কি আমি একটা প্রজাপতি, স্বপ্ন দেখছিলুম আমি হরিশঙ্কর। বড় কঠিন ধাঁধা। আমার অঙ্কের জ্ঞান। হার মেনে যাবে। কোনটা ঠিক! প্রজাপতির স্বপ্নে হরিশঙ্কর, না হরিশঙ্করের স্বপ্নে প্রজাপতি?
এরপরেই লিখছেন, একদিন গঙ্গা পার হচ্ছি নৌকায়। যাব বেলুড়ে। আমাদের বিখ্যাত পতিতপাবন মাঝি নৌকা বাইছে। হাল ধরায় তার অসাধারণ দক্ষতা প্রবাদের মতো। বর্ষার অশান্ত নদী। বড় বড় ঢেউ। নৌকা হেলছে-দুলছে, সামনে-পেছনে দোল খাচ্ছে। পতিতপাবনের ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি বসেছিলুম তার পায়ের কাছে। কী মনে হল, বললুম, নৌকা চালানো কি শেখা যায়? পতিত বললে, কেন যাবে না? খুব যায়। তবে কী জানেন, যারা ভাসতে জানে, ভাসাতে জানে, তারা ডোবাতেও জানে। এই যে আমার নৌকায় এত যাত্রী, আমার হাতে ডুবেও যেতে পারে। ইচ্ছে করে ডোবাব না। ভুল করে। জল আর ডাঙার তফাত তো আমি বুঝি না বাবু। জলে ভেসে ভেসে জলের ভয় আমার কেটে গেছে। আর সেইটাই হল সবচেয়ে ভয়ের। তার চেয়ে আমি কী বলি বাবু, নিজে ভাসতে শিখুন, নিজে সাঁতার কাটতে শিখুন, ডুবসাঁতার শিখুন, ডাঙা যে ডাঙা আর জল যে। জল সবসময়ে সেইটা মনে রাখুন। যাকে আমরা সাধারণ সামান্য মানুষ জ্ঞান করি, সেও কত জ্ঞানী। কেমন সহজে আমাকে বুঝিয়ে দিলে, অন্যের সাহায্য নিয়ে ভেসে থাকায় ভয় আছে। পাকা মাঝির নৌকার তলা ফেঁসে যেতে পারে। সংসার নদীতে ভেসে থাকো নিজের আয়ত্ত করা কৌশলে।
এরপর পিতা হরিশঙ্কর লিখছেন, একটি সুন্দর কাহিনি পড়লুম–এক দারুশিল্পী সুন্দর একটা কাঠের স্ট্যান্ড তৈরি করে উপহার দিলেন রাজাকে। রাজা সেই স্ট্যান্ডে বাদ্যযন্ত্র রাখবেন। সকলেরই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, এমন স্বর্গীয় শিল্পকর্ম সহসা দেখা যায় না। রাজা তখন শিল্পীকে জিজ্ঞেস করলেন, এমন সুন্দর কাজ আপনি করেন কী করে! কী আছে আপনার হাতে? রহস্যটা কী?
শিল্পী বললেন, কোনও রহস্যই নেই মহারাজ। তবে হ্যাঁ, কিছু একটা আছে। সেটা কী, তা হলে বলি শুনুন। এই ধরনের কাজ ধরার আগে প্রথমেই নিজেকে সুরক্ষিত করি, প্রাণশক্তি যেন কমে না যায়। তারপর মনটাকে স্থির করতে করতে একেবারে শান্ত করে ফেলি। তিন দিন নিজেকে এই অবস্থায় ফেলে রাখি। প্রাপ্তি পুরস্কারের সব চিন্তা চলে যায় মাথা থেকে। পাঁচ দিনের দিন ভুলে যাই যশ-খ্যাতির চিন্তা। সাত দিনের দিন আমার দুটো হাত, দুটো পা ও শরীর-বোধ চলে যায়। অবশেষে কার কাজ করছি, কোন রাজার, কোন মহারাজার, সে চিন্তাও আর মাথায় থাকে না। তখনই আমার দক্ষতা দানা বাঁধে। তখন আর আমি মানুষ থাকি না, পরিপূর্ণ একজন শিল্পী। বাইরের কোনও গোলমাল তখন আর আমাকে কাবু করতে পারে না। তারপর আমি এক পর্বত অরণ্যে প্রবেশ করে, উপযুক্ত একটা গাছের অনুসন্ধান করি। যে আকার দিতে চাই গাছটায় যেন মোটামুটি সেই আকার থাকে, পরে সেইটাকেই আমি ফুটিয়ে তুলব। এরপর আমি দেখতে পাই। আমি যা করতে চাই। সেইটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আমি তখন সেই রূপকর্মকে অনুসরণ করি। প্রকৃতির গঠন ভঙ্গিমা আর আমার তন্ময়তা দুইয়ে মিলে তৈরি হয় শিল্প, যাকে আপনারা বলছেন অলৌকিক। এরপর হরিশঙ্কর লিখছেন, এই আমার জীবনের তত্ত্ব। অসীম তন্ময়তা।
মেঝেতে বসে দেয়ালে পিঠ রেখে খাতাটা পড়ছিলুম। অজস্র লেখা। হঠাৎ অদ্ভুত একটা জিনিসের দিকে চোখ চলে গেল। একটা পালক। পায়রার পালক। মুখের দিকে পাখার মতো অল্প একটু লেগে আছে। বাকিটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। এইরকম কায়দার পালক দিয়ে হরিশঙ্কর কান চুলকোতেন। আর এই পালক থাকত চশমার খাপে। তার মানে? মানে খুব সহজ কাল রাতে চশমার খাপটা খোলার সময় পালকটা পড়ে গেছে। আমি নিঃসন্দেহ, ওই চশমা পিতা হরিশঙ্করের। মামা সত্য গোপন করছেন।
ভীষণ একটা শক্তি, ভয়ংকর এক উৎসাহ, ভীষণ এক উদ্দীপনা নড়েচড়ে উঠল ভেতরে। আমি পেয়ে গেছি। আমার বৃক্ষের সন্ধান আমি পেয়ে গেছি। তিনি রাঁচিতেই আছেন। আমি যাব। মামা মনে হয় কালই যাবেন। খাতা রেখে উঠে পড়লুম। উত্তেজনায় গোটা বাড়িটা একবার ঘুরে এলুম। তাকে নিয়ে আসব। আবার জমে উঠবে এই গৃহ সংসার। মাঝরাতে এসরাজের ছড়ে টান পড়বে। কেঁদে উঠবে রাগিণী। বাগেশ্রী, কেদারা কি জয়জয়ন্তীতে! ছাদ ভরে যাবে ফুলে। অন্ধকার ঘরে বোতলের পর বোতল ফিল্টার হবে কালি। পিতা হরিশঙ্কর শেকসপিয়ার আওড়াতে আওড়াতে কাজ করবেন। আমার বর্ণোজ্জ্বল অতীত ফিরে আসবে। মনে হচ্ছে লটারি পেয়ে গেছি। কয়েক লাখ। টাকার ফাস্ট প্রাইজ।
আনন্দে হঠাৎ ছায়া নামল। কত রকমের উৎপাত যে আছে! জবা আর জবার মা একসঙ্গে এসে হাজির। জবার মায়ের স্বাস্থ্য ইদানীং বেশ ফিরেছে। স্বামীর কারবার বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। জবার আকর্ষণও কিছুমাত্র কমেনি।
জবার মা বললেন, তোমার বাবা পালিয়ে গেছেন, খবর পেয়েছি। আসি আসি করে আর আসা হয়নি। পালিয়ে গেছেন, শব্দটা শুনে সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। জবা আর জবার মা দুজনেই বাবার খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসেছেন। শয্যায় নারীর স্পর্শ। চক্ষুলজ্জায় বলতে পারছি না কিছু। জবার আবার পা দোলানোর অভ্যাস। কাকাবাবু থাকলে বলতেন, শনি নীচস্থ। জবার চিরদিনই লজ্জা-শরম কম। আরও যেন একটু কমেছে। ইচ্ছে করছে উঠে গিয়ে শাড়ির আঁচলটা গোছগাছ। করে দিয়ে আসি।
