মামা আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বললেন, কী? জেরায় সন্তুষ্ট তো?
মেনিদা বললেন, এরপর আর কী প্রশ্ন থাকতে পারে? আর কেনই বা তুমি মিথ্যে কথা বলবে? চশমার খাপটা সুটকেসে ঢোকাতে ঢোকাতে পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাসের কাহিনি মনে পড়ে গেল। এ যেন অনেকটা সেই রকমেরই ঘটনা। মামা একজন মস্ত বড় অভিনেতা। তার পক্ষে ছোট-বড় যে-কোনও মিথ্যাকে সত্য বলে চালানো কোনও ব্যাপারই নয়। এর বহু নজির আছে। সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা ভেঙে চুরমার করে জীবনকে দাঁড় করিয়েছেন। চশমাটাকে একান্তে আরও ভাল করে পরীক্ষা করলুম। বড়ই চেনা। পিতা হরিশঙ্কর বলতেন, আমার হল ‘হক নোজ। আর একজনের এইরকম নাক ছিল, তার নাম চেঙ্গিজ খান। সেই নাকের ওপর এই চশমাটাই কি ঝুলত না! চশমা, তুমিই বলো। নিজের সত্য নিজেই উদঘাটন করো।
মামা আলাপ শুরু করে দিয়েছেন। যেন সুরের মিছরি ভাঙছে গলায়। সেই বিখ্যাত গান, আঁখিয়া ভর আয়ি। দরশ তুহে লাগি। বিলম্বিত একতালে সুরের রাজহাঁস হেলেদুলে চলেছে। আমার। চোখও জলে ভরে এল। বড় সময়ের গান। আমিও তো তার দর্শন চাইছি। দরশ কুঁহে লাগি। DUR37 US OVITI Who rides so late through the night and storm? It is the father with his child, ওঘরে ভোর যেন ধীর পায়ে ঢুকছে রাতের অবগুণ্ঠন মোচন করে।
মামা সুরের সমুদ্রে তলিয়ে গেলেন। চোখ-মুখের চেহারা একেবারে অন্যরকম। এমন মানুষ মিথ্যে কথা বলেন কী করে! মেনিদার রাতজাগা মুখে একটা গর্বের ভাব। দেখো দেখো, এই ছেলেটা একসময় আমার ছাত্র ছিল। আমি পতিত, ও উথিত।
ঘরের অন্ধকার হামাগুড়ি দিয়ে কোণে কোণে পালাচ্ছে। অনেক আগেই আলো নেবানো হয়ে গিয়েছিল। জানলায় পরদার মতো ঝিলঝিল করছে সদ্যোক্ষুট নতুন একটি দিন। গান শেষ হল। মামা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। মেনিদা ঠিং করে খঞ্জনিতে একটা শব্দ তুলে বললেন, বেরিয়ে পড়ি এইবার। আমি এক দিনের ফেরিঅলা।
মামা শুয়ে পড়লেন খাটে। সামান্য একটু নিদ্রা তো চাই। আমি জানি, এই সময় তার একটু চায়ের প্রয়োজন হবে। চিত হয়ে শুয়ে আছেন বেদি থেকে নামানো গ্রিক দেবতার মতো। অনেকটা কিটসের মতোই রূপ। ঘুমিয়ে পড়েছেন। মসলিনের মতো ফিনফিনে নিশ্বাস পড়ছে। বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলুম সেই নিদ্রিত নিভাঁজ শান্ত মুখের দিকে। গুণের আধার। ভেতরে সুরের সমুদ্র। ওই মুখে কি আমার মায়ের মুখের আদল ভাসছে?
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে, পায়ে হাত ঠেকালুম। এইভাবেই নাকি নিদ্রিত মানুষকে জাগাতে হয়। পাতলা ঘুম। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালেন। কিছুক্ষণ সময় লাগল পরিবেশটা বুঝে নিতে। চায়ের কাপ তুলে ধরলুম। মৃদু হেসে বললেন, তোর কী ভালবাসা রে!
চা শেষ করে মামা উঠে পড়লেন। আড়মোড়া ভেঙে বললেন, বেশ ফ্রেশ লাগছে। জাস্ট এ লিটল স্লিপ। ঠিক ছ’টার সময় মামা বেরিয়ে গেলেন গাস্টিন প্লেসের রেডিয়ো অফিসে। যাবার সময় বলে গেলেন, প্রোগ্রামটা শুনিস। যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়ে রইলুম তার চলে যাওয়ার দিকে। সেই নিদ্রিত মানুষ নয়। আত্মসচেতন, কিঞ্চিৎ অহংকারী এক শিল্পী। জিজ্ঞেস করা হল না, কখন ফিরবেন? যতই অহংকার করুন, এ-ও এক নিঃসঙ্গ মানুষের ছবি।
গোলাপের ছোট ছোট টব। একে একে সব ছাতে তুললুম। প্রত্যেকটায় একটা-দুটো করে কুঁড়ি লেগে আছে। জীবন্ত, সতেজ গাছ। সারারাত বাইরে থাকায় তাজা লকলকে। এবাড়ি আর পাশের। বাড়ি গায়ে গায়ে। লাগোয়া পাঁচিলটা বেশ উঁচু। পাঁচিলের ওপাশে হঠাৎ একটা মাথা জেগে উঠল।
কী করছ তুমি একা একা?
জবা! সেই ভয়ংকরী, ডাকাবুকো মেয়েটা। যে ওই পাঁচিল বেয়ে এই ছাদে লাফিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল। বিয়ে হয়েছে। ছেলেপুলে হয়েছে। সে যৌবন আর নেই। এখন শান্ত এক মা। আগে লাল শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পরা জবার দিকে তাকালেই শরীর খারাপ হত! জবা কত ছেলেকেই যে গোল্লায় পাঠিয়েছিল! প্রশ্ন করলুম, কবে এলে?
কাল। সব পাট চুকিয়ে এলুম। জানো তো, ওরা আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে! কী মজা! এরাও বলছে তাড়িয়ে দেবে। এইবার বেশ ঝি-গিরি করে বাঁচব। তোমাদের বাড়িতে আমাকে রাখবে? খাওয়া-পরা।
জবা হাসছে। ঝকঝকে দাঁত। বিশাল খোঁপা। জবা কান্নার শব্দে হাসছে।
২.২৯ Still nursing the unconquerable hope
মেয়েদের এই এক সমস্যা। যৌবনটাকে সহজেই নয়ছয় করে ফেলে। জবার সেই পাগলামি, আবেগের বাঁধ ভাঙা নদী। সুখেনকে নিয়ে তো বেশ সুখেই ছিল। কী হল, কে জানে! কত রকমের বিভ্রাট যে নেমে আসে জীবনে। ভগবান করুন, আবার যেন সংসার ফিরে পায়! জবাকে বেশ দেখতে হয়েছে। আমার এইসব ভাবা উচিত নয়, শুধু ভয় করে, কোন জীবন যে কোথায় চলে যাবে! কী পরিণতি পাবে! একজন বলেছিলেন, জীবন একটা পিয়ানো। সেই পিয়ানোর রিডগুলো সব কাটা দিয়ে মোড়া। বাজাবে। সুর ঝরে পড়বে। কিন্তু আঙুলগুলো সব ক্ষতবিক্ষত হবে।
আমার পিতার একটা সুন্দর নোটবই আমি খুঁজে পেয়েছি। অপূর্ব হস্তাক্ষরে উপাদেয় সব দার্শনিক তত্ত্ব লেখা আছে। উপন্যাসের চেয়েও সুখপাঠ্য। জগৎ জীবন ভুল হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুলে নিয়ে যায় অন্য লোকে।
হরিশঙ্কর লিখছেন, একদিন স্বপ্ন দেখছি আমি একটা সুন্দর রঙিন প্রজাপতি হয়ে গেছি। ফুরফুর করে উড়ছি। ফুল থেকে ফুলে। কখনও ভেসে যাচ্ছি এক টুকরো কাগজের মতো। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ছিঁড়ে গেল স্বপ্ন। ভাবতে বসলুম, কোনটা ঠিক। আমি স্বপ্ন দেখছিলুম আমি একটা প্রজাপতি।
