রান্নাঘরে তিনজন পাশাপাশি খেতে বসেছি। মেয়েদের খেতে বসার ধরনটাই আলাদা। একটা হাঁটু খাড়া থাকবে, আর একটা পাতা থাকবে জমিতে। তার ওপর থাকবে একটা হাত। ঠোঁটদুটো অল্প ফাঁক। খাবার ঢুকবে একটু একটু করে। খাচ্ছে কি খাচ্ছে না বোঝার উপায় থাকবে না। যে গতিতে খাওয়া চলেছে, শেষ হতে রাত দুটো বাজবে। কনক নিজের পাত থেকে একটা পটল আমার পাতে তুলে দিল। তুলে দিয়েই খেয়াল হল, এ মা তোমার পাতটা এঁটো করে দিলুম যে।
আনন্দে সারাশরীর শিরশির করে উঠল। কত কাছাকাছি চলে এসেছি। দুটো মহাদেশ যেন এক হচ্ছে। আমার একটা সেই মাছি-মার্কা হাসি আছে। দাঁত বের করা, গালে টোল ধরানো। সেই সাপের হাসি যে বেদেয় চেনে। মুখটাকে গাটাপার্চারের মতো করে বললুম, তাতে কী হয়েছে! তুমি খেলে না কেন?
নতুন পটল। সুন্দর খেতে। তুমি একটা বেশি খাও। রান্না কেমন হয়েছে?
উঃ। ওয়ান্ডারফুল। কার কাছে শিখলে এমন রান্না।
মায়ের কাছে।
সব শেষ হতে বারোটা বেজে গেল। উত্তর মহলের আলো নিবে গেল। কনক বললে, মুকু, তুই কি এখন আবার পড়তে বসবি?
আর শরীর বইছে না।
আজ তা হলে শুয়ে পড়।
ছাতে ধুপধাপ আওয়াজ হচ্ছে। পিতৃদেব পদচারণা করছেন। হজমের জন্যে যা অবশ্য করণীয়। বৃষ্টি পড়লে ছাতা মাথায় দিয়েও করতে হবে। আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলেও সূর্য পূর্ব দিকে ঠিকই ওঠে। কোনও নড়চড় নেই।
১.০৮ যামিনী জাগহি যোগী
পিতৃদেব অনেকক্ষণ কান খাড়া করে বসে আছেন। সামনে একটা মোটা বই আধাআধি জায়গায় খোলা। চাপা আলো সামনে ছড়িয়ে পড়েছে। মশারির মধ্যে শুয়ে শুয়ে দেখছি। ঘুম চটে গেছে। সহজে কি আর আসবে। হঠাৎ মশারির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী ডাকছে বলো তো? মনে হচ্ছে দুটো কোলা ব্যাং মুখোমুখি বসে গলা সাধছে! এখন তো বর্ষাকাল নয়। ব্যাং আসবে কোথা থেকে?
আজ্ঞে ব্যাং নয়। মেসোমশাইয়ের নাক। দুটো ফুটো দু’রকম শব্দ ছাড়ছে। আর মাঝে মাঝে গলাটা আমতা আমতা করে উঠছে।
রাত বারোটার পর পিতৃদেব একটু নরম হয়ে যান। তখন একটু রসিকতা টসিকতা চলে। রোদ উঠলেই স্বভাবের জলাশয় উত্তপ্ত হতে থাকে। সূর্য যখন মধ্যগগনে মেজাজও তখন সপ্তমে। মেজাজেরও উদয় অস্ত আছে। আসলে এই ঘরে এই সময় তো মায়ের শোবার কথা। নীল শাড়ি, চুড়ির শব্দ। চুলে চিরুনি চালাবার গাঢ় ঘন শব্দ। যেন বটের পাতায় হাওয়া লেগেছে। আমার মা হলেও পিতার স্ত্রী তো! দু’জনের সঙ্গে দু’রকম সম্পর্ক। রিভারসিবল সোয়েটারের মতো। দু’জনের কাছে দুরকম রং! সেই জায়গায় কে শুয়ে আছে। তারই গর্ভজাত এক অষ্টাবক্র মুনি। দেহেও মর্কট, মনেও মর্কট। সন্ন্যাস নিলে, নিজেই নিজের নাম রাখব স্বামী মর্কটানন্দ।
এ নাক কি শুলেই ডাকবে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, দুপুরেও সমানে ডেকে গেছে।
তার মানে মিউজিক্যাল নোজ। আমাদের ফ্যামিলিতে কারুর কখনও নাক ডাকেনি। ডাকের বহর দেখে মনে হচ্ছে অ্যাফ্রিকান নোজ। মেয়েদুটো ঘুমোচ্ছে কী করে! এ যে ঘরের পাশে ঘোড়ার আস্তাবল।
পিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। সমস্যায় সলিলোকি। শেক্সপিয়ার চালু করে দিয়ে গেছেন। ঘরের এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, রিভলভারে যদি সাইলেন্সার ফিট করা যায়, নাকে কেন যাবে না! নিশ্চয়ই যাবে। ওটা যদি গোল হয়, এটা হবে তিনকোনা।
রাতে চারপাশ শান্ত বলেই ডাকের জোর দুপুরের চেয়ে অন্তত একশো গুণ বেশি মনে হচ্ছে। একেবারে ষাঁড়ের ডাক। ঘঘারতর আক্রোশ। দাতে দাঁত চেপে নাক শব্দ করছে গাঁ গাঁ। বিরাট লরির ইঞ্জিন খাড়াই বেয়ে ওঠার সময় এইরকম পরিত্রাহী শব্দ ছাড়ে। আর একটি উপসর্গ যোগ হয়েছে যা দুপুরে ছিল না। নিজের ডাকে নিজেই চমকে উঠে সাড়া দিচ্ছেন, কে কে? চারবার কে বলে আবার নিচু পরদা থেকে নাক ধাপে ধাপে ওপরে উঠছে। সত্যিই আতঙ্কের বিষয়।
পিতার সলিলোকি, নাক কেন ডাকে? নাক ডাকে, না গলা ডাকে? বর্ষাকালে ব্যাং ডাকে। সে হল পুরুষের ডাক। পুরুষ ডাকছে প্রকৃতিকে। সে তো নাক নয়, গলার খেলা। দেখি বুক অব নলেজ কী বলছে।
রাত দুটো। মানুষের ঘুম চলে গেলে মাথা কত দিকে খেলতে চায়। বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বুক অব নলেজ খুঁজছেন। হঠাৎ মাথাটা বাঁ পাশে হেলে গেল। যেন কোনও কিছুর ঝাঁপটা লাগল। চট করে বসে পড়লেন। গুঁড়িগুড়ি এগিয়ে গেলেন টেবিলের দিকে। হাত বাড়িয়ে আলো নেবালেন। বই বন্ধ করলেন ধপাস করে। একই কায়দায় ফিরে এলেন বিছানায়, মশারির ভেতরে। ফিসফিস করে বললেন, এসে গেছে।
ঘরে সুইশ সুইশ করে ডানার শব্দ হচ্ছে। সেই বিশাল চামচিকিটা। চক্কর দিয়ে উড়তেই থাকবে, উড়তেই থাকবে। পিতার মহামান্য অতিথি। আজ আমাদের বাড়ি-ভরতি অতিথি, মেঘের মতো নাসিকা গর্জন, তাই তেমন গা ছমছম করছে না। নয়তো এই মধ্যরাতে, অন্যান্য দিন, দুটি প্রাণীর চোখের সামনে ডানা-মেলা অন্ধকার যখন লাট খেতে থাকে তখন কেমন যেন মনে হয়। That hor rible black scaffold dressed. That stapled block God sink the rest!
রঙ্গমঞ্চে লাট-খাওয়া চামচিকির প্রবেশ, পিতার গুঁড়িগুড়ি বিছানায় এসে ঢোকা, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস বলা, এসেছে, এসেছে। ঘাড়ের কাছে গরম নিশ্বাস। অন্ধকারে অন্ধকারের তরঙ্গ তুলে পক্ষযুক্ত অন্ধকারের অন্ধকার রেখা টেনে চলা, জগতের গর্ভমোচন করে অতিজাগতিকের রহস্যমুক্তির মতো বিমূর্ত কোনও অনুভূতি। শরীর কেমন শিথিল হয়ে আসে। পিতা বলতে থাকেন, এ সোল, এ সোল। মহৎ কোনও আত্মা। আমাকে অনেক বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। কার আত্মা! আমাদের যত মৃত পূর্বপুরুষ! আত্মার তলে ঈশ্বরের চাকিতে তিনকোনা পরোটার আকৃতি ধারণ করে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে! শিক্ষিত মানুষের এমন বিশ্বাস আসে কী করে? পরপর তিন দিন না এলেই বুঝবে বিপদ আসছে। একটা হাত মাথার বালিশে রেখে কাত হয়ে পিতা ঘরের অন্ধকারের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বোধিবৃক্ষের তলায় উপবিষ্ট বুদ্ধকে শিষ্য পোত্থাপদ জিজ্ঞেস করলেন, প্রভু, এই জগৎ কি অনন্তকালের নয়? কোনও উত্তর নেই? প্রভু, জগৎ কি সসীম? বুদ্ধ নিরুত্তর। জগৎ কি তবে অসীম? এ প্রশ্নেরও কোনও জবাব নেই। প্রভু, আত্মা আর দেহ কি এক? এরও কোনও উত্তর নেই। তা হলে কি পৃথক? বুদ্ধ বললেন, এসব প্রশ্ন অর্থহীন। ধর্মের সঙ্গে কোনও যোগ নেই। এর উত্তর জানা-না-জানায় প্রশ্নকারীর কোনও লাভ নেই। মূল কথা হল, দুঃখ, সমুদয়, নিরোধ আর মার্গ। আত্মা চামচিকি, না চামচিকি আত্মা এ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে চিত্তবৃত্তির নিরোধ সাধন করে ঘুমিয়ে পড়ো। মেসোমশাই আচমকা কে কে করে উঠলেন।
