স্বীকার করেনি। আত্মবিশ্বাসে ইস্পাত কঠিন। প্রবল একটা শক্তির ধারায় আমি স্নাত হলুম। সমিধের অভাবে যে-যজ্ঞাগ্নি নির্বাপিত হয়ে এসেছিল, সেই আগুন আবার লকলকিয়ে উঠল। হরিশঙ্কর যেন উপনিষদের উদ্যত-বজ্র পুরুষ! কী আশ্চর্য! একটা সদ্ভাবের প্লাবন বয়ে চলেছে ভেতরে। কে যেন ভেতরে বসে বেদগান করছেন। প্রাণাগ্নয় এবৈতস্মিন পুরে জাতি। স্পর্শে প্রাণ অগ্নি জ্বলে উঠল। আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রইল বেশ। কিছুক্ষণ।
জামা শুকোতে দেবার গোটাকতক হ্যাঁঙার নিয়ে জয়নারায়ণ ঘরে ঢুকে বললেন, রেকনসিলিয়েশন হচ্ছে। বাঃ জাহ্নবী ও যমুনার মিলন! ঠিক এই মুহূর্তে পাখোয়াজের সঙ্গে ধ্রুপদ গাইতে ইচ্ছে করছে।
করলে কী হবে? তুমি তো বাজে কাজে ব্যস্ত হয়ে আছ।
জয়নারায়ণ শিশুর মতো মুখ করে বললেন, না না, আমি তো মেয়েদের দলে ঢুকে গজালি করছি না। একগাদা জামাকাপড় কাঁচলুম, আর তারই ফাঁকে ফাঁকে একটু কথা বলছিলুম।
জামাকাপড় মেয়েরা কেচে দিতে পারছে না?
বলেছিল। অফার দিয়েছিল। আমি পারি না। নিজের জামাকাপড় অন্যে কেচে দেবে ভাবলেও কেমন লাগে।
দ্যাটস গুড। চরিত্রটা তা হলে ঠিক রাখতে পেরেছ এখনও। ক্লীব হয়ে যাওনি!
জয়নারায়ণ লাজুক হেসে বললেন, এতদিনে আপনার কাছ থেকে একটা গুড ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট পেলুম। না, গান না-গেয়ে আর আর থাকা যাচ্ছে না। দিস ইজ হাই টাইম লাইক হাই টাইড।
তা হলে বসে পড়ো, আমি তোমার সঙ্গে তবলায় বসছি। হরিশঙ্কর উঠে পড়লেন। জয়নারায়ণ হ্যাঁঙার ক’টা বিছানার একপাশে রেখে মেঝেতে মাদুর বিছোলেন। হারমোনিয়ম এসে গেল। জয়নারায়ণ ধ্যানস্থ হলেন। হরিশঙ্কর তবলায় হাতুড়ির ঠুকঠাক শুরু করলেন। জয়নারায়ণ। হারমোনিয়মে হাত রাখলেন। একঝলক সুর খেলে গেল ছররার মতো। প্রথমেই নেমে এল সংস্কৃত
তমেব ভাণ্ডমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ॥
কঠোপনিষৎ-এর এই শ্লোকটি স্বামীজির অতি প্রিয় ছিল। সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি, জ্যোতিষ্মন যত কিছু সবই ব্রহ্মের কাছে নিষ্প্রভ। ব্রহ্মের আলোয় সবকিছু আলোকিত। ব্রহ্মের জ্যোতিতেই জগৎ আলোকিত। মাতুল জয়নারায়ণ নিমেষে তৈরি করে ফেললেন তপোবন হরিশঙ্কর স্তব্ধ। জয়নারায়ণ আড়া ঠেকায় গান ধরলেন। স্বামীজির সেই বিখ্যাত রচনা,
নাহি সূর্য, নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর,
ভাসে ব্যোমে ছায়াসম ছবি বিশ্ব-চরাচর।
বিছানায় উঠে বসলুম। মেয়েরা কাজ ফেলে ছুটে এসেছে। অক্ষয় কাকাবাবু রাঁধছিলেন মনে হয়, কোমরে গামছা জড়ানো, হাতে খুন্তি। পথ দিয়ে যেতে যেতে এক সমঝদার আহা আহা করে উঠলেন। আমার ভেতরে অন্যলোকের দরজা খুলে গেল। আরও দু’জন ঘরে এসে ঢুকলেন, যাঁদের এইসময় আসার কথাই নয়। আশ্চর্য ব্যাপার। একজন হরিদ্বারের সেই সন্ন্যাসী। অন্যজন মেনিদা। তবলা বাজাতে বাজাতে হরিশঙ্কর মাথা নত করে নমস্কার জানালেন। কাকিমা একটা আসন পেতে দিলেন সন্ন্যাসীকে। মেনিদা মেঝেতেই বসে পড়লেন।
মাতুল এক গান থেকে আর এক গানে চলে গেলেন। এইবার একতালা বাউল, আর কেন মন এ সংসারে, যাই চলো সেই নগরে/ যেথা দিবানিশি পূর্ণশশী আনন্দে বিরাজ করে। সঙ্গে সঙ্গে মেনিদার পকেট থেকে খঞ্জনি বেরিয়ে এল। সে কী গান! সকলেরই মাতোয়ারা অবস্থা। আনন্দের বন্যা বইছে। দক্ষিণের খোলা জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে গরম বাতাসের ঝলক খেলে যাচ্ছে। এমনই তালের খেলা আমার পা দুটো নাচতে চাইছে। একসময় শেষ হল গান। সবাই সন্ন্যাসীকে প্রণাম করছেন। আমি প্রণাম করতেই মৃদু হেসে বললেন, বেটা বাচ গিয়া।
অবাক হবারই কথা। জানলেন কেমন করে! দেখা গেল সবই তিনি জানেন, যা যা ঘটেছে। ছবির। মতো বলে গেলেন সব। এমনকী সাপের ছোবল। শেষে বললেন, বেটা তোমার মৃত্যু হত। তাই আমি তোমাকে অমৃত ফল খাইয়ে গিয়েছিলুম। তা হলে শোনো অদ্ভুত এক ঘটনার কথা। স্বপ্নে নয়, সন্ন্যাসীর আশ্রমে দিব্য শরীরে আমার মাতামহ দর্শন দিয়ে বলেছিলেন, নাতিটার একটা বিপদ আসছে, আপনি একটা কিছু করুন। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, বাকিটা প্রভুর কৃপা।
