পিতা বললেন, কানের পাশে এই তূর্যনাদ চলতে দেওয়া ঠিক হবে না। আমাদের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়ে যাবে। ঠেলে তুলতে হবে।
সেটা খুব অভদ্রতা হবে।
এই, এই হল বাঙালি মেন্টালিটি। নোলক-নাড়া বউদের স্বভাব। সঁতে দাঁত চেপে সহ্য করব আর পুকুরঘাটে গিয়ে চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করব। ইয়োররাপের রীতিটা কী জানো? সোজা মুখের ওপর বলা, ইউ আর এ নুইসেন্স। আমার একটা হাই উঠল। খুবই অনুচিত কাজ। তবে আবেগ তো! বেগ চাপা যায় না।
পিতা বললেন, ইউ আর এ নুইসেন্স বুঝলে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
এইটা হল ইয়োরোপিয়ান অ্যাপ্রোচ।
হাইটা চাপতে পারলাম না। চেষ্টা করেছিলুম। ছপ্পর ফুঁড়ে বেরিয়ে এল।
তোমাকে বলিনি। হাইয়ের পাংচুয়েশানে আগের কথার জের টানলুম। তোমাকে ডিরোজিওর জীবনের একটা গল্প বলি। জানো তো তিনি কে ছিলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
হিন্দু কলেজে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে। ডিরোজিও দেখছেন। হঠাৎ একটা ছেলে এসে সামনে আড়াল করে দাঁড়াল। যেমন তোমরা করো আর কী? ডিরোজিও বললেন, মাই বয়, ইউ আর নট ট্রানসপেরেন্ট। একেই বলে ইংলিশ অ্যাপ্রোচ। অভদ্র না হয়েও কাজের কথাটি বলে ফেলা।
কিন্তু যিনি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন তাঁকে আপনি কী বলবেন? না ট্র্যানসপেরেন্ট, না ওপেক, ডেড।
দেখবে তা হলে! ব্যাপারটাকে কতদূর ফানি করে তোলা যায়! দেখো তা হলে।
বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লেন। চামচিকি উড়ে চলে গেছে শেষ চক্কর মেরে। আলো জ্বলে উঠল। মেঝেতে শতরঞ্জি পড়ল। কিছুই বুঝতে পারছি না। ঘটনা কোন দিকে যাবে। কী করতে চলেছেন। নিচু হয়ে খাটের তলা থেকে বাঁয়া তবলা টেনে বের করলেন।
হাঁটুতে ধীরে ধীরে চাপড় মারলেন বারকতক। তাল বোঝার চেষ্টা করছেন। নাকের ডাকেরও তাল আছে! দেখি কোন তালে ভেড়ে! তবলায় চাটি পড়ল। নেহাত বাগানঘেরা ভুতুড়ে বাড়ি! তা না হলে প্রতিবেশীরা ডান্ডা নিয়ে তেড়ে আসত। তবলা বোল ভাঙছে। বাঃ নাক দেখছি ঝাঁপতালে চলেছে।
মিনিট দশেক হয়ে গেল, তবলা উদ্দাম বেজে চলেছে, ধা ধা, ধা, ধিনতা তা। ধাগে নাগে বাগে পেলে, ধিক্কার দিয়ে যা। ভুরুকুটি, মুকুটি, ভিরকুটি, ফেঁসে যা, ধসে যা, ধা, ধা, ধিনতা,কৎ। যেনাক ডাকে, সে কানে শুনতে পায় না। আর মেয়েরা একবার ঘুমোলে মৃত। বেহুলার কথা মনে নেই! লক্ষ্মীন্দর ঠ্যালা মারছে আর বলছে, উঠ উঠ বেহুলা/সায়াবেনের ঝি। তোরে খাইল কালনিদ্রা/ মোরে খাইল কী! আমাদের মেনিদা তো প্রায়ই সদর দরজার একটা পাল্লা কাঁধে করে রাতে গৃহপ্রবেশ করেন। শ্রীমতী মেনির এমনই ঘুম। দেয়ালে পাল্লা ঠেসিয়ে রেখে একটু দম নিয়ে স্ত্রীর নাক টিপে ধরেন। একটু হাঁসফাস করে চোখ মেলে তাকিয়ে শ্রীমতী বলেন, ভেঙেছ! একেই বলে, ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়। সবই মিস বড় মেনির কাছে শোনা। মাঝে মাঝে দুপুরে আসে পড়তে। এমন নিঃক্ষত্রীয় বঙ্গললনা সচরাচর চোখে পড়ে না। শব্দটা সুখেনের আবিষ্কার। যে-শরীরে যৌবন ফেঁড়ে ফেলার মতো ধার নেই সুখেনের ভাষায় তেমন শরীর হল নিঃক্ষত্রীয়। থিয়েটারে ছেলেরা মেয়ে সাজে। মেয়েরা যদি ছেলে সাজতে চায় সবার আগে মিস মেনির ডাক পড়বে। সব সমতল। ও তলে অতল নেই। সুখেনের কৃপায় জ্ঞানভাণ্ডার যেরকম সমৃদ্ধ হয়েছে, পরিচয় পেলে। পিতা হতভম্ব হয়ে যাবেন। এ যে পিতার পিতা, বৃদ্ধ পিতা।
তবলা থেমে গেল। সাবেক কালের লম্বা লম্বা গরাদ লাগানো খোলা খাড়া জানলায় রাতের আকাশ লেগে আছে। অন্ধকার যেন পাতলা চাঁদরের মতো থিরথির কাঁপছে। ফ্যাকাসে চাঁদ অভিসার শেষ করে ওই পথেই যেতে যেতে উঁকি মেরে দেখছে। ঘরের মেঝেতে লম্বা হয়ে তারাদের ছায়া পড়েছে, চার পাশ কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। মোহনিশা সব সো অনিহারা। দেখছি স্বপ্ন অনেক প্রকারা ॥ এহি জগ যামিনী জাগহি যোগী। পরমারথ পরপঞ্চ বিয়োগী। এই মোহরাত্রি। ভোগী জীব স্বপ্নে নিদ্রিত। কনক, মুকু, মেসোমশাই। আর এই যে আমরা পরমার্থনুসন্ধায়ী বিবেকী যোগী দু’জন সংসার নিশায় জেগে বসে আছি। রাতের রেলগাড়ি চলেছে, চাঁদের পাহাড়ের পাশ দিয়ে তারাদের যাত্রী নিয়ে। থ্যাঙ্কস ফাদার। আপনার জন্যেই এই নিশিযাপন। অসীমের রহস্য সন্ধান।
হাঁটুর ওপর হাত রেখে পিতা তাকিয়ে আছেন উন্মনা হয়ে। সারাশরীরে চাঁদের আলো। ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। না ফিরেই বললেন, ঘুমোলে নাকি?
আজ্ঞে না।
কী হবে ঘুমিয়ে! নেমে এসো। দেখি তুমি কেমন গান শিখেছ?
মিলিটারি ডিসপোজালে কেনা খাকি মশারির ঘেরাটোপ ছেড়ে নেমে এলুম। মেঝেতে রুপোর স্রোত বইছে। ভাণ্ডারে তালে গাইবার মত দুটো গানই আছে। তাই তোক। তুলসীদাসকে মনে পড়ছে। অযোধ্যার পাহাড়। রাম, লক্ষ্মণ, সীতা। ধরে ফেলি তা হলে, রামনাম সুখদায়ী, সাচ্চা মনসে ভজ রাঘব তো, একদিন মুক্তি পাই। গান বেশ জমে উঠল। সুরের মায়াজাল তৈরি করবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে। মাতুলের মতো কাজ অলংকার বসাতে না পারলেও চোখের সামনে রামচন্দ্রকে দেখতে পাচ্ছি। কাঁধে ধনুর্বাণ, নন্দলাল বসুর আঁকা টানাটানা চোখ। অযোধ্যার বিশাল প্রাসাদ। সিংহাসনে বৃদ্ধ দশরথ। চামর হাতে দু’পাশে দুই সুন্দরী। অযোধ্যার রাতের বাজার। মশালের আলো। দোকানে দোকানে ঝিলিক মারছে হিরে, চুনি, পান্নার হার। কী শান্তি! কী আনন্দ! রামনাম সুখদায়ী। রাম নাম হ্যাঁয় অমৃতধারা। রাম বিনা কোই নেহি হামারা। ভাবের ঘোরে হড়কে গিয়ে মাঝে মাঝে তাল কাটছে। উত্তেজনায় লয় বেড়ে যাচ্ছে। প্রবল বেগে তবলা বাজাতে বাজাতে পিতা থেকে থেকে হুঁ হুঁ করে উঠছেন। ফাঁক চলে গেছে সমে। সম চলে এসেছে ফাঁকে। মরিয়া, তেরিয়া, খেপে গেছি। সবে সাইকেল চালাতে শিখে রাস্তায় নামার মতো। বেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। লয় বাড়ছে, মাথা দুলছে। লাঠালাঠি ব্যাপার।
