জবা বললে, অমন কোরো না। তোমার লেগে যাবে। জ্বরে তোমার গা পুড়ে যাচ্ছে!
জবার আঁচল খুলে লুটিয়ে পড়েছে আমার বুকে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। এর অর্থ আমি বুঝি। জবা উঠে দাঁড়াল। নিজেকেই প্রশ্ন করল, এই জ্বরে দুধ দেওয়া কি ঠিক হবে? বলতে বলতে বেরিয়ে গেল। বাইরের রাস্তায় ছেলেরা শোরগাল তুলে চলেছে। স্কুলের ছুটি হয়েছে। ওই জীবনটা ছেড়ে এসেছি আমি। লোভনীয় জীবন। আবার ফিরে পেতে হলে মরে যেতে হবে। জীবন হল নদীর মতো। উৎসের দিকে আর ফিরতে পারে না। সাগরের টানে এগিয়েই চলে। ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে আসছে আমার চেতনা। রঙিন কাঁচের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমের রোদ এসেছে। এটা তার নিত্য আসা। ধর্মশালার অতিথির মতো। সারাদিনের তীর্থভ্রমণ শেষ করে, বোঝা নামিয়ে বসা। বড় কষ্ট হচ্ছে। খুবই যন্ত্রণার মৃত্যু হবে। পিতা হরিশঙ্কর বলতেন, যন্ত্রণা সহ্য করবে বীরের মতো। উঁ অ্যাঁ করবে না। পরাজিত হবে না। হাসবে। গান গাইবে। মনটা তুলে নেবে। অন্য চিন্তা করবে। তবু আমার মুখ দিয়ে মাঝেমধ্যে উঁ অ্যাঁ বেরিয়ে পড়ছে। কতটা সময় চলে গেল হিসেব নেই। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ জবা ঘরে এল ডক্টর মিত্রকে নিয়ে। ঠিক ধরে এনেছে।
বিছানার পাশে একটা চেয়ারে বসলেন ডক্টর মিত্র। তিনি আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক নন। আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডক্টর সেন। সেই কারণেই একটু অস্বস্তি বোধ করছেন। যেন। পরস্ত্রীর গায়ে হাত দিচ্ছেন। জবা মনে হয় সবই বলেছে। ঠোঁটটা ভাল করে দেখে, চার পাশ আঙুল দিয়ে আলতো আলতো করে টিপে বললেন, ভয়ংকর কাণ্ড। ওয়ান পার্সেন্ট কেস।
জবা বললে, তার মানে কী ডাক্তারবাবু?
মানে হল, একশোতে একজন বাঁচে। এ বড় সাংঘাতিক ব্যাপার-ইরিসিপ্লাস। সোজা ব্রেনে গিয়ে ধাক্কা মারবে। ইস, বিশ্রী কাণ্ড করে বসে আছে। দেখি কী হয়! তেড়ে সালফার ড্রাগস চালাই। একটা পাউডার দোবো, ঠোঁটের ওপর সাবধানে ছড়িয়ে দিয়ো। হরিশঙ্করবাবু কোথায়?
জবা বুদ্ধি করে বললে, কয়েক দিনের জন্যে বাইরে গেছেন।
তবে যে শুনলুম, তিনি জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছেন।
জবা বললে, যাব্বাবা, এ আবার কে রটালে? একখানা পাড়া বটে।
ডাক্তার বললেন, তা যা বলেছ! এক কাজ করো, তাঁকে টেলিগ্রাম করে আসতে বললো। কেস কোন দিকে যাবে বলতে পারছি না।
আবার দুজনেই বেরিয়ে গেল। জবা সদর পর্যন্ত গিয়েছিল ডাক্তারবাবুকে এগিয়ে দিতে। ফিরে এসে বললে, হ্যাঁগো, তোমার কাছে কিছু টাকাপয়সা আছে?
হ্যাঁগো, শব্দটা ভীষণ ভাল লাগল। এইভাবে স্ত্রীরা স্বামীকে সম্বোধন করে। ভীষণ একটা আন্তরিকতা। দুটো মহাদেশের মাঝখানে অর্থহীন দুটো শব্দের সেতু। জবাকে ইশারায় কাছে ডাকলাম। লকেটটা বাঁ হাতে একটু তুলে আঁচল দিয়ে বুক আর গলা মুছল। পাশে এসে বললে, কী বলো?
ও ঘরে গিয়ে আলমারিটা খোলো। গোল একটা বাক্স দেখবে। সেই বাক্সটার দুটো তলা। একেবারে নীচের তলায় টাকা আছে। চাবি আলমারিতেই ঝুলছে।
যতক্ষণ কথা বললুম জবা চোখ বড় বড় করে ওপর নীচে ঘাড় দোলাল, যেন ছাত্রী। মাস্টারমশাই কিছু বোঝাচ্ছেন। জবা চলে গেল পাশের ঘরে।
পৃথিবীতে এমন কেন হয় না! মানুষ মানুষের খুবই ছোটখাটো সুখের বাধা হবে না। কিছু দিতে হবে না, শুধু বাধা দেব না। সুখেন বলবে, ঠিক আছে জবা, তোমাকে আমি ছেড়ে দিলুম। পিতা হরিশঙ্কর হাসিমুখে বলবেন, ঠিক আছে পিন্টু, সংসার তুমি করবে। তোমার যদি মনে হয় জবার মতো সংসারে ইতিমধ্যেই পোড়-খাওয়া অভিজ্ঞ এক মহিলা তোমাকে সুখী করতে পারবে, তা হলে আমার আর আপত্তি কীসের! পাড়ার লোকজন বলবে, ঠিকই তো, ঠিকই তো। বিলেতে এইরকম অনবরতই হচ্ছে। তারাও মানুষ আমরাও মানুষ। মানুষের সুখটাই আমাদের কাছে বড়। যে যেখানে আছ সুখী হও। আমরা তো অন্যভাবে সাহায্য করতে পারব না, আমরা বাধা না দিয়ে, ছিছি না করে তোমাদের সাহায্য করব। আর জবা বলবে, এতদিন আমি যা খুঁজছিলুম তাই পেয়ে গেছি। আর আমার কিছু চাইবার নেই। জীবন-জাহাজ এইবার বন্দর খুঁজে পেয়েছে। তখন আমি বাগান-ঘেরা ছোট একটা বাড়ি করব। স্মৃতিভারাতুর এই অভিশপ্ত প্রাচীন কেল্লাটি আমরা পরিত্যাগ করব। স্মৃতির কঙ্কালরা এখানে দোল খাক। মাঝরাতে হা হা করে হাসুক অট্টহাসি। সেই নতুন বাংলো বাড়ির সবচেয়ে ভাল ঘরটিতে থাকবেন পিতা হরিশঙ্কর। মামার আনা গোলাপ গাছগুলো দিয়ে জানলার বাইরে ছোট্ট একটা বাগান সাজাব। যাতে তিনি জানলায় বসে দেখতে পান ফুলের বাহার। জবা কোমরে আঁচল জড়িয়ে, শাড়িটাকে একটু উঁচু করে পরে ঝারি নিয়ে জল দেবে। ছোট্ট রুমালের মতো একটা লন থাকবে। শেষবেলায় জবা আর হরিশঙ্কর সেখানে বসবেন, ভিজে মাটি, ঘাস, রোদ, ফুলের গন্ধ। হরিশঙ্কর রাতের আকাশ থেকে তারা খুঁজে খুঁজে জবাকে কনস্টিলেশন চেনাবেন। গাছের ডালে চেনবাঁধা দোলা বাতাসে মৃদু মৃদু দুলবে। তারই অস্ফুট শব্দ। কাঠের মেঝেআলা একটা ঘর থাকবে। জবা সেখানে নাচ শিখবে। স্কুলে ভাল নাচত। হরিশঙ্কর নাচ। বোঝেন, তাল বোঝেন, ছন্দ বোঝেন। ছেলেবেলায় আমাকে নাচ শেখাতেন। জবা হবে তারই ছাত্রী। কাঠের পাটাতনে পায়ে তাল ঠোকার শব্দ। ঘুঙুরের বোল। তবলায় হরিশঙ্করের ছটফটে আঙুল। মামার হারমোনিয়ম আর গলা। জবার লাল ব্লাউজ ঘামে ভিজে আরও লাল। এরপর রাত যখন গম্ভীর হয়ে যাবে, কালো আকাশের ছায়াপথ ধরে তারারা প্রদীপ হাতে নিয়ে যখন বেরোবে তীর্থযাত্রায়, তখন হরিশঙ্করের টেবিলে জ্বলবে একটি মাত্র আলো, সামনে খোলা কঠিন গণিতশাস্ত্রের বই। পাশে খাতা। সমাধান খুঁজে ফিরবেন যেসব সমস্যার আজও সমাধান হয়নি। জবা একসময় এসে আলোটা নিবিয়ে দেবে। হাত ধরে বলবে, আজ আর নয়, এইবার শুতে হবে। ফিনফিনে নীল মশারির মধ্যে তিনি ধ্যানস্থ। হবেন। ঝকঝকে গেলাসে জল এগিয়ে দেবে জবা। গুড নাইট।
