হরিশঙ্কর ঘরে এসে একটা চেয়ার টেনে খাটের পাশে বসলেন। স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিলুম। মানুষকে ভেদ করার ক্ষমতা আছে ওই চোখে। হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, কী বুঝলে?
প্রশ্নটারই অর্থ খুঁজে পেলুম না। বললুম, আজ্ঞে?
ফিসফিস করে বাতাসের শব্দে বললেন, ডানার জোর না থাকলে পাখি উড়তে পারে না। তোমার ডানায় এখনও সেই জোর আসেনি।
একেই দুর্বল আমি, প্রখর সেই ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেকে কীটের মতো মনে হতে লাগল। ভেতরে যেন ছেঁড়া ন্যাকড়া ঠাসা। যারা কাগজ কুড়োয় তাদের কাঁধের বস্তার মতো। সৎ সাত্ত্বিক কোনও চিন্তা নেই। কেবল ঘিনঘিনে দেহবাসনা।
ডানাদুটো কী বলো তো? ভেবেছ কোনওদিন? ভাবার অবসর হয়নি। আদর্শ ও চরিত্র। আদর্শ কাকে বলে? সমস্ত জীবনের স্বাভাবিক পরিণতির দিকে নজর রেখে সফল জীবনের ছক তৈরি করা। চরিত্র হল, অভ্যাসের দাসত্ব না করা। নৌকোর দাঁড় দেখেছ? দু’পাশে দুটো। একই সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলে, জলে ওঠাপড়া করে। মন আর আদর্শ এই দুটো হল দাঁড় আর সংযম হল। দাঁড় বাইবার তাল, ছন্দ। কোনওটাই তোমার আয়ত্তে আসেনি। নিজেকে দর্শন করার ক্ষমতাটাও জাগাতে পারোনি। তোমার এখনও চোখ ফোটেনি। কুকুরের ছানা দেখেছ? সবে জন্মেছে? চোখ ফোটেনি? মায়ের কোলের কাছে সবক’টা একসঙ্গে তালগোল পাকাচ্ছে। একটাই প্রবৃত্তি, দুধ খাবে, কিন্তু অন্ধ। গুতোগুতি। হঠাৎ ঠোঁটে এসে গেল তো গেল। চোখ নেই, লক্ষ্য নেই, পরিকল্পনা নেই– আছে প্রবৃত্তি। তুমি সেই দৃষ্টিহীন কুকুরশাবক। প্রবৃত্তিমার্গে অন্ধের মতো তালগোল। পাকাচ্ছ। শুনতে তোমার খারাপ লাগছে। তোমার ফ্যাকাসে মুখ আরও ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে, কান্ট হেলপ। তোমাকে সুযোগ দিয়েছিলুম, নিজের মতো চলার। ইউ হ্যাভ ফেলড মিজারেবলি। কানামাছির মতো ঘুরপাক খেয়েছ। সাধনা করবে, সাধক হবে। সাধনা কাকে বলে? হোয়াট ইজ দ্যাট? কোনও ধারণা আছে? এনি আইডিয়া? প্রবেবলি নট। টেল মি, সাধু কাকে বলে?
হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম তাঁর মুখের দিকে। এতদিনের জমে থাকা সব তিরস্কার একসঙ্গে নেমে আসছে। সাধু কাকে বলে? কোনও সংজ্ঞা খুঁজে পাচ্ছি না। গেরুয়া? সংসার ত্যাগ? কোনটা? আশ্রম? ধ্যানধারণা? নিরামিষ আহার? মাথায় আসছে না। মিউমিউ করে বললুম, কাকে বলে?
হরিশঙ্করের ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসি খেলে গেল, খুব সহজ আবার খুবই কঠিন সাধনার পথ। স্মৃতি কাকে বলে জানো?
আমি যেন ইন্টারভিউ দিতে বসেছি। কোনওরকমে বললুম, মনে রাখাটাই স্মৃতি।
হরিশঙ্কর মৃদু হেসে বললেন, প্রায় হয়েছিল। শুধু একটা একারের জন্যে হল না। মনে রাখা নয় মন রাখা। কোথায় রাখবে? রাখবে নিজের কর্ম, নিজের প্রবৃত্তির ওপর। মনের তিন অবস্থা, সংকল্পক মন, অস্মিতা বা অহংকার মন, আর বুদ্ধিতত্ত্ব বা মহত্ত্ব মন। এই তিনটে আলাদা আলাদা নয়। এক জায়গায় জড়াজড়ি হয়ে বসে আছে। কেমিস্ট্রির ছাত্র তুমি। তোমার সহজেই বোঝা উচিত। একে বলে, কম্পাউন্ড বা যৌগ। সাধকের কাজ হল বিশ্লেষণ। তিনটেকে আলাদা করে বোঝার স্থির। চেষ্টা। সংকল্প যেখানে ওঠে তাকে বলা হয় মন। এর ঠিক ওপরের যে আমি-বোধ তাকেই বলা হবে অস্মিতা বা অহংকারতত্ত্ব। সেইটাই আমাদের প্রথম আমিত্ববোধ। এই আমির নিয়ন্ত্রণে আমাদের। সমস্ত কাজ। এক মহাসাধকের সুন্দর একটি উদাহরণ শোনো। এক গৃহকর্তার পাঁচজন ভৃত্য। কর্তা সবার ওপরে থেকে সকলে খাটান। সকলের কাজকে সুসমঞ্জস করেন। একজন মালী হয়তো গাছ। লাগালে, আর একজন তাতে জল দিলে, একজন চারপাশের আগাছা উঠিয়ে ফেললে। এমন কখনই হবে না, একজন যখন গাছ লাগাল, অপরজন এসে তা উপড়ে দিল। এই যে সকলে মিলেমিশে কাজ করে তার একটাই কারণ, ওপরে একজন কর্তা, একটা আদর্শ, একটা নির্দেশ আছে। মনের ওপরের স্তর থেকে নীচের স্তরের দিকে লক্ষ রাখাটাই হল সাধনা। ধরো আমার মনে রাগ আসছে। সাধারণ মানুষ রেগে সব তছনছ করবে। সাময়িক উন্মাদ হয়ে যাবে। সাধকের কী হবে? সঙ্গে সঙ্গে ওপরের মন টের পাবে, আমি রাগতে চলেছি। রাগ আমার ক্ষতি করবে। আমি রাগব না। আমার ভোগবাসনা আসছে, আমি ভোগ করব না। আমার আলস্য আসছে, আলস্যে গা ঢেলে দেব না। সংকল্প করা আর সংকল্প রক্ষা করাই হল নীচের মনের ওপর ওপরের মনের নিয়ন্ত্রণ। একেই বলে স্মৃতি সাধনা। তুমি মানুষ, তোমার নীচের স্তরে অস্থিরতা থাকবে। তা থাকুক, ক্ষতি নেই, কিন্তু ওপরের স্তর থেকে যেন লক্ষ থাকে। স্বস্থ মানে আত্মস্থ, আত্মস্থ মানে আমি কী করছি তা লক্ষ রাখা। রাগে আত্মভাব হারিয়ে ফেলছি। ভাঙছি, চুরছি, গালাগাল দিচ্ছি। কাজটাই সেখানে বড় হয়ে উঠছে
আর যে কাজ করে সেই আমি হয়ে যাচ্ছে তার ভৃত্য। সাধু কে? না যিনি তার নীচ প্রবৃত্তির ভৃত্য। নন। বৌদ্ধদের নিধ্যান আর সম্প্রজন্য সাধনও এইরকম। নিধ্যান মানে ভেতরে ভেতরে স্মরণ করা। অভীষ্ট স্থির করো। অভীষ্ট চিন্তা করো। অভীষ্ট কী তা বলা হল না। সেটা তোমাকেই বেছে নিতে হবে। সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা করে দেখতে থাকাটাই হল স্মৃতিসাধন। তোমার পক্ষে কি স্বস্থ থাকা সম্ভব? ঈশ্বর তোমার ভেতরেই আছেন। সদা বসন্তং হৃদয়ারবিন্দে। স্বস্থ না হলে দর্শন। তো পাবে না বাপু। তুমি তো অস্থির! তুমি তো তোমার দেহের ভৃত্য। তোমার প্রবৃত্তি তো তোমাকে বাদর নাচ নাচাচ্ছে। কী? শুনতে খুব খারাপ লাগছে, তাই না?
