সেটা সুখেনের সঙ্গে আমার ব্যাপার।
তার জন্যে আমাকে রোজ ধোলাই খেতে হয়েছে কেন?
টাকাটা আমি ফুর্তি করব বলে নিইনি। তোর বাপের ব্যবসায় ঢুকেছে। যখন দেবে তখন ঠিকই দিয়ে দেওয়া হবে।
সেই যখনটা কখন মা? কত দিন হল?
ইচ্ছে করলে এরা সারাদিন চালাতে পারবে। এদের সঙ্গ আর এক মুহূর্তও ভাল লাগছে না। বেশ একটু ভারী গলায় বললুম, মাসিমা, আমাকে বেরোতে হবে।
তা বেরোবে। ব্যাটাছেলের কি ঘরে বসে থাকা সাজে! তুমি বাবা সুখেনের সঙ্গে যেভাবেই হোক একটু যোগাযোগ কোরো। তা না হলে এই মেয়ের জন্যে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। ওই তোমার জাড়তুতো দিদির মতো। তুমি দেখেছিলে, আমি এসেছিলুম?
লক্ষ করিনি।
ওমা, সেকী? আমি বললুম, পিন্টু, বিপদে বুদ্ধি হারিয়ো না। শুনতে পাওনি?
না, তখন আমি কুইনিন খেয়েছিলুম।
তোমার ম্যালেরিয়া হয়েছে বুঝি? সাবধানে থেকো। ইহসংসারে তো কেউই নেই তোমার। আমরা আর কতটুকুই বা করতে পারব! নিজেদের জ্বালায় জ্বলছি সব।
জবার মা দরজার দিকে এগোতে এগোতে বললেন, চল জবা চল। সৃষ্টি কাজ পড়ে আছে।
জবা বললে, তুমি যাও না! কতদিন পরে এলুম। আমি একটু পরে আসছি। পিন্টুদার সঙ্গে আমার প্রাইভেট কথা আছে।
ওকে আর বিরক্ত করিসনি। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ও বেরোবে।
জবা বললে, তুমি যাও তো! আমাদের ব্যাপারে নাক গলিও না।
নাক না গলিয়ে গলিয়েই তো আজ তোমার এই অবস্থা হয়েছে।
জবার মা চলে গেলেন। জবা আমার খুব কাছে সরে এসে বললে, কেমন আছ? তোমাকে তো আগের চেয়ে বেশ ভালই দেখতে হয়েছে, প্রেমিক প্রেমিক। মনে হচ্ছে বেশ ভালই আছ?
জবা আমার এত কাছে যে অস্বস্তি হচ্ছে। জবার স্বভাব বরাবরই একটু আলগা ধরনের। ভীষণ সরল। বুঝতেই পারে না কী করছে, তার ফলে কী হচ্ছে। টেবিলের কোণে পেছন ঠেকিয়ে জবা আয়েশ করে দাঁড়িয়েছে। একটা পা তুলে দিয়েছে আমার চেয়ারের তলার কাঠে। হাঁটুটা ঠেকে আছে আমার উরুতে। ভীষণ একটা বিরক্তির ভাব আসছিল, সেটা কেটে গেল হঠাৎ। বেশ ভালভাবেই বললুম, জবা, তুমি আমাকে এই কথা বলার জন্যে আটকালে?
জবা মাথার পেছন দিকে হাত ঘুরিয়ে খোঁপাটা খুলে, বিনুনিটা বুকের সামনে টেনে এনে খুলতে শুরু করল। আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আমাকে দেখছে না। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, তুমি আমার একটা উপকার করবে? কেলে মানিককে বলবে, আইনত আমাকে যাতে ছেড়ে দেয়।
তার মানে তুমি বিবাহ-বিচ্ছেদ চাইছ?
হ্যাঁ। আমি একজনকে ভালবেসে ফেলেছি। ছেলেটা ভীষণ ভাল। ভীষণ দুঃখী। তার কেউ নেই। সে-ও আমাকে ভীষণ ভালবাসে। সুখেন যদি আমাকে ছেড়ে দেয় আমি তাকে বিয়ে করব।
সুখেনকেও তো তুমি ভালবেসেই বিয়ে করেছিলে!
আমি তো বাসিনি, সুখেনই আমার পেছনে লেগেছিল ফেউয়ের মতো। তখন মনে হল, যাক যা হয় হবে, বিয়েটা করেই ফেলি। তুমি তো আমাকে জানো, দুমদাম কিছু করে ফেলতে আমার ভীষণ ভাল লাগে।
বয়েস তো হচ্ছে। এইবার একটু নিজেকে বোঝাও না!
বুঝিয়েছি তো! সুখেনের সঙ্গে আমি পারব না। ও নিজে একটা শরীর, বোঝেও শরীর। আর এই ছেলেটা হল শুধুই মন। একদিন সারারাত আমার পাশে শুয়ে ছিল, আমাকে ছোঁয়নি।
তার মানে মানুষ নয়!
ঠিক বলেছ, দেবতা।
আর পারলুম না। উঠে পড়লুম, ঠিক আছে, পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব। তারপর সামান্য একটু কৌতূহল হল, জিজ্ঞেস করলুম, ছেলেটা কে? তোমাদের ওখানেই থাকে?
জবা একটু হাসল। হেসে বললে, না না, খুব কাছেই থাকে।
কোথায়? এইখানে?
হ্যাঁ, একেবারে সামনেই, এক হাত দূরে। সেই ছেলেটা হলে তুমি। জবা আমার দুকাঁধে বন্ধুর মতো হাত রাখল। মুখে হাসি, কিন্তু চোখে জল। প্রথম থেকে তোমাকেই আমি ভালবাসতুম।
স্বাস্থ্যবান জীবন্ত একটা মেয়ে ভালবাসার কথা বলছে সরাসরি। কেমন যেন অভিভূত হয়ে গেলুম। একটা মন জয় করা, বিশাল এক রাজ্য জয় করারও অধিক। জবার মতো দেহবাদী। পিচ্ছিল এক মেয়ে বলছে, আমি তোমাকেই ভালবাসতুম। আদর্শ, চরিত্র, ঈশ্বর, প্রখর নদীর স্রোতে এক টুকরো কুটোর মতো ভেসে গেল। জবার কপালে সোনালি টিপ। চিবুকে ছোট্ট একটা তিল। বুকের ওপর দুলছে বিনুনি।
জবা বললে, পারবে না আমার জন্যে সবকিছু ছাড়তে? নদীর ধারে ছোট্ট একটা বাড়িতে আমরা থাকব। একেবারে নতুন একটা জায়গায়, সেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। ছোট্ট একটা ফুলের বাগান। একটু কিছু রোজগার। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা জেগে থাকব। মেলায় গিয়ে নাগরদোলা চাপব। মাটির হাঁড়িতে কাঠের জ্বালে ভাত রাঁধব। তুমি নদী থেকে স্নান করে আসবে সাধুর মতো। কম্বলের আসনে পুজোয় বসবে। সামনে একথালা সাদা ফুল, তার ওপর সাদা একটা জবা, পাশেই একটা লাল পঞ্চমুখী, গোটাকতক টকটকে গেরুয়া কলকে ফুল। চওড়া লাল পাড় শাড়ি পরব আমি। হাট থেকে তোমার জন্যে কাঁচা শালপাতায় মুড়ে সাদা মাখম নিয়ে আসব, কোলে করে আনব লাল তরমুজ। গাছের ডালে ঝোলাব একটা দোলনা। লটলটে কান একজোড়া ছাগলছানা খেলে বেড়াবে। আমাদের জানলা দিয়ে পুবের আকাশে নীল একটা পাহাড় দেখা। যাবে। আমাদের বাড়ির ঢোকার মুখে দুটো বেতগাছের ঝোঁপ থাকবে। আমরা আমাদের নাম পালটে নোব। নতুন শাড়ির পাট খোলার মতো নতুন জীবনের ভাঁজ খুলব। জবার মাথা নেমে এল আমার বুকে। কাণায় ফুলছে। ধরাধরা গলায় বলল, হয় না এসব? হওয়ানো যায় না? এ কি একেবারেই অসীব!
২.৩০ What a great happiness not to be me
জবা গলা বড় একটা ব্লাউজ পরেছে। গলা আর বুকের ওপরের অনেকটা উন্মুক্ত। সুঠাম ঢলঢলে শরীর। বুকের ওপর দুলছে সোনার লকেট। জবা সাধাবণ মেয়ের চেয়ে বেশ লম্বা। সুখেনটা একটা রিয়েল গাধা। এমন একটা বউ পেয়েও সুখী হতে পারল না ইডিয়েট। মানুষের জীবনে সুন্দর একটা মেয়ে যে কী ফুল ফোঁটাতে পারে অনেক মোটা মাথাই তা বোঝে না।
