জবার মা বললেন, খবর পেলে কিছু? বেঁচে আছেন তো? না গোবিন্দর বাবার মতো আত্মহত্যা করলেন? এইবার আমার ফেটে পড়তে ইচ্ছে করছে। জবার জন্যে পারছি না। মনের খুব গভীর গোপনে একটা ইচ্ছের নড়াচড়া টের পাচ্ছি। শয়তান এখনও মরেনি। ঘাপটি মেরে বসে আছে। জবা অসহায়। জবার বন্ধুর প্রয়োজন। শয়তান আবার ইংরেজিতে বার্তা প্রেরণ করে, জবা ইজ নাও অ্যাভেলেবল। জবা ভয়ংকরী। জবার কোনও সংস্কার নেই। কোনও নৈতিক বাঁধন নেই। বিদেশি মনের মেয়ে।
ধুর ঘোড়ার ডিম জবা! কম শক্তির অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎতরঙ্গে শরীর যেন ঝিমঝিম করছে।
জবা বললে, কাকাবাবু আত্মহত্যা করার মানুষ নন। পিন্টুদাকে দেখে কিছুই বুঝতে পারবে মা। কাকাবাবুর কিছুই পায়নি। মেয়েছেলেরও অধম। কোনও সাহস নেই। সুখেনের যত প্রেমপত্র ওই লিখে দিত। তবু নিজের একটা লেখার সাহস হয়নি। বাবা বকবে! বাবার আঁচল-ধরা। সেই বাবাই এখন ছেলেকে ফেলে পালিয়েছে। কচি খোকা! এইবার কেঁদে মরো, কোথায় পিতা কোথায় পিতা, জ্বলছে বুকে স্মৃতির চিতা!
তুই থাম। জবার মা মেয়েকে ধমক দিলেন।
জবা খিলখিল করে হেসে পেছন দিকে উলটে পড়ল। দুটো পা টেনে তুলে নিল খাটে। এই সেই জবা। নিটোল পায়ের গোছে গোড়ালির ওপর দুটো পায়জোর। উলটো দিকে আমি বসে আছি। দুটো পা তুলে ওইভাবে শুয়ে থাকলে কী কী প্রকাশিত হতে পারে, সেই বোধটাই জবার নেই। জবার মায়েরও নেই। চিত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ জবা উপুড় হয়ে গেল। দুটো পা হাঁটুর কাছ থেকে ভঁজ হয়ে ওপরে উঠে আছে। এপাশে ওপাশে দুলছে। মলের সঙ্গে যুক্ত ঘোট ঘোট ঝুমকোয় চুনুর চুনুর শব্দ। হাতের ভরে চিবুক। ঘাড়ের কাছে আধ-ভাঙা বাসি খোঁপা। একটা কাটা একটু আলগা হয়ে আছে। জবা তাকিয়ে আছে জানলার বাইরে।
অসুস্থ অভুক্ত মানুষ দেখেছি। গাল ভাঙা। কোটরগত চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ঢেলাঢেলা। ঠোঁটদুটো সামান্য ফক। শ্বাসকষ্ট। সেইরকম এক মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করলুম ভেতরে। ভীষণ খারাপ লাগছে। ভীষণ ভালও লাগছে। চোখ বলছে বাহবা। দৃশ্যটা স্থায়ী হোক। মন বলছে ছিছি। দেখো না। হতে পারে কবিতা, কিন্তু নিষিদ্ধ কবিতা। জবা মনে হয় পরিবেশ পরিস্থিতি সবই ভুলে গেছে। জবার মা যথারীতি বেহুঁশ। জবার আগুনে কত নির্বোধ যে বেপরোয়া পতঙ্গের মতো পুড়ে মরেছে। আমাকে আরও বিপদে ফেলেছেন জবার মা। মেয়ের একেবারে পাশটিতে তার কোমরের তলায় হাত ফেলে বসে আছেন। তাঁর দিকে তাকাতে গেলেই জবার শারীরিক বিপর্যয়ের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে আমার অস্বস্তি।
জবার মা হঠাৎ বললেন, তোমার জন্যেই আমার মেয়েটার এই সর্বনাশ হল।
জবা ঘুরে চিত হয়ে বলল, ওর জন্য কেন হবে মা? হয়েছে আমার বরাতে। সংসার যে আমার ভাল লাগে না!
তা কেন লাগবে! জবার মা গলা বিকৃত করলেন, ফুলে ফুলে মধু খেতে ভাল লাগে। যতদিন বুড়ি হচ্ছে, ততদিন আমাকে জ্বালাবে। শোয়ার ছিরি দেখো। ঠিক করে শো। সামনে একটা পুরুষমানুষ বসে আছে, সে হুঁশ নেই। উঠে বোস না। যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই ঢ্যাস ঢ্যাস লটকে পড়ছে। তোর কিছু হয়েছে নাকি? মেয়ের দিকে সন্দেহের চোখে তাকালেন মা। পরিবেশটা হঠাৎ কেমন দূষিত হয়ে গেল। পিতার খাতা পড়ে ও তাকে পাবার সম্ভাবনায় মনে যে স্বর্গীয় ভাবের উদয় হয়েছিল তা ঘুচে গেল! ফুলের বাগান থেকে মাছের বাজারে।
জবার মা বললেন, তোমারও কিছুটা দায়িত্ব আছে। তুমি দু’জনকেই সাহায্য করেছিলে। তোমাদের বাড়িতেই দুজনের দেখা হত। চিঠি চালাচালি হত।
হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, আপনি তখন কী করতেন?
জবা কুঁককুঁক করে হাসতে হাসতে বললে, তখন রাজ কাপুরের সঙ্গে প্রেম করত। সিনেমার নেশা।
আমি আর এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বললুম, নিজের মেয়েকে নিজে সামলাতে পারেননি?
জবার মা সুর পালটে বললেন, আমি এখন কী করব বাবা! মেয়ে কোলে মেয়ে তো শ্বশুরবাড়ির পাট চুকিয়ে চলে এল। এখন কী হবে!
কী আবার হবে? দুদিন পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ও অমন ঝগড়াঝাটি হয়, আবার মিটে যায়। সুখেন খুব সাদাসিধে, ভাল ছেলে।
জবা বললে, সে ছেলে আর নেই। তার এখন অনেক গুণ। মদ খেতে শিখেছে। খারাপ জায়গায় যেতে শিখেছে। রোজ রাতে বউকে না পিটিয়ে বিছানা নেয় না। খারাপ অসুখও বাধিয়েছে।
সুখেনের এত গুণ হয়েছে! দুটো পয়সার মুখ দেখেছে বুঝি! আমি বললুম, তা হলে তো হয়েই গেল। এরপর তো আর কিছু করার নেই। জবা যে-অসুখের ইঙ্গিত করছে, সেই অসুখে মানুষের পরিবার জীবন নষ্ট হয়।
জবার মা তবু ছাড়লেন না। বললেন, ব্যাটাছেলেদের অমন বেচাল একটু-আধটু হতেই পারে। সব অসুখই চিকিৎসায় সারে। সুখেন তোমার বন্ধু, তুমি একটু খোঁজ নাও বাবা। বড় ছেলেটার তা হলে বিয়ে আটকে যাবে।
জবা উঠে পড়ল। সেই রাগী রাগী, বেপরোয়া ভাব, তোমার ছেলের বিয়ে ঠিকই হবে মা, জবার জন্যে আটকাবে না। জবার ব্যবস্থা জবা নিজেই করে নেবে। জবার জন্য তোমাকে জনে জনে গিয়ে নাকে কঁদতে হবে না।
জবার মা যেন ঘুরে ছোবল মারলেন, ওই স্বভাবের জন্যে তুমি মরেছ। এখন গতর আছে, অনেককে খেলাচ্ছ, এরপর দোরে দোরে ভিক্ষে।
জেনে রাখো, তোমার দোরে ভিক্ষে করতে আসব না। তোমার জামাইয়ের দশ হাজার টাকা শোধ করেছিলে?
