জানি না। চলে গেছেন কোথায়, কারওকে কিছু না বলে।
বলিস কী? তা আমাকে একটা চিঠিতে জানাতে কী হয়েছিল?
আপনার ঠিকানা?
আমার ঠিকানা তোর কাছে নেই?
আপনি দিয়ে যাননি।
সে কী রে? এমনও হয়!
গুম মেরে রইলেন কিছুক্ষণ। আপনমনেই বললেন, জানতুম। এইরকম একটা কিছু হবে। সংসারের ছোট্ট আঁধারে অত বড় একটা মানুষকে ধরে রাখা শক্ত।
মামা পা টিপে টিপে, অতি সন্তর্পণে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগলেন।
আমি বললুম, ফুলের ঝাঁকাটা?
মামা বললেন, ফুল এনে ফুল বনে গেলুম। ফুলের মর্ম এবাড়িতে আর কে বুঝবে? ভাগ্যিস কুকুরবাচ্চাটা আনিনি! বাড়ি তো শ্মশান।
মেনিদা দাঁড়িয়ে আছেন সিঁড়ির মাথায়। সেই একই বৈষ্ণবের পোশাকে। দু’হাত বাড়িয়ে বললেন, এসো, জয় এসো। তুমি ঠিক সময় এসে গেছ।
মামা প্রথমে চিনতে পারেননি। পরে চিনতে পেরেই বললেন, আরে, মাস্টারমশাই আপনি? আপনি এখানে?
অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে বাবা। ছেলেটা যাতে ভয় পায় তাই রাত-পাহারা দিতে এসেছি।
চাটুজ্যেমশাই তো নিরুদ্দেশ? এ ছাড়া আর কী হয়েছে?
পরে শুনো। আগে জামাকাপড় ছাড়ো। খাওয়াদাওয়া করো।
আমাকে একপাশে নিয়ে গিয়ে মেনিদা কানে কানে বললেন, কী খাওয়াবে?
এখনও কচুরি আলুরদম আছে।
কচুরিটচুরি খাবে তো? শিল্পী মানুষ। এখুনি বলবে, গলা খারাপ হয়ে যাবে।
সে তত তিনটে জিনিসে হয়। চাটনি, দই আর আইসক্রিম।
তবু তুমি জিজ্ঞেস করো। সেরকম হলে আমরা স্টোভ ধরিয়ে কিছু করে দোব।
মামা ততক্ষণে অন্য সমস্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ধুতির কাছার দিকে একটু কাদা ছিটকে লেগেছে। আমাকে বললেন, খাওয়াদাওয়া নিয়ে অত ভাবছিস কেন? চা আছে তো। আগে আমাকে একটা কাপড় কাঁচা সাবান দে।
এত রাতে কাপড় কাঁচতে বসবেন? কাল সকালে হবেখন। তা না হলে আমাকে দিন, আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
শোন, কাপড়ে কাদার দাগ, চরিত্রের কলঙ্ক প্রায় পার্মানেন্ট। সহজে তোলা যায় না। আলাদা কায়দা। ধীরে ধীরে, ঘষে ঘষে, যেন ছড়িয়ে না যায়!
আমি জানি মামা। কায়দাটা আমার জানা আছে।
জানলেও আমি তোমাকে করতে দেব না। আমার অস্বস্তির কারণ হবে।
কচুরি আর আলুরদম আছে। রাতটা চলে যাবে?
খুব যাবে। তুই কি আমার জন্যে এখন রান্না করতে বসবি? শোন, আমাকে মনে হচ্ছে সারারাত জাগতে হবে। কাল ভোরেই আমার রেডিয়ো প্রোগ্রাম। বিলাসখানি টোড়িটা এক রাউন্ড ভেঁজে নিতে হবে তো!
নেবেন। অসুবিধে কী আছে? হারমোনিয়ম বার করাই আছে।
তা হলে লেগে যাই কর্মযজ্ঞে!
বহুকাল পরে সময় লজ্জা পেয়ে গেল। ভেবেছিল বেহুশ ঘুমে সবাই অচেতন হয়ে পড়বে। নিঃশব্দে একটি দিনের আয়ু হরণ করে চলে যাবে। তা আর হল না। সব আলো জ্বলে উঠল। অসম্ভব এক কর্মব্যস্ততা। যেন সবে দিন শেষ হয়ে সন্ধে নেমেছে। পিতা হরিশঙ্কর যখন ছিলেন তখন এইরকম সব উদ্ভট কাণ্ড প্রায়ই হত। সময়ের দাসত্ব মেনে নিতে তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। না সময়ের, না মানুষের, না অভ্যাসের, কোনও কিছুর তিনি দাস ছিলেন না। তিনিই ছিলেন প্রকৃত প্রভু। রাজার রাজা রাত বারোটার সময় চা-টা খেয়ে যখন বইপত্তর খুলে বসতেন, তখন মনে হত এই সবে শাঁখ বাজিয়ে সন্ধে হল। ছুটির দিন বেলা পাঁচটার সময় গঙ্গার স্নান করে উঠছেন। বৈকালিক ভ্রমণকারীরা ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করছেন, আর ইউ লেট অর টু আরলি ফর টোমরো?
একটা মোড়ার ওপর জয়নারায়ণ বসেছেন, কোলের ওপর তোয়ালে, তার ওপর কাপড়ের সেই অংশটা যেখানে লেগে আছে কাদার ছিটে। রুমালে সাবান মাখিয়ে সন্তর্পণে ঘষছেন আর বলছেন, এ ভেরি ডেলিকেট অপারেশন। ছড়িয়ে ছেতরে না যায়!
মেনিদা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, জয় কী খাবে! এত রাতে ঘিয়ে ভাজা খেলে অম্বল হবে, কাল সকালে আর গাইতে পারবে না। এই মানুষটি সম্পর্কে এখন দেখছি আমার কিছুই জানা হয়নি। এঁর অবশ্যই একটা গৌরবের অতীত আছে। যে-অতীতের আমি সাক্ষী নই। গৌরবের অতীতটাকে কী কায়দায় ভদ্রলোক ঘৃণার বর্তমান করে তুললেন, জানতে ইচ্ছে করে। মানুষ কীভাবে পড়ে যায়! কে তাকে পেড়ে ফেলে? মামার মতো একজন সেরা ছাত্রের শিক্ষক ছিলেন। এখন ভোরবেলা ফুলুরি ভিক্ষে করেন! এর-তার ব্যাপারে নাক গলান। অসভ্য অসভ্য কথা বলেন। গৌরব কোথাও একটা মস্ত বড় খোঁচা মেরেছে।
মামা তন্ময় হয়ে কাদার দাগ তুলছেন আর জয়জয়ন্তী ভঁজছেন–এই সো না বোলো লাগরি রাধা। গলায় যেন মিছরির চাক। বাদ্য বাজনা ছাড়াই যে কী কাণ্ড করছেন! চেহারা আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। মুখে জ্বলজ্বল করছে একটা জ্যোতি। যে-ঝড় বইছিল জীবনের ওপর দিয়ে, সে ঝড় কিছুটা কেটেছে। আমার তাই বিশ্বাস!
মেনিদা খুব চিন্তিত মুখে বললেন, জয়, এত রাতে কচুরি না-ই বা খেলে!
মামা এক মুখ হেসে বললেন আপনি আমার জন্যে এত ভাবছেন কেন? ঘড়ির দিকে তাকান, আর কিছু খাওয়ার প্রয়োজন হবে না। এখুনি পাখির ডাক শুনতে পাবেন। আসুন আমরা সবাই মিলে চা খাই!
মামা আমাকে বললেন, সুটকেস খুলে একটা পাজামা আর গেঞ্জি বের করে আনতে। পাশের ঘরেই সেই সুটকেস। শৌখিন মানুষের শৌখিন সুটকেস। চাপ দিতেই খুটুস করে খুলে গেল। ডালা ওঠাতেই ভুরভুরে সুগন্ধ। সিল্কের পাঞ্জাবি, ধুতি, পাট করা রুমাল, আন্ডারওয়্যার। দাড়ি কামাবার সেট। গানের খাতা। কিটসের কবিতার বই। একেবারে তলায় পাজামা আর গেঞ্জি। সবই পরিচ্ছন্ন, যেন একেবারে নতুন। হঠাৎ নজরে পড়ে গেল জিনিসটা। রুমালে জড়ানো ছিল। একটা পাশ খুলে গেছে। সেই খোলা অংশ দিয়ে উঁকি মারছে একটা চশমার খাপ। শরীর অবশ হয়ে গেল। এই তো সেই চশমার খাপ! এরই মধ্যে থাকত পিতা হরিশঙ্করের গোল্ড ফ্রেমের চশমা। এদিক ওদিক তাকিয়ে খাপটা খুললুম। বুকটা ধড়াস করে উঠল। ভেতরে সেই চশমা। নিভৃতে শুয়ে আছে। ফ্রেমের একটা উঁটি ভেঙে গেছে। তা হলে? মালিক কোথায়? মামা এতক্ষণ অভিনয় করছিলেন আমার সঙ্গে। সব জানেন তিনি! মহা অপরাধীর মতো খাপটাকে কাপড়চোপড়ের অন্তরালে রেখে। ফিরে গেলুম। সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ। সন্দেহ, অভিমান, চাপা একটা রাগ উথলে উঠছে ভেতরে। ধরতে পারছি না ষড়যন্ত্রটা কী? কীসের জন্যে এই লুকোচুরি!
