হঠাৎ মনে হল সদরের কড়াটা কেউ নাড়ছে। তুমুল বাদলেও শব্দটা কানে আসছে। নীচেটা এই মুহূর্তে আমার কাছে ভীতিপ্রদ কবরখানা। অশরীরীদের মিলনভূমি। মনের জোর করে নামতে হল। বীর হরিশঙ্করের ছেলে আমি। বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। ছাতার ওপর অঝোরে জলপড়ার শব্দ। দরজাটা খোলামাত্রই ছাতাটাতা সমেত মেনিদা ঢুকে পড়লেন। বাইরে নীল ইস্পাতের মতো রাস্তায় বৃষ্টি নাচছে। গাছের পাতা পড়ে আছে। পোস্টের আলোয় জলে খেলছে রুপোলি ফুলঝুরি। ছাতার জলে বৃষ্টির ঝাঁপটায় বেশ খানিকটা ভিজে গেলুম।
মেনিদা বললেন, ধরো ধরো। দুটো হাতই জোড়া। ছাতা বন্ধ করতে পারছি না।
বাঁ হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার। আমার হাতে দিয়ে ছাতা বন্ধ করে ধেইধেই করে খানিক নেচে নিলেন।
কী করছেন?
সিঙ্গিং ইন দি রেন তো পারব না, তাই ড্যানসিং। সিনেমাটা দেখেছ? বাইরের রাস্তাটা নাচার মতোই।
এই বৃষ্টিতে বেরোলেন কেন?
বাঃ বেরোব না! দেখলুম ঘটোৎকচ কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হনহন করে চলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলুম, কী মশাই, চললেন? তা কোনও উত্তরই দিলেন না। গরম কচুরি হল। শুকনো আলুর দম। তোমার জন্যে নিয়ে এলুম। আর জানি তো, তুমি একলা আছ। পিন্টু, পিতা শব্দটা বড় বিশাল। সকলের ভেতরেই আছে। আমরা খাব, তুমি উপোস করে থাকবে? আমার মনে হয় এইতেই তোমার আজকের রাতটা চলে যাবে। চলো চলো, ওপরে চলো।
মেনিদা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বললেন, এই বাড়ি এত ফাঁকা ভাবাই যায় না। অতীতে কী সব দেখেছি আমরা! সংস্কৃতির পীঠস্থান। গানবাজনা, লেখাপড়া। একটা মানুষ যে একশোটা মানুষ হতে পারে, তোমার বাবাই ছিলেন তার প্রমাণ। কী হয়ে গেল। কী করে গেলেন! কত স্মৃতি ভেসে আসছে। মনে!
মেনিদা একটা চেয়ারে বিমর্ষ হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার শুরু করলেন, সব বিষয়ে এমন দখল আমি আর কারও দেখিনি। অমন স্মৃতিশক্তি! অমন মেধা! একজন অতিমানব। আমরা চিনতে পারিনি। কথায় আছে, পেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। নিজেরও কোনও প্রচার ছিল না। তোমার সন্ধ্যাহ্নিক হয়ে গেছে তো!
ওসব তো আমি করি না।
সে কী! ব্রাহ্মণের ছেলে। ত্রিসন্ধ্যা তো কর্তব্য। তিনবার না পারো, দু’বার তো করতেই হবে। অবশ্যই করবে। দেখবে মনের জোর বাড়ছে। ভয় কেটে যাচ্ছে। এটা ধর্ম নয়, ডিসিপ্লিন। সবসময় একটা কিছু জপ করবে মনে মনে। যেন মুখে একটা সুপুরি রেখেছ। একেই বলে অজপা। দেখবে অদ্ভুত একটা শক্তি পাবে। আমাদের অনেক কিছু সম্পদ আছে পিন্টু। চর্চার অভাবে মরচে ধরে। যাচ্ছে। একালের ছেলেদের কেউ বলেও না। যাও, তুমি হাত ধুয়ে খানকয়েক গরম গরম খেয়ে নাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে আর ভাল লাগবে না। আমার সামনে খেতে লজ্জা করবে তোমার। পাশের ঘরে চলে যাও।
মেনিদাকে যতই দেখছি, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। ভুল করেছিলুম, না মানুষটি রাতারাতি বদলে গেলেন? মেনিদা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। যেন বুঝতে পেরেছেন আমার মনের কথা। মেনিদা বললেন, টেক ইট ইজি, টেক ইট ইজি। সবসময় দুঃখু দুঃখু ভাব করে থেকো না। কৃত্রিম মনে হতে পারে। আমাকে হারমোনিয়মটা বের করে দাও, ততক্ষণ হরিশঙ্করকে গান শোনাই।
হারমোনিয়মটা বের করে দিলুম। মেনিদার গলা কী সুন্দর! মিছরির মতো। তিনি গান ধরলেন, ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়/চাহে ধন জন আয়ু আরোগ্য বিজয়/করুণার সিন্ধুকূলে/বসিয়া মনের ভুলে/এক বিন্দু বারি তুলে মুখে নাহি লয়। মাঝে মাঝে গান থামিয়ে প্রশ্ন করছেন, ঠিক হচ্ছে তো, হরিশঙ্কর!
পাশের ঘরে চোরের মতো একপাশে বসে কচুরি খাচ্ছি, আর মনে মনে হাসছি। ঠিক হয়েছে ব্যাটা! কেউ কোথাও নেই, একেবারে একা। Alone, alone, all all alone/Alone on a wide, wide sea/And never a Soul took pity on/My Soul in agony. 6tat 3631651 pretiot 07976157 বাঙালির মতো একপাশে বসে খাচ্ছি। তফাত এই, খাদ্যটা খিচুড়ি নয়, ঘিয়ে ভাজা হিংয়ের কচুরি। মেনিদা গাইছেন, তীরে করি ছুটাছুটি/ধূলি বাঁধে মুঠিমুঠি/পিয়াসে আকুল হিয়া আরো ক্লিষ্ট হয়/ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়।
অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। লাল মেঝের ওপর বসে হনুমানের মতো একের পর এক কচুরি খেয়ে চলেছি। কচুরি আলুরদম দুটোই সাংঘাতিক সুস্বাদু হয়েছে। এও মনে হয় ঈশ্বরেরই ইঙ্গিত। হিমালয়ে আশ্রমে চটিতে এইভাবেই তো আমাকে পঙ্গতে বসে খেতে হবে। আর তো কয়েক ঘণ্টা, তার পরেই তো আমি ট্রেনে। হিমালয়মুখো।
হারমোনিয়ম বন্ধ করে মেনিদা বললেন, তুমি কী ভাবছ আমি জানি। তোমাকে জামাই করার জন্যে আমি কচুরির টোপ ফেলছি। না, তা নয়। আজই জানতে পারলুম, অচলার বিয়ে হয়ে গেছে। একালের মেয়েরা নিজের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নেয়। তা হলে কচুরিটা টোপের কচুরি নয়। মুখে তুলতে গিয়ে তোমার মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে। করুণ অসহায় একটা মুখ। ছেলেটা কী খাবে! তারপরেই মনে হল, গলায় দড়ি। সারাটা রাত ভয়ে মরবে। বউকে বললুম, ভরো টিফিন কৌটো। ছেলেকে বললুম, ছাতাটা খুঁজে দে। চলে এলুম। রাতটা তোমার সঙ্গে কাটিয়ে ভোরে চলে যাব। কাল সারারাত তুমি জেগেছ। আজ তোমার ঘুম দরকার, সলিড ঘুম। বেশ বাদলার রাত আছে। আজ তুমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ো।
মেনিদার চোখেমুখে অদ্ভুত একটা স্নেহের ভাব। এমন স্নেহ বহুকাল আমি পাইনি। কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব ভেবে পাচ্ছি না। প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারলুম না, কোনটা আপনার আসল রূপ?
