অক্ষয় কাকাবাবুই বললেন, একে আমরা পুনর্জন্ম বলতে পারি হরিদা।
ওটা তোমার মেয়েলি সাবজেক্ট অক্ষয়। আই বিলিভ ইন সায়েন্স। একে বলে চান্স সারভাইভাল। হয়ে গেছে। বেঁচে গেছে। অ্যান্ড দেয়ার ইজ সায়েন্স ইন ইট। তবে হ্যাঁ, সাপের ছোবলটা না খেলে কী হত? বা শুধুই যদি সাপের ছোবল হত? উইদাউট ইরিসিপ্লাস। এ ম্যাটার অফ ইনভেস্টিগেশন? লাক্ শব্দটা যখন বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, লেট আস অ্যাকসেপ্ট ইট। তবে, উই হ্যাভ এ ফাইন টিম হিয়ার। এ পারফেক্ট সেবাদল। ডাক্তার সেন, আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ, জাস্ট ওয়ান ক্ল্যারিফিকেশন। সেকবাইটের রোগীকে কখনও ঘুমোতে দিতে নেই। বাট হিওয়াজ ইন এ কোমা। হাউ ক্যান ইউ এক্সপ্লেন।
ডক্টর সেন হেসে বললেন, আই ডিডন্ট অ্যালাউ হিজ সিস্টেম টু স্লিপ। কেপ্ট হিম অ্যাওয়েক ইনসাইড।
হরিশঙ্কর হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, গেট আপ। গেট আপ। অনেক দিন শুয়ে আছ। অনেক সময় নষ্ট করেছ। অনেকের সময় নষ্ট করেছ। উঠে পড়ো। মনের জোর করো।
কাকিমা বললেন, এখনও বড় দুর্বল। মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। ও উঠবে। ঠিক উঠবে। একটু খাওয়াদাওয়া করুক।
জবার সঙ্গে চোখাচোখি হল। জবা কোনও কথা বলেনি, সাহস পায়নি বলার। রাত জাগার ছাপ মুখে। মনে মনে জবাকে নমস্কার করলুম। আমার জন্যে তুমি যা করলে, তার তুলনা নেই। এর কোনও প্রতিদান হয় না। সুরঞ্জনা বললে, আমরা তো সব আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। মেসোমশাই, আপনার নার্ভ হল স্টিলের নার্ভ। আমরা এমন দেখিনি।
হরিশঙ্কর বললেন, ডোন্ট ফোমেন্ট মাই ইগো। তোমার বাবার নার্ভও কিছু কম যায় না। কলকাতার দাঙ্গার সময় আমরা দেখেছি। আচ্ছা এইবার কাজের কথা। নাও উই হ্যাভ আর্নড এ গুড কাপ অফ টি। তোমরা বোসো, আমি করে আনি।
জবা পাশ থেকে সামনে এসে বললে, আমি করছি, আপনারা বসুন।
হরিশঙ্কর বললেন, এই একটা মেয়ে। নেভার গেটস টায়ার্ড। কেউ তোমাকে সাহায্য করুক তা হলে?
সুরঞ্জনা বললে, আই ভলানটিয়ার।
সুরঞ্জনা আর জবা একেবারে মাথায় মাথায়। দু’জন বেরিয়ে গেল। ডক্টর সেন উঠে দাঁড়ালেন, যাবার আগে একটা কথা বলে যাই, যদি ব্ল্যাক স্টুল হয়, ডোন্ট গেট নার্ভাস।
হরিশঙ্কর বললেন, জানি। আপনি চা খাবেন না?
এক্সকিউজ মি। আমার একটু তাড়া আছে।
হঠাৎ মনে হল, একজনকে দেখছি না কেন? মেনিদা? কাকেই বা জিজ্ঞেস করি! সাহস হচ্ছে না। অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, আমি তা হলে বড় করে একটা বাজার করে আনি।
হরিশঙ্কর বললেন, অফ কোর্স। আজ আমরা খাব।
জয়নারায়ণ বললেন, নিশ্চয় শাক্তমতে?
তুমি যখন আছ শাক্ত না হয়ে উপায় কী!
মাথাটা তরল হয়ে গেছে, যেন টলটলে জলের মতো। গালে হাত দিলুম। দাড়ি। মুখটা চুপসে গেছে। টিপ একটু ফাঁক পেয়ে এগিয়ে এল। প্রশ্ন করার আগেই বললুম, বেশ ভালই মনে হচ্ছে, জানো? আর কোনও কষ্ট নেই।
টিপ বললে, উঃ কী সাংঘাতিক কাণ্ড! তুমি কিছু জানো, এই ক’দিন কী হল?
বাইরে কী হয়েছে জানি না, ভেতরে যা হয়েছে তোমাকে একদিন বলব।
মুকু কিন্তু কাছে ঘেঁষছে না। দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালে পিঠ রেখে। গলায় তেমন জোর পাচ্ছি না। ওরই মধ্যে যতটা সম্ভব গলা চড়িয়ে বললুম, তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
মুকু গম্ভীর গলায় বললে, ওসব কথা এখন থাক।
তবে থাক। আমার চোখ বুজে আসছে আবার। ভীষণ দুর্বল। খালি বাড়ি আবার ভরে উঠেছে। বহু চরিত্রে সরগরম। কথা, শব্দ। কেউ যদি আমাকে এক কাপ চা দিত! চা যেন সুখ আর জীবনের প্রতীক। আমার জীবনের যত নারী সবাই আজ এক পরিচ্ছেদে সমবেত হয়েছে। পুরাকালে স্বয়ংবর সভায় রাজকুমাররা আসতেন। রাজকন্যারা বেছে নিতেন যে-কোনও একজনকে। এই সভায় রাজকন্যারা এসেছেন। হরিশঙ্কর কুমারকে বেছে নিতে হবে যে-কোনও একজনকে। নিজেকেই নিজে তারিফ করলুম, ক্ষমতা রাখিস পিন্টু! শুয়ে শুয়ে কী খেলই দেখালি! সেই সংগীত:
চিড়েতন হর্তন ইস্কাবন
অতি সনাতন ছন্দে করতেছে নর্তন
কেউ বা উঠে কেউ পড়ে,
কেউ বা একটু নাহি নড়ে,
কেউ শুয়ে শুয়ে ছুঁয়ে করে কালকর্তন ॥
তাসের দেশের রাজা চেত্তা খেয়ে পড়ে আছে। তাও তার কত রোয়াব! কাকিমা খাটের তলা থেকে কী একটা বের করে বললেন, আজ কি তোমার বেডপ্যান লাগবে? না বাথরুমে যেতে পারবে?
লজ্জার কুঁকড়ে গেলুম। ছিছি। এ ক’দিন তা হলে শুয়ে শুয়ে ছুঁয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করেছি। লজ্জা! ছিছি লজ্জা!
আজ আমি মরে গেলেও বাথরুমে যাব।
ঠাকুরপোকে জিজ্ঞেস করি, ভাল করে গরম জলে চান করো। তোমার জন্যে জবা যা করেছে কেউ কারও জন্যে অমন করে না। আমরা তো স্রেফ দর্শকের মতো দেখেই গেলুম। এমন সেবা দেখা যায় না। ও না থাকলে তোমার কী হত?
বাবা কি রাঁচিতে আপনাদের কাছেই ছিলেন?
না, কারও আশ্রয়ে থাকার মানুষ উনি নন। সে তো তুমি জানোই।
তা হলে?
কাছাকাছিই ছিলেন। পুরুলিয়ায়।
কার কাছে খবর পেলেন?
পরে শুনো। তার কাছেই শুনো। আমার বলা বারণ।
সবাই যখন চলে গেলেন, মুকু এসে বসল আমার মাথার কাছে, খুব কাহিল হয়ে গেছ। আমার চলে যাওয়াটাই ভুল হয়েছিল। আমি থাকলে এই বিপদ তোমার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারত না।
আমি তোমার মাদুলি।
তুমি কোথায় ছিলে?
সুরঞ্জনাদের বাড়িতে।
সুরঞ্জনা? সুরঞ্জনার দাদা ফিরেছেন?
২.৩২ You stand upon the threshold
আবার জেগে উঠেছে প্রেতপুরী। ভেতর থেকে ভেসে আসছে মেয়েদের কলকাকলি। প্রবল শব্দে কে কাপড় থুপছে? আমি চিত হয়ে পড়ে আছি বিছানায়। রান্নার সুবাস আসছে নাকে। দুর্বল শরীর স্বপ্ন দেখছে। অতীত যেন ফিরে আসছে। একঘরে জ্যাঠামশাই আর একঘরে বাবা। মা আর জ্যাঠাইমা হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে কুটনো কুটছেন। রাঁধুনি বামুন তেলে ফোড়ন ছেড়েছেন। সুখী বেড়ালটা একপাশে থুপ্লি মেরে বসে আছে আধবোজা চোখে। কী সদ্ভাব, কী ভরভরন্ত চেহারা সংসারের! একটা হাবাগবা ইজের-পরা ছেলে ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। লাল চকচকে মেঝে। চুনকাম করা সাদা দেয়াল। জ্যাঠামশাই নিঃসন্তান। সংসারের একটি মাত্র ছেলে, তার কত আদর! সুখ হল শিশিরের মতো। ভোরের নরম আলো যতক্ষণ, ততক্ষণই তার আয়ু। কাল এক নিষ্ঠুর ধুনুরি। সুখের তুলো সব পিজে দেয় তার যন্ত্র চালিয়ে। সবাই গেছে চলে, একটি মাধবী শুধু…।
