জ্বর আরও বেড়ে গেল। যেখানে হাত রাখছি সেই জায়গাটা গরম হয়ে উঠছে। বেশ জমে গেল তা হলে! ওষ্ঠ ব্রণ সেপটিক, মানে মৃত্যু অবধারিত। ভালই হবে। আর একবার ভাল করে জন্মাব। অক্ষয়বাবুর মতো বিশাল এক শরীর চেয়ে নোব, আর তার ভেতর ফিট করে দেব পিতার চরিত্র ও মেধা। মামার সংগীত-প্রতিভাও নিতে পারি। স্বর্গে গিয়ে প্রথমেই দিদিকে খুঁজে বের করে ক্ষমা চেয়ে নোব। মাকে বলব, তার চলে আসার পর আমার বেঁচে থাকার বৃত্তান্ত। নন্দনকাননে কিছুদিন রেস্ট নেবার পর পৃথিবীতে ফিরে আসব।
গোটা মুখ থমথম করছে। এপাশ ওপাশ করলে যেন মল বাজছে ঝমঝম। চোখের মণি নীচের দিকে নামালে নিজের গাল ঠোঁট পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আয়না ছাড়াই। ফুলে উঠে চোখের কোলে চলে এসেছে। কী মজা! এ-ও জীবনের এক অভিজ্ঞতা। ঈশ্বরকে ডেকে লাভ নেই। মন দেবী থেকে সরে গেছে মানবীতে। কেউ কি আসবে না আমার এই অসহ্য যন্ত্রণার মুহূর্তে! চাঁ চা করে ডাকছে শালিক। মাঝে মাঝে ইলেকট্রিক শকের মতো যন্ত্রণার তীব্র একটা খোঁচা মাথার দিকে উঠে যাচ্ছে।
বহুক্ষণ ধরে টেলিপ্যাথিতে জবাকে ডাকছি। আসছে না কেন? তিনটে বেজে গেছে। রোদ মরে আসছে। কত তাড়াতাড়ি জায়গাটা বিষিয়ে উঠল! ধুপ করে ছাতে একটা শব্দ হল। বেশ ভারী একটা কিছু পতনের শব্দ। বোধহয় জবা পাঁচিল টপকাল। অনেক দিনের পুরনো অভ্যাস, আবার ঝালিয়ে নিচ্ছে। ছাতের সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। মলের ঝুমকোর চুনুর চুনুর শব্দ। পরক্ষণেই জবা ঘরে এল। হলদে শাড়ি, আটপৌরে সাদা ব্লাউজ। শাড়িটা গ্রামের মেয়েদের মতো উঁচু করে পরা। গাছকোমর আঁচল। চুলের খোঁপা বেদেনির মতো। ঝুরঝুরে কিছু কপালে এলোমেলো।
জবা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললে, এ কে?
এই একই প্রশ্ন তো আমারও। এ কে? সন্ন্যাসী, গৃহী, লম্পট, ভণ্ড, শয়তান? কোনটা?
জবা বললে, এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কী করে ফেললে? মারামারি করে এলে নাকি?
জবা সাবধানে আমার মাথার পাশে খাটের ধারে বসল। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, কী সাংঘাতিক অবস্থা! কী করে করলে এমন?
জবার মুখটা ভীষণ সুন্দর। কিছু পাপ কিছু পুণ্য মিশে বড় আকর্ষণীয়। বিদেশি চলচ্চিত্রের নায়িকার মতো। কুমারী নয় বলেই অন্য এক ধরনের চটক এসেছে। এই যন্ত্রণার মধ্যেও আমার সৌন্দর্যবোধ ঠিক আছে দেখে মনে হল, মৃত্যু আসন্ন হলেও সমাসন্ন নয়। একদিন-দুদিন লড়ে যেতে পারব। বিপরীত স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়েছে, এখন আসতে যতদিন লাগে। শুনেছি মরণকালে মানুষের মাংসে রুচি চলে যায়। বুকে মৃদঙ্গ বাজে। মনে মহাদেব নৃত্য করেন। আমার ওইসব কিছুই হচ্ছে না। বরং জবার নিটোল পশ্চাদ্দেশ আমার ডান কান ছুঁয়ে আছে বলে শরীরে অন্য আর এক ধরনের যন্ত্রণা টের পাচ্ছি। চলেই যখন যাব, তখন জবার আপত্তি না থাকলে জীবনের শেষ নারীসঙ্গ করে যাব কি? আর হয়তো মনুষ্যজীবন পাব না। প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, সৌন্দর্য দেখার চোখ, কবিতার মতো শরীর, নৃত্য, গীত, নিষিদ্ধ সম্পর্ক, ছোটখাটো পাপ, একটু পদস্খলন, অপরাধী বিবেক, আসক্তি, নিরাসক্তি এই মানব জীবনের যত মশলা, সবই হয়তো একবার। জবার হাতটা নিজের হাতে টেনে নিলুম। কোমল অনভিজ্ঞ কুমারী হাত নয়, ঝানু হাত। নখের মাথা সামান্য সামান্য ক্ষয়ে গেছে। সংসারের কাজেকর্মে খসখসে। হাত মানুষের জীবনযাপনের সাক্ষী। কর্মীর হাত, বিলাসীর হাত, দুঃখীর হাত, খুনির হাত, তবলিয়ার হাত, সেতারির হাত। নিজেকেই নিজে ধমক লাগালুম। জ্বরের ঘোরে ব্যথার তাড়সে মন ভুল বকছে।
জবা আমার হাতে চাপ দিয়ে বড় স্নেহের গলায় বললে, বললে না তো কী হয়েছে? মুখ থুবড়ে পড়ে গেছ?
মনে মনে হাসলুম, অনুমানটা তোমার নেহাত মিথ্যে নয়। এমন পড়া পড়েছি, আর উঠতে পারব কি না জানি না। মুখে বললুম যা হয়েছে।
জবা বললে, তা হলে আমি ডাক্তার ডেকে আনি।
কাঁচের শার্সির গায়ে লেবড়ে থাকা উঁশ মাছি যেমন বুজুর বুজুর শব্দ করে, সেইরকম একটা শব্দ বেরোল আমার মুখ দিয়ে, এখন ডাক্তার কোথায় পাচ্ছ জবা! সন্ধের পর পাবে। এখন তারা বিশ্রাম নিচ্ছেন।
জবা বললে, আমি সব পারি। ডক্টর মিত্রের বাড়ি আমি চিনি। ঠিক ধরে আনব।
তুমি আমার কাছে থাকো। আমার ভীষণ ভয় করছে। আমাকে ছেড়ে চলে যেয়ো না।
অদ্ভুত একটা আকর্ষণ বোধ করছি। অদ্ভুত একটা শান্তি। দুটো জীবন প্রায় এক ধাঁচের। দু’জনেরই এক হাল। সমান অসহায়। দু’জনেই পরিত্যক্ত। একজন স্বামী। আর একজন পিতা। বার্ডস অফ দি সেম ফেদার ফ্লক টোগেদার।
জবা বললে, কীসের ভয়! তোমার নিশ্চয় খাওয়াও হয়নি!
আর খাওয়া, আমি ঠোঁট ফাঁক করতেই পারছি না।
জবা কিছুক্ষণ কী ভাবল। আমার আঙুলগুলো নিজের আঙুলে নিয়ে নাড়াচাড়া করল। শেষে একটা যেন কিছু খুঁজে পেল। আমার বুকের ওপর হেলে পড়ে বললে, একটা কাজ করি। সরু একটা পেঁপের ডাল কেটে আনি। এক বাটি দুধ গরম করি। তুমি সেই ডালটা দিয়ে চোঁচোঁ করে খেয়ে নাও।
জবার লকেটটা আমার বুকের কাছে দুলছে। শীত করছিল বলে পাখা বন্ধ। জবার টিকোলো নাকের ডগায় তিলফুলের মতো ঘাম। বুকের খোলা অংশটা ভিজেভিজে। মন কেমন করানো অতি কোমল, অতি নিভৃততম আরও কিছু। আমি লকেটটায় হাত দিলুম। বড় সুখ। জবাকে আমি একদিন আদর করতে চেয়েছিলুম। পৃথিবীকে যখন বিদায় জানাতে হবেই, তখন আর দেরি কেন! মানুষ যখন মরে তখন তো তার সবই বেরিয়ে যায় প্রাণবায়ুর সঙ্গে। দেহের সঙ্গেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় তার নাম, আদর্শ, চরিত্র। তবে! এই আমার শেষ ইচ্ছে। জবাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলুম। ভরাট এক অনুভূতি। এর বেশি কিছু সম্ভব নয়! শরীরে কুলোবে না।
