পাজামা আর গেঞ্জি পরে মামা হারমোনিয়মের সামনে বসেছেন। হাতে চায়ের কাপ ধোঁয়া ছাড়ছে। ঘড়িতে ঠিক দুটো। মেনিদা অদূরে দেয়ালে ঠেসান দিয়ে ধ্যানস্থ। মামাকে বেশ তৃপ্ত। দেখাচ্ছে। মুখে একটা হাসির ভাব। অর্থাৎ সব জেনেও না-জানার অভিনয়। মেনিদার দিকে তাকালুম, মনে হল ঢুলছেন।
খালি কাপটা একপাশে রেখে মামা বললেন, কী রে! অমন গুম মেরে গেলি কেন?
মামার দিকে আরও কিছুটা সরে গিয়ে ফিসফিস করে বললুম, আপনি সব জানেন, তাই না?
কী জানি বল তো? অকৃত্রিম অভিনয়।
তিনি কোথায় আছেন।
আমি কেমন করে জানব? আর জানলে তোকে বলব না!
মামা, জীবনে একটা সত্যি কথা বলুন। আমার মনের অবস্থাটা একবার চিন্তা করুন। পরপর যা ঘটে গেল আপনাকে বলা হয়নি। আরও যা ঘটবে তার আভাস আছে। শুনলে স্তম্ভিত হয়ে যাবেন।
মেনিদা তন্দ্রা-জড়ানো গলায় বললেন, জানলে বলে দাও। বড় কষ্টে আছে। হাতে-পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনুক সম্রাটকে। নয়তো ধ্বংস অনিবার্য।
মামা আশ্চর্য হবার ভান করে বললেন, জানলে বলব না? তা কখনও হয়! তা হলে অত কষ্ট করে বয়ে বয়ে গোলাপ আনলুম কার জন্যে!
মামা হারমোনিয়মে সাপাট একটা তান বাজালেন। লম্বা ফরসা আঙুল বিজলির মতো খেলে গেল। অনামিকার আংটির পাথর ঝলসে উঠল।
আমি হাতটা খপ করে চেপে ধরে বললুম, একটা সত্যি কথা বলুন না আমার এই দুর্দিনে!
সংগীতে বাধা পড়ায় আমার রাগী মামা যেন একটু বিরক্তই হলেন, তোর এই ধারণার কারণটা কী?
আপনার সুটকেসে ওটা কার চশমার খাপ?
চশমার খাপ? মামা অবাক হবার ভান করলেন। আমার সন্দেহ আরও ঘোরতর হল।
হ্যাঁ, চশমার খাপ, রুমালে জড়ানো। আমার গলা আর স্বাভাবিক নেই। মেনিদা সোজা হয়ে বসলেন উত্তেজনার গন্ধ পেয়ে। আমার কানদুটো গরম আগুন। দু’জনে ষড়যন্ত্র করেছেন, জামাইবাবু আর শ্যালকে। একটা অশুভ আঁতাত তৈরি হয়েছে আমাকে শিক্ষা দেবার জন্যে। এই শ্যালক সম্পর্কেই একদিন আমাকে কত সাবধান করেছিলেন, বি কেয়ারফুল, মামার মতো ফুলবাবুটি হোয়ো না। ওর অনেক গুণ, মানাবে। ইউনিভার্সিটি ব্লু, শিল্পী। তুমি মিডিয়কার, ট্যালেন্টলেস। ভাল-মন্দ খেয়ে পেট খারাপের সান্ত্বনা আছে। কুমড়োর ঘাট খেয়ে কাত হলে, অতিশয় দুঃখের। তোমার একমাত্র সম্বল চরিত্র, আদর্শ, সততা।
হারমোনিয়মটা ভ্যাক করে বন্ধ করে মামা বললেন, অ, ওটা নজরে পড়ে গেছে!
হ্যাঁ পড়েছে। না পড়ে উপায় ছিল না। রুমালের পাশ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। ভেতরে সেই চশমা।
ওটা আমার শ্বশুরমশাইয়ের চশমা।
কেন আমাকে ভোলাবার চেষ্টা করছেন? বাবার চশমা আমি চিনব না! কানের কাছে নাকের ব্রিজে মাদার অফ পার্লস দিয়ে মোড়া। গোল ফ্রেম।
তোর ধারণা পৃথিবীতে ফ্রেম যখন তৈরি হয়, এক পিসই হয়? আমার সঙ্গে বউবাজারে চল। দেখবি একই ফ্রেম একশোটা পাশাপাশি রয়েছে।
আমি অসহায়ের মতো মেনিদার দিকে তাকালুম।
তিনি মামাকেই সমর্থন করলেন, তা অবশ্য হতে পারে। জয়ের চোখে যে-চশমাটা রয়েছে আমি আরও অনেকের চোখে এমন চশমা দেখেছি।
মামা সমর্থন পেয়ে বললেন, তবে! শুনলে তো!
আমার লড়াই থামল না, এটা তো প্রাচীন ফ্রেম।
মামা বললেন, চাটুজ্যেমশাই আর আমার শ্বশুরমশাই দু’জনেই তো প্রাচীন। প্রায় সমবয়সি।
আমি ঝট করে উঠে গিয়ে চশমার খাপটা নিয়ে এলুম। আমি তো পিতা হরিশঙ্করের শুধু সন্তানই ছিলুম না, বিশ্বস্ত কুকুরও ছিলুম। প্রভুর সমস্ত সামগ্রীর বর্ণ, গন্ধ, স্পর্শ আমার জানা। এতটা ভুল তো আমার হবার কথা নয়। খাপটা বহু ব্যবহারে ছাল ওঠা-ওঠা হয়ে গেছে। মাঝখানে একটু টাক। আমি তো চিনি। কতবার আমি ওই চশমা টেবিল থেকে তুলে খাপে ভরেছি। নরম সিল্কের কাপড় দিয়ে সোনালি অংশ আর কাঁচ পালিশ করেছি। আমার কখনও ভুল হতে পারে? কাঁচের দিকে তাকিয়েই হরিশঙ্করের বড় বড় দার্শনিক চোখ আমি দেখতে পেয়েছি। যে-চোখে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাব খেলা করত। কখনও অ্যাডমিরাল। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে অনন্ত নীল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন যেন। কখনও কবি। প্রকৃতির সবুজ শোভায় বিভোর। কখনও রুদ্র ভৈরব। কখনও রসিক। কখনও ধারালো ব্যঙ্গ। আকাশের মতো রূপ পালটাত ক্ষণে ক্ষণে।
চশমাটা হারমোনিয়মের ওপর রেখে বললুম, এই চশমাটা বাবার নয়? এই খাপটা বাবার নয়? আমার চিনতে এত ভুল হবে?
মধ্যরাতে আলোর ভোল্টেজ বাড়ে। সেই চড়া আলোয় মামার ফরসা মুখ ফসফরাসের মতো জ্বলছে। খাঁড়ার মতো অহংকারী নাক। তিনি যেন একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, আচ্ছা মুশকিল তো! তুই বুঝছিস না কেন, চশমা আর খাপ একই হবে! যে-চশমার যে-খাপ। বউবাজারের একই বড় দোকান থেকে হয়তো একই সময়ে দু’জনে চশমা করিয়েছিলেন। আমি কী করতে পারি বল!
চশমাটা ভাল করে পরীক্ষা করলুম। একটা উঁটি খুলে গেছে।
প্রশ্ন করলুম, চশমাটা এনেছেন কেন?
এটা একটা আন-ইনটেলিজেন্ট প্রশ্ন হল। দেখতেই পাচ্ছিস ভেঙে গেছে। মেরামত করতে হবে।
আপনার শ্বশুরমশাই তো দক্ষিণ কলকাতায় থাকেন। রাঁচি গেলেন কেন?
তুই তো দেখছি পুলিশের জেরা শুরু করলি। রাঁচিতে গেছেন বায়ু-পরিবর্তনে। মেয়ের কাছে কিছুদিন থাকবেন বলে। হয়েছে!
হঠাৎ আমার মাথায় খেলে গেল, পিতা নিজেই একজন বড় মেকানিক। এই সামান্য মেরামতির জন্যে দোকানের শরণাপন্ন হবেন কেন? পরমুহূর্তেই মনে হল, স্কুটা হারিয়ে গেছে বলেই হয়তো নিজে মেরামতি করতে পারেননি।
