হঠাৎ জবা চমকে উঠল। ওটা কী?
জবা আড়ষ্ট কাঠ। কী দেখেছে! জবা অতি সন্তর্পণে আমার মাথা ও পাছার তলা দিয়ে তার হাতদুটো চালিয়ে দিয়ে খুব সাবধানে বিছানা থেকে তুলে নিল। প্রায় পাঁচফুট নইঞ্চির মতো দীর্ঘ সুঠাম শরীর। জবার কোনও অসুবিধেই হল না। আমাকে তুলে নিয়ে একপাক ঘুরে যেতেই ভোরের মৃদু আলোয় চোখে পড়ল, মাথার বালিশ আর খাটের সীমানা ঘেঁষে বিছানার খাজ ধরে গলগল করে চলেছে মেটে লাল রঙের একটা সাপ। ঠোঁটের সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে আমি আর্তনাদ করে উঠলুম, সাপ সাপ।
জবা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে আমাকে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে মুকু যে তক্তাপোশে শুত তার ওপর ধীরে ধীরে শুইয়ে দিল। সাপ কোথা থেকে এল! অত বড় সাপ! পুরনো বাড়ি, সাপের অভাব নেই। একতলায় হামেশাই দেখেছি, দোতলায় এই প্রথম। আগে পিছনের সিঁড়িতে সন্ধের দিকে প্রায়ই কামিনীভোগ চালের পায়েসের গন্ধ পেতুম। হরিশঙ্কর একদিন রহস্যটা বলেছিলেন, বাস্তু সাপ বেরোলে অমন গন্ধ বেরোয়। পরে একদিন দেখিয়েও ছিলেন। বেঁটে, চওড়া, শ্যাওলার মতো গাত্রবর্ণ। বয়েসের কোনও ঠিকঠিকানা নেই। হরিশঙ্কর সাপ মারা একদম পছন্দ করতেন না। বলতেন, সাপ তো মানুষ নয় যে অকারণে মানুষের ক্ষতি করবে! সাপ পোষার এই ফল।
জবা বললে, তোমার একটু কষ্ট হল, এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। তুমি শুয়ে থাকো, আমি দেখে আসি চলে গেল কি না?
জবা চলে যাচ্ছিল, আঁচলটা চেপে ধরে বললুম, আমার ডান হাতের এই জায়গাটা দেখো তো।
জবা ঝুঁকে পড়ল। স্বপ্নে যে-জায়গাটায় হরিশঙ্কর ছুঁচ ফুটিয়েছিলেন সেই জায়গাটা দেখতে বললুম। জবা দেখে বললে, কী ব্যাপার বলো তো? একটা কিছু ফুটেছিল?
একটা মৃদু হাসি খেলে গেল ভেতরে, শাবাশ! অক্ষয় কাকাবাবু, অভ্রান্ত আপনার গণনা। ডবল আক্রমণ। ওই দাগটা আর কিছুই নয়, সাপের ছোবল। হরিশঙ্করের উঁচ নয়। তিন দিনের মধ্যে বিপদ আসছে। সেই বিপদের চেহারা যে এইরকম হবে কে জানত।
জবা প্রশ্ন করলে, কী ফুটল বলো তো? আমার কিছু? হাতের নোয়া? সেফটিপিন?
মনটা আমার বিশাল সমুদ্রে ভেসে চলা ছোট্ট নৌকোর মতো হয়ে গেছে। যেতেই হবে, যেতেই হবে। কোনওরকমে বললুম, জবা, হয়ে গেছে। ফিনিশ। ওটা সাপের ছোবল। একটু আগে মনে হল একটা ছুঁচ ফুটল। তখনই আমি তোমাকে ডেকেছিলুম।
জবাব মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল, সে কী? সর্বনাশ! তা হলে তো ওর ওপরে একটা বাঁধন দিতে হবে। দাঁড়াও।
বাঁধনে কী হবে জবা? যেখানে কামড়েছে সেটা মাথার খুব কাছে।
আর আমার সামান্যতম শক্তি নেই। ঠোঁটের যন্ত্রণাও আর অনুভব করতে পারছি না। শরীর একেবারেই এলিয়ে গেল। সাপের বিষে এইরকমই হয়তো ঘোর লাগে। তারই মধ্যে দেখলুম জবা শাড়িটা খুলে ফেলল। তারই মধ্যে একঝলক ভেবে নিলুম, আহা! জবার শরীরটা কী সুন্দর! ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নারী। একই নারীর কত রূপ! জবা সায়ার দড়ি খুলছে। একটানে ফস করে দড়িটা খুলে কোমরের একটু নীচে সায়াটাকে.কোনওরকমে গাঁট দিয়ে সামলে রাখল। গভীর নাভির দিকে আমার আচ্ছন্ন চোখ চলে গেল। মৃত্যুটা আমার খুবই সুখের হতে চলেছে। নানারকম বিভীষিকা দেখে মরতে হচ্ছে না। জবৗ আমার হাতে দড়ির ফাস পরাতে লাগল। জবার দেহের উত্তাপে দড়িটা গরম। মনের কল্পনাও হতে পারে। ব্লাউজে দুটো সেফটিপিন। সাপটা কি চলে গেছে। এ ঘরে আসবে না তো! এক ঝটকায় কে যেন আমাকে অচেতনায় তলিয়ে দিল।
কটা দিন চলে গেছে, কে জানে? আমার মরা হল না। চোখ মেলে তাকালুম। স্বপ্ন দেখছি না তো? সামনেই হরিশঙ্করের মুখ। সেই সোনার চশমা। তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল চোখ। মুখে অদ্ভুত একটা জ্যোতি খেলছে। পাশেই মাতুল জয়নারায়ণ। তার পাশেই জবা। জবার পাশে মুকু, মুকুর পাশে টিপ। টিপের পাশে সুরঞ্জনা। সুরঞ্জনার পাশে টিপের মা। তার পাশে কাকিমা। কাকিমার পাশে অক্ষয় কাকাবাবু। ভাবছি পুনর্জন্ম হল কি না!
হরিশঙ্কর তাঁর সেই পরিচিত ভঙ্গিতে একটা আঙুল তুলে বললেন, ক্রাইসিস ইজ ওভার।
আমি হাত জোড় করে নমস্কার করলুম। তিনিও হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। এই হলেন আমার পিতা। এটিকেট, ম্যানার্স, ফর্মালিটি। অতুলনীয়। শুয়ে আছি বড়ঘরে। পিতারই খাটে। খাটের পাশে একটা স্ট্যান্ড। দুটো বোতল ঝুলছে। তার মানে আমাকে ড্রিপ দেওয়া হচ্ছিল। নিজের মুখটা খুব দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল। খুব হালকা মনে হচ্ছে। কোনও জ্বালাযন্ত্রণাও নেই।
জয়নারায়ণ বললেন, মিরাক। যমে মানুষে টানাটানি অ্যান্ড যম মিজারেবলি ফেলড্।
এই মেয়েটার কাছে যম হার মেনেছে। হরিশঙ্কর জবার পিঠে হাত রাখলেন। এ সব জানে। বাঁধন দিয়েছে। ইনসিশন করে সা করেছে। হোয়াটএভার ইট মে বি, দ্যাট ওয়ার্কড।
মাথার কাছে কেউ একজন বসে আছেন, তাঁর গলা, এটা হল ডিভাইন গ্রেস। যেটুকু ভেনাম রয়ে গেল দ্যাট ফট আউট ইরিসিপ্লাস। ইরিসিপ্লাসে কেউ সারভাইভ করেছে, দিস ইজ ভেরি রেয়ার। ডক্টর সেনের গলা। কতদিন কতক্ষণ আমার মাথার কাছে বসে আছেন জানি না। কাকিমা আমার কাছে এগিয়ে এলেন। চিনতে পারছ?
আমি একটু হাসলুম। চেহারা বেশ ভাল হয়েছে। গালদুটো লাল। কুচকুচে কালো ছবির মেয়েদের মতো চুল। অনুমান করার চেষ্টা করলুম, কী ঘটে গেছে এই কদিনে? মামা এসেছেন। ফিরে গেছেন। হরিশঙ্কর কোথায় তিনি জানতেন। তাকে নিয়ে এসেছেন। মুকু আর সুরঞ্জনা কেমন করে এল!
