মেনিদা হাহা করে হেসে বললেন, শোনো, আমার থিয়োরির সঙ্গে তোমারটা মিলবে না। বাইরেটাকে এমন করে রাখবে, যেন তোমাকে কেউ চিনতে না পারে। মহাপুরুষের ভেক ধরলে। তাদের অপমান করা হয়। অভিনয় করা হয়। বাইরেটা ভাল ভেতরটা নোংরা, সে বড় সাংঘাতিক জীব। ভয়ংকর বিপজ্জনক। উলটে নাও। বাইরেটা ভয়ংকর, কিন্তু ভেতরটা সুন্দর। বিহারি নদী দেখেছ? বাইরে বালি, একটু খোঁড়ো, স্বচ্ছ টলটলে শীতল জল। তোমার বাবার কথাই ভাবো না! বাইরেটা রুক্ষ, কঠোর, তীব্র, ঝাঝালো, কর্কশ, ঘোরতর নাস্তিক। ভেতরে স্নেহের ফল্গুধারা। মেনি বাইরে খারাপ। সবাই ঘৃণা করে। কেউ কাছে ঘেঁষে না। আরে সেইটাই তো আমি চাই। তলে তলে এগিয়ে যাও। সাধু মরণে সাবধান! গল্পটা জানো?
বলুন না শুনি।
বারাণসীতে এক সাধু ছিলেন। ভক্তদের মাঝখানে বসে আছেন। এক পাগলি কোথা থেকে এসে। হাত পা নেড়ে রোজই এক কথা বলে যায়, ওরে সাধু মরণে হুশিয়ার! সাধুর অহংকারে লাগে। তেড়ে ওঠেন, বেরো বেরো। পাগলি হাসতে হাসতে পালায়। কিন্তু রোজই আসে, আর রোজই সেই এক কথা বলে যায়। অবশেষে সাধুর মরণকাল এসে গেল। নিজের আটচালায় চিত হয়ে শুয়ে আছেন। প্রাণ যায় যায়। এমন সময় সাধুর নজর হঠাৎ চলে গেল চালের বাতার দিকে। সেখানে গোঁজা রয়েছে। একজোড়া নতুন পাদুকা। কোনও ভক্ত দিয়ে গিয়েছিল। সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি। সেই আফসোস নিয়েই সাধুর মৃত্যু হল। তারপর! আবার সেই বারাণসী, কিন্তু এর মাঝে বহু বছর পার হয়ে গেছে। দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছে এক মুচি বসে বসে ঠুকঠুক করে জুতোয় পেরেক ঠুকছে। হঠাৎ এক সাধিকা সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুচিকে বললেন, কী সাধু, মনে পড়ে, বলেছিলুম মরণে হুঁশিয়ার! মনে পড়ে সেই কথা? মুচি চোখ তুলে তাকালেন। চোখে জল। মুহূর্তে মনে পড়ে গেল পূর্বজন্মের কথা। জুতোর আফসোস নিয়ে মরেছিলেন। এই জন্মে তাই কত জুতো! জুতোর। দুনিয়াতেই জীবন কাটছে। সেই কারণেই খুব সাবধান পিন্টু। গল্প গল্পই। তবে নীতিটা হল বাইরের ভেক কিছুই নয়, আসল হল ভেতর, যেটাকে কেউ দেখতে পায় না। ভেতরটাকে বেশ ভাল করে সাজাও। আরে তুমি কোন বাপের সন্তান! লড়ে যাও। হও কর্মেতে বীর, হও ধর্মেতে ধীর, হও উন্নত শির। দেখো, আমি তোমাকে এইসব বলছি, বাইরে যেন প্রচার না হয়ে যায়। আমার ইমেজ ভেঙে যাবে। ঘৃণা মানুষকে একঘরে করে অচ্ছুত করে। নির্জনতা এনে দেয়। সংসার তাকে খারিজ করে। কী মজা! আচ্ছা, আমি একবার বাথরুমে যাই। হাত মুখ ধুয়ে, ইষ্ট নাম স্মরণ করে এবার ধুপুস করা। যাক।
দক্ষিণের একটা জানলা অল্প একটু ফাঁক করলুম। বৃষ্টির দাপট কমে গেছে। ফিনফিনে আদ্দির। পাঞ্জাবির মতো বাতাস বইছে। অনেকটা নীচে রাংতার মতো ভিজে রাস্তা। আকাশ ঘোলাটে সাদা। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ এসে গেলেন। ইলেকট্রিক তার থেকে জল পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা। সেইদিকে তাকিয়ে মনে পড়ে গেল,নবাঙ্কুর ইক্ষুবনে এখনও ঝরিছে বৃষ্টিধারা/বিশ্রামবিহীন/মেঘের অন্তরপথে অন্ধকার হতে অন্ধকারে/চলে গেল দিন/শান্ত ঝড়ে, ঝিল্লিরবে, ধরণীর স্নিগ্ধ গন্ধোচ্ছাসে/মুক্ত বাতায়নে/বৎসরের শেষ গান সাঙ্গ করি দিনু অঞ্জলিয়া/নিশীথগগনে।
বৈষ্ণবরা যেভাবে বস্ত্র পরেন ধুতিটাকে সেইভাবে পরে মেনিদা ঘরে এলেন। গুনগুন করে কী একটা গাইছেন! আমি রাস্তার দিকেই তাকিয়ে আছি। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের তীব্র একটা আলোয় রাস্তা ঝলসে উঠল। খুব মিহি বৃষ্টি এখনও পড়ছে। কালো একটা গাড়ি ঘাস করে থেমে পড়ল বাড়ির সামনে।
আর আমি! এই রে পিসিমারা এসে পড়েছেন, বলে নিচু হয়ে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায়, ঢুকতে চাইছি। মেনিদা বলছেন, এ আবার কী? ছেলের এ কী ছিরি!
২.২৮ Like a sword that cuts
দুধের মতো সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। হাঁসের পালকের মতো সাদা ধুতি। ব্যাকব্রাশ করা লম্বা লম্বা চুল। চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং। কুচকুচে কালো মোটরগাড়ি। মাতুল নেমে এলেন। মাতুল জয়নারায়ণ। হালকা আতরের গন্ধ। নেমেই বললেন, অবাক হবার কিছু নেই রে ব্যাটা। ট্রেন দুঘণ্টা লেট। ঝড়বৃষ্টিতে তিন ঘণ্টা ডিটেল্ড। অ্যান্ড দি ক্লক স্ট্রাইকস টুয়েলভ। চাটুজ্যেমশাইয়ের এইটাই তো টি-টাইম।
পাঞ্জাবি চালক হাসতে হাসতে গাড়ির পেছন দিকের ডালাটা খুলছেন। তাঁর খুশির ভাব দেখে মনে হচ্ছে সারাটা পথ মামা মজার মজার কথা বলতে বলতে এসেছেন। মামার সঙ্গে একটানা এক মাস বসে থাকলেও কারও বিরক্তি লাগবে না। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যাবে বোঝাই যাবে না। মজলিশি মানুষ। কত সত্য ঘটনা যে সঞ্চয়ে আছে। তেমনি রসবোধ।
গাড়ির পেছন থেকে একটা ঝুড়ি নেমে এল। তাইতে দশ-বারোটা ছোট ছোট ফুলগাছের টব। মাতুল বললেন, কী দেখছ! চাটুজ্যেমশাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যাবেন। রাঁচির সেরা নার্সারির সবচেয়ে সেরা গোলাপ। ফুল দিয়ে পৃথিবী সাজাব বন্ধু। দুঃখ ম্লান হয়ে যাবে। প্রিয়জন ছেড়ে গেছে যাক। গোলাপ এসেছে ফিরে।
ছোট একটা সুটকেস নেমে এল। ভাড়া বকশিশ বুঝে নিলেন চালক। বললেন, এমন ইনসান খুব কমই দেখেছি। সদরে ঢুকে সুরেলা পঞ্চমে মামা হাঁকলেন, চাটুজ্যেমশাই!
আমি তখন বললুম, মামা, তিনি নেই।
জয়নারায়ণও সেই সংবাদে থমকে গেলেন। প্রশ্ন করলেন, নেই মানে? ইয়ারকি করছিস আমার সঙ্গে! নেই মানে? কোথায় গেছেন?
