জবা আঁচলে চোখ মুছে বলল, আমি যাই। পরে আবার আসব। পিন্টুদা, তুমি কখনও প্রেম করে। বিয়ে কোরো না। প্রেম বলে কিছু নেই। সংসারে ঢুকলেই প্রেম জ্বলে যায়। দেহটাই সব। মনটা কিছু নয়। ওই নরকের কীট আমাকে কীভাবে যে ভোগ করেছে, তুমি কল্পনা করতে পারবে না। ওটা মানুষ নয়, ষাঁড়।
জবা নীচে নামছে। অসহায় একটা মেয়ে। ঈশ্বর আমাকে যদি সেই সাহস দিতেন, আমি জবাকে নিয়ে কোথাও একটা গুছিয়ে বসতুম। মেয়েটা ভীষণ সরল আর ইমোশনাল বলেই ঠকে গেছে। এইবার নোংরা আর লোভী সমাজ ওকে গ্রাস করবে। দশ বছর পরে জবার কী হবে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বারেবারে ঠকার জন্যেই ও পৃথিবীতে এসেছে। সিঁড়ির বাঁকে গিয়ে জবা আমার দিকে তাকাল। চোখদুটো বর্ষার আকাশের মতো। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। জবা বললে, আমার জন্যে ভেবো না। কিছু আশা, আশাই থেকে যায়।
জবা নেমে গেল। খুব ইচ্ছে করছে জবাকে ডেকে ফেরাই। মানুষ যেভাবে জলে কি আগুনে ঝপায়, সেইভাবে ঝপ মারি। সবাই তো হিসেব-নিকেশ করে ভাল হতে চায়, আমি না হয় খারাপই হয়ে গেলুম। লোকে বাহবা বাহবা না করে, না হয় ছিছি-ই করল। মন্দিরের প্রদীপ না হয়ে, একটি মেয়ের অন্ধকার মনেরই না হয় প্রদীপ হলাম। চতুর্দিকে রাষ্ট্র হয়ে যাক হরিশঙ্করের ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি তো তাদের কাছে হাত পাততে যাব না। আমার শিক্ষা, জ্ঞান, উপার্জন সবই ঠিক থাকবে। হরিশঙ্করই যখন নেই, তখন আর আমার ভয় কীসের! আজই এই মুহূর্তে আমাদের একটা গোপন সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে। পৃথিবী যেমন চলছে সেইরকমই চলবে। কারও কোনও ক্ষতি হবে না। শুধু একটা ছেলে আর একটা মেয়ে সুখের একটা কোণ খুঁজে পাবে। দেরাদুনে আমার চাকরিতে ফিরে গেলে জবাকে ওই পরিবেশে ভয়ংকর মানাবে। জবা মুকু নয়। অনবরত শাসনে আমাকে আড়ষ্ট করে দেবে না। জীবনের ভাল দিক খারাপ দিক দুটোই জানে। একটা মানুষ সবসময় ভাল থাকতে পারে না। কখনও ভোগী, কখনও যোগী। মন্দিরে যেতে পারে, আবার সেই সব জায়গায় ফুর্তি করতেও যেতে পারে। মনের অবস্থা যখন যেমন। একটু আগে জবা শুয়ে ছিল। শরীর ছেড়ে দিয়ে অলস ভঙ্গিতে নায়িকার মতো। তার দেহ থেকে নানা তরঙ্গ ছড়াচ্ছিল। আমার মন দুলছিল হেলছিল। কাবু হচ্ছিল। মজে আসছিল। নেশা ধরছিল। এখন এই বাড়ি নির্জন। কাক ডাকছে। গরম নিশ্বাসের মতো ফিকে বাতাসে খাতার পাতা অল্প অল্প কাঁপছে। রসের মতো অল্প ঘাম। টনটনে শরীর। জবাকে ডাকতে পারি। মনের সব সংস্কার ফেলে দিতে পারি। বর্তমানই সব। আমার অতীত নেই, ভবিষ্যতও নেই। বর্তমান চলে গেলে যা আসবে, যেভাবে আসবে সেইটাই আমার ভবিষ্যৎ। তারপর? গান থেমে যাবার পর সুরের রেশ। সুন্দর একটা ঘুম ভাঙার আবেশ। একটা আশীর্বাদ। চওড়া মসৃণ একটা পিঠে দিশাহারা ছোট্ট একটি পিঁপড়ে। নিরালায় নিঃশব্দে খসে পড়া একটি ফুল। গাছের পাতায় বহুক্ষণ থেমে যাওয়া বৃষ্টির নোলকের মতো এক ফোঁটা জল। কী? এবার ওঠো। বাড়ি যাবে না? আমার ঘুম পেয়েছে। দুটো হাত এগিয়ে আসছে। আমি আবার তলিয়ে যাব পাহাড়-নদী-উপত্যকায়, একটা দিনের মতো, একটা রাতের মতো। ভাবতে ভাবতেই জবা চলে গেল। এ জীবনটা আমি শুধু ভেবেই যাই। আর সময় আমার ওপর দিয়ে চলে যাক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো।
হঠাৎ মনে হল, পিতা হরিশঙ্করের জন্যে উতলা হয়ে কী হবে! বেশ তো লায়েক হয়েছি। সুযোগ যখন পেয়েছি তখন বেশ মাংস কষার মতো পেঁয়াজ রসুন মশলা দিয়ে জীবনটাকে কষি। একটু ভোগ করি বিলিতি কায়দায়। মুকু গেছে ভাল হয়েছে। সে ছিল আমার বিবেকের চোখ, প্রতি মুহূর্তে সে আমাকে স্মরণ দিত, সাবধান। মনে রেখো, তুমি কার ছেলে! কোনও বেচাল চলবে না। সরে বোসো। আলাদা শোও। ধর্মের পানে কর্মের সুপুরি দিয়ে খিলি তৈরি করো। ভক্তির জরদা মেশাও। মুকুর মতো স্ত্রী স্বামীকে ধোলাইও দিতে পারে। ঈশ্বর যখন পাঁচিলের ওপাশে জবাকে এনে ফেলেছেন, তখন আর সুযোগের অবহেলা করা কেন! জবা তো একসময় আমাকে উন্মাদই করেছিল। নেমে পড়ি আসরে। এখনই অথবা কখনওই নয়। ভয়ংকর একটা রোমাঞ্চ আছে এই অবৈধ ব্যাপারটার ভেতর।
এই পাপ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে দাড়ি কামাচ্ছিলুম। প্রস্তুত হয়ে থাকি। মামা যদি আজই রাঁচির ট্রেন ধরেন, আমি পিছু ছাড়ছি না। না, আজ কী করে যাবেন? গভীর রাতেও তো প্রোগ্রাম আছে। রাত সাড়ে দশটার সময় বেতারের ঘোষক বলবেন, এখন জয়জয়ন্তী রাগে খেয়াল শোনাবেন। ঠোঁটের ওপর ব্লেডটা একবার হোঁচট খেল। চিনচিন করে উঠল জায়গাটা। সঙ্গে সঙ্গে সাবান ফুড়ে ফুটে উঠল এক বিন্দু রক্ত। নীচের ঠোঁটে গড়িয়ে এল রক্তের ধারা। এ আবার কী হল! কী ছিল ওখানে?
ঠোঁটটা ধুয়ে ফেললুম। সঙ্গে সঙ্গে আবার রক্ত। বোধহয় একটা ব্রণ হয়েছিল। আমার খেয়াল ছিল না। কী করি এখন? রক্ত তো বন্ধ হচ্ছে না। অসম্ভব জ্বালা। মনে হল চুনই ওষুধ। চুন টিপে দিলে রক্ত বন্ধ হতে পারে।
সামনের পান-বিড়ির দোকানে চুন চাইতে গেছি, মালিক কেষ্টদা ভয় ধরিয়ে দিলেন, করলে কী? ওষ্ঠ ব্রণ ভয়ংকর জিনিস। ব্লেড মেরে দিলে!
দোকানের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুন চেপে ধরলুম। রক্ত বন্ধ হল। কিন্তু স্বস্তি পেলুম না। দেখতে দেখতে ওপরের ঠোঁটটা ফুলে উঠল। আড়ষ্ট ব্যথা। স্নান করার সময় গায়ে জল ঢালামাত্রই শীত করে উঠল। জল একেবারেই ভাল লাগছে না। চোখ জ্বালা করছে। মাথা ঝিম মেরে আসছে। কোনওরকমে স্নান শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়ালুম। ঠোঁটটা আরও ফুলে বনমানুষ কি ওরাং ওটাং-এর মতো হয়ে গেছে। চেহারা দেখে নিজেরই ভয় করছে। কপালে হাত রেখে মনে হল, বেশ জ্বর এসে গেছে। তাই এত শীত করছে। অক্ষয় কাকাবাবুর ভবিষ্যৎবাণী তা হলে ফলে গেল। আজই সেই তৃতীয় দিন। একটা বিপদ আসছে। এই তো সেই বিপদ। এখন আমার কী করা উচিত! বেশ ভালই লাগছে। একেবারে অসহায়। পরামর্শ দেবার মতো কেউ নেই। মামাকে আমি চিনি। বড়লোক-ঘেঁষা মানুষ। কোথায় গিয়ে বসে আছেন কে জানে! আজ আর ফিরবেন বলে মনে হচ্ছে না। বেলা একটা বাজল। উনুন জ্বেলে রান্না করার প্রশ্নই ওঠে না। খেতেও পারব না। কোনওরকমে ঘরে এসে পিতা হরিশঙ্করের খাটে ধপাস করে উলটে পড়লুম। চাদরটা পালটাব ভেবেছিলুম, জবা শুয়ে গেছে। সেই ভাবনাটা চলে গেছে। এখন বেশ ভালই লাগছে। বোধহয় জবার দিকে মনটা ঝুঁকেছে বলেই। ভালবাসা, কে বলতে পারে! কখন টলটল করে উঠবে ভেতরে তালশাঁসের জলের মতো। আর আমার কোনও ক্ষমতাও নেই যে তুলব, ঝাড়ব, নতুন একটা পাতব।! জবার ওপরই শুয়ে পড়ি। আশ্চর্য, জবার শরীরের কথা চিন্তা করলে যন্ত্রণার কথা আর মনে থাকছে না। জবা ঈশ্বরের চেয়ে শক্তিশালী। সাধ্যসাধনাতেও তিনি আসেন না। ঈশ্বরের আর একটা প্রবলেম হল, এত রূপ, কোন রূপে আমি চিন্তা করব! চলচ্চিত্রের মতো একের পর এক এসে, জড়ভট্টি হয়ে তালগোল পাকিয়ে, শেষে যেন মনের কুস্তি! কোনও পাচেই পেড়ে ফেলা যায় না। ধোঁয়া ধরার কসরত। সেই তুলনায় জবা কত স্থির। যে-জায়গাটা স্মরণ করছি, সেইটাই সামনে এসে স্থির হচ্ছে। শুধু স্থির নয়, আনন্দ আর আকাঙ্ক্ষা জাগাচ্ছে। সেই গানের মতো, যতইনা পাবে, তত পেতে চাবে, ততই বাড়িবে পিপাসা তাহার। এই জায়গাটায় জবার মাথা ছিল। এইখানে শরীরের মধ্যভাগ। এই জায়গায় হাটুদুটো। উত্তেজিত পদযুগল। সাদা ক্রমশ দুধসাদা হয়ে রহস্য হয়ে গেছে নীল অন্তর্বাসে।
