আমার জ্বরের বিকারে মহাজীবন অরণ্যে একটা মায়ামৃগের পেছনে সুপ্ত ইচ্ছার ধনুর্বাণ নিয়ে। ছুটতে লাগলুম। কত কী দেখছি জীবনের শেষ পাতায় এসে। জবা কালো চুলে ঘষে ঘষে তেল মাখছে। দু’হাতের বাড়তি তেল মুখে মাখতে মাখতে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। গায়ে জামা নেই। শাড়ির আঁচল। মেয়েরা তেল মাখলে ভীষণ ভাল দেখায়। তেলের মিষ্টি লেবুলেবু গন্ধ। জবা আমাকে বলছে, উনুনে ডাল চাপানো আছে। আমি ঝট করে চানটা করে আসি। তুমি একটু নজর রেখো। এসে বাবাকে চা করে দিচ্ছি। রান্নাঘরটা হবে বাইরে বাগানের একপাশে। বাথরুমে জল। পড়ার শব্দ। বাঁধানো নর্দমা দিয়ে ভেসে ভেসে যাবে সাবানের ফেনা। জবার মসৃণ বুক-পিঠ-তলপেট বেয়ে ফুলের মতো নেমে এসেছে গোলাপ, চামেলি। সব যেন ধন্য ধন্য রবে ছুটে চলেছে। ভীষণ একটা সুখের দৃশ্য। স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার সুস্থ দৃশ্য।
দিনের শেষ আলোটুকু সরে গেল। কেউ নেই। জবা গেছে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ আনতে। কোনওরকমে উঠলুম। আলোটা জ্বালতে হবে। এক একবার পা ফেলছি, গোটা মুখ ঝনঝন করে উঠছে, জল-ভরতি হটব্যাগের মতো। আয়নার সামনে দাঁড়াবার সাহস হল না। হয়তো নিজের। বদল ঘটোৎকচ ভেসে উঠবে। ভাল দেখতেও পাচ্ছি না। চোখ ঢেকে গেছে। আবার এসে শুয়ে পড়লাম। একটা মাথার চুলের কাটা পড়ে আছে। ভঙ্গিটা দু’পা ছড়ানো মৃত সৈনিকের মতো। জবার চুল থেকে খুলে পড়েছে। আলোটাকে মনে হচ্ছে থলথলে মাছের পিত্ত।
কখন কী হল! ঘর ভরে গেছে। অনেকে এসেছেন। টিপ, টিপের মা, জবা। বিষ্টুদার গলাও পেলুম একবার। ঠোঁটটা সাবধানে ফঁক করিয়ে জবা কিছু পাউডার ঢেলে দিল মুখে। কোথা থেকে একটা ফিডিং কাপ এনেছে। ফলের রসের মতো কী একটা চলে গেল ভেতরে। কপালে কার নিশ্বাস পড়ল। টিপের। আমাকে ঘিরে মহা কাণ্ড চলেছে। সকলেই এসেছেন আমাকে বিদায় জানাতে। জাহাজ কখন বন্দর ছাড়ে!
একে একে পায়ের শব্দ নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। ঘরে আবার বাতাস খেলল। শুধু জবা ফুলের মতো ঝুঁকে আছে আমার দিকে। মনে হল চোখদুটো ছলছল করছে। অতি কষ্টে বললুম, তুমি এইবার বাড়ি যাও।
আর তুমি? টসটস করে কয়েক ফোঁটা জল পড়ল আমার বুকে।
২.৩১ Nothing at all but three things
ঘরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। মধ্যরাত। মামা আজ আর ফিরলেন না। কলকাতায় তার কত বন্ধু। শ্বশুরবাড়ি। সুন্দরী শ্যালিকা। মামা আনন্দ করছেন। জবা আমার পাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে। তার ডান হাতটা আমার বুকে। মোটা শাখা। লোহার একটা বালা। কয়েক গাছা চুড়ি। মানুষ কত যন্ত্রণাই সহ্য করতে পারে! আমার গোটা মুখটা হুহু করে জ্বলছে।
হঠাৎ মনে হল, হরিদ্বারের সন্ন্যাসী আমাকে একটা ফল খাইয়েছিলেন। বলেছিলেন, অমৃতফল। সেই ফল খেয়ে আমার কী লাভ হল! দেহ-যন্ত্রণা, দেহ-বাসনা সবই তো রয়েছে। কোনওটাই তো গেল না। জবাকে মনে হচ্ছে আমার কত কালের বিয়ে করা বউ। সব বাজে সব মিথ্যে। সবই মানুষের ইচ্ছাপূরণ কল্পনা। মানুষ ভাবে, এই হল এই হবে। কিছুই হয় না। যা হবার তাই হয়। যদি আমি সেরে উঠি ঘোরতর নাস্তিক হয়ে যাব। যা মন চাইবে তাই করব।
ভাবামাত্রই ভেতরে একটা শব্দ হল মড়মড় করে, যেন হাড়গোড় সব ভেঙে গেল। একটা কাঠামো ধসে পড়ল যেন। মরেছে, এইভাবেই বোধহয় মৃত্যু আসে। মরার অভিজ্ঞতা তো নেই আমার। জবার হাতে চাপ দিলুম। বোধহয় তন্দ্রা এসেছিল। একটু চমকে উঠল, কী হল?
তুমি কোনও শব্দ শুনতে পেলে? অতি কষ্টে জড়িয়ে জড়িয়ে বললুম।
কই না তো? কীসের শব্দ?
আমি কী বোকা! জবা কেমন করে শুনতে পাবে আমার অন্তরের অলৌকিক শব্দ! এ তো আমার সংস্কার ভেঙে পড়ার শব্দ। এ-ও আমার মনের ভুল। সংস্কার একটা মনের ভাব, বস্তু নয়, তার আবার ভেঙে পড়া কী!
জবা আমার কপালে হাত রেখে বললে, বেশ জ্বর। তোমাদের বাড়িতে সব আছে, একটা থার্মোমিটার নেই। তোমার আর একবার ওষুধ খাবার সময় হল। ট্যাবলেটটা গুঁড়ো করি। জবা উঠে পড়ল। বাড়িঘর ছেড়ে আমার জন্যে মেয়েটার কী শাস্তি! এ ঋণ আমি কেমন করে শোধ করব? একটা ভাল শাড়ি! একটা হার! হবে না। উপহার দিয়ে সব ঋণ শোধ করা যায় না। বোতলের পেছন দিয়ে জবা ট্যাবলেট গুঁড়ো করছে। ঠুকঠুক শব্দ। নিস্তব্ধ রাত। ঘড়ির টুকটুক পদশব্দ। দূরে কুকুরের ডাক। আমি চলে যাচ্ছি এই সুন্দর প্রেম-প্রীতির পৃথিবী ছেড়ে। জবা মেঝেতে বসে আছে। তাকাচ্ছি, ভাল দেখতে পাচ্ছি না। চোখে পরদা পড়েছে। রাত ভোর হবার আগেই হয়তো থেমে যাবে আমার যন্ত্র! মৃতজনদের দেখতে পাচ্ছি। আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই হাসছেন। আর দেরি কেন? মায়ার খাঁচা খুলে বেরিয়ে এসো। আকাশ কত নীল!
অনেক কসরত করে জবা আমাকে ওষুধটা খাওয়াতে পারল। সে এক পর্ব। লজ্জা করছে, হাসিও পাচ্ছে। অসুস্থ দেহ, টগবগে মন, পাশেই ভোগ, কিছুই করার উপায় নেই। তখনই যেন অমৃত ফলের রহস্য পরিষ্কার হল। সন্ন্যাসী জানতেন, আগুন আর ঘৃত পাশাপাশি আসবে, এমন একটা অবস্থা করে দাও যাতে মাথা তুলতে না পারে। তারপর নারীতে মাতৃদর্শন হোক। একটু একটু করে দুধ খাওয়াচ্ছে, ওষুধ খাওয়াচ্ছে, বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। প্রবল যন্ত্রণার মধ্যে মায়ের দর্শন।
জবা একটা কঁচা টাকা আমার কপালে ঠেকিয়ে ঠাকুরের ছবির কাছে রেখে এল। মায়েরা ছেলের আরোগ্য কামনায় এইরকমই করে। সেরে উঠলে পুজো দেওয়া হবে। আমি ধীরে ধীরে আবার একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছি; আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়ালেন মিশনারিদের মতো সাদা পোশাক পরা এক মূর্তি। প্রথমে চিনতে পারিনি। অন্ধকারে এক ছায়ার মতো। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। সাদা পোশাকে একটি অন্ধকার মুখ। চোখদুটো আলপিনের মতো জ্বলছে। হঠাৎ একটা সোনালি আলো ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল মূর্তির শরীরে। জল যেমন কাগজে শুষে যায়, সেইভাবে আলোটা ভেতর থেকে ফুটে উঠছে। ক্রমশই উজ্জ্বল হচ্ছে। আলোয় ভেজা এমন এক সুঠাম মানবকে চোখের সামনে দেখে চেতনা স্তম্ভিত। এই কি দেবদূত! মৃত্যুর প্রাক মুহূর্তে যাঁর আগমন হয়! তলার দিক থেকে আলো পড়ল মুখে। চমকে উঠলুম। স্বয়ং হরিশঙ্কর এসেছেন দুয়ার খুলে দিতে। একটা ভয় ছড়িয়ে পড়ল, পাশেই জবা। জবাকে দেখে যদি তিরস্কার করেন, এখনও গেল না আঁধার, এখনও রহিল বাধা/ এখনও মরণব্রত জীবনে হল না সাধা ॥ হরিশঙ্করের মুখ পাথরের মতো। সেই বজ্রকঠিন মুখ। যে-মুখে তিনি সংসার-সমস্যার মুখোমুখি হতেন। যে-মুখের সামনে কারও ক্ষমতা হত না মুখ তুলে দাঁড়াবার। হরিশঙ্কর দুটো হাত নিজের চোখের সামনে তুলে ধরলেন। হাতে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। ভেতরে টলটল করছে সাদা তরল পদার্থ। সিরিঞ্জের গায়ের কালো কালো রেখা সুস্পষ্ট। হরিশঙ্কর সামনে ঝুঁকে আমার হাতে প্রিক করে চুঁচটা ফুটিয়ে দিলেন। সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল পিপারমেন্টের অনুভূতি। ভীষণ একটা আরামে আঃ করে উঠলুম। সাদা আলখাল্লা পরা হরিশঙ্কর সেজ নেবার মতো ধীরে ধীরে নিবে গেলেন। কানে এল জবার গলা, কী হল? খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার? জবার মুখ হেঁট হয়ে আছে। আমার মুখের ওপর। কানের দুল টুলটুল করে দুলছে। সোনার চেনে বাধা পাথর-বসানো লকেট আমার বুকে নেমে এসেছে। কথা বলার ক্ষমতা নেই আমার। ডান হাতে তার ওপর বাহুটা চেপে ধরলুম। নরম তুলতুলে। জবার নরম বুক চেপে আছে আমার বুকের একপাশে। স্পঞ্জের মতো ওঠানামা করছে।
