সেইটাই পৃথিবীর নিয়ম। কেউ চিরকালের নয়। নিজের হাল নিজে ধরো। কারও ওপর নির্ভর কোরো না। আর তোমাকেও তো যেতে হবে। সন্ন্যাসী হবে বললে না?
আবার বাঁকা কথা। একটু খোঁচা। কথা না বাড়িয়ে আবার নতুন কোনও খোঁচার ভয়ে আমিও উঠে পড়লুম। এরই নাম বোধহয় সংসারের শকথেরাপি।
কাকাবাবু যাবার আগে ইট ছোঁড়ার মতো বলে গেলেন, বি এ ম্যান।
আমার বলতে ইচ্ছে করল, থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর অ্যাডভাইস।
দরজা বন্ধ করে অন্ধকার সিঁড়ির মুখে অনেকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইলুম। একেবারে চিন্তাশূন্য ফ্যালফ্যালে অবস্থা। মনে হচ্ছে, পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। সৃষ্টি লোপাট। একা আমি দাঁড়িয়ে আছি পৃথিবীর কিনারায়। শেষ জীবিত ব্যক্তি। মনে হচ্ছে, এই বাড়ির অসংখ্য ঘরের প্রতিটিতে একটা করে মমি শুয়ে বসে দাঁড়িয়ে আছে। নীচের কোণের ঘরে যেন তবলা বাজছে। প্রফুল্ল কাকাবাবু মৃত্যুর পর থেকে ফিরে এসে হাত সাধছেন। কাকিমা গা ধুয়ে কুয়োতলা থেকে আসছেন ভিজে শাড়ি পরে। মাতামহ দীর্ঘ শরীর নিয়ে তানপুরা হাতে দোতলা থেকে নেমে আসছেন। সম্রাটের মতো ভঙ্গিতে। বারান্দায় পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে কনক। শূন্য বাড়িতে জীবিত-মৃত সবাই ফিরে আসছে একে একে। মহা কোলাহল কলরোল। যেন এক উৎসব হচ্ছে। নিমন্ত্রিতরা আসছেন একে একে। দমাস করে একটা আওয়াজ হল কোথায়। চমকে উঠলুম। বোধহয় ছিটকিনি দেওয়া ছিল না। জানলার পাল্লা পড়ল। ফাঁকা বাড়িতে শব্দটা বড় ভয়ংকর।
বিশাল বড় একটা সিন্দুক খুলে যদি দেখা যায় ভেতরটা একদম ফাঁকা তা হলে মনের যে অবস্থা হয়, আমার মনের অবস্থাও ঠিক সেইরকম। শূন্যতাও হাসে। শূন্যতারও দাঁত আছে। ভাষাহীন ভাষা আছে, অবয়ব আছে। ফাঁপা একটা চেহারা। বিশাল এক ইদারার মতো। অতল।
লেজ-ভোলা একটা বেড়ালের মতো এঘর ওঘর সেঘর ঘুরে ঘুরে বেড়ালুম খানিক। সব ছেড়ে যেতে হবে আমাকে! বেঁচে থাকার একটা পর্ব এইখানে এইভাবেই শেষ হয়ে যাবে! অসমাপ্ত উপন্যাসের মতো। মানুষের মৃত্যু না হলেও আয়োজনের মৃত্যু।
অন্ধকার হল, কিন্তু আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করল না। পিতা হরিশঙ্করের খাটে বসে আছি। বালিশের পাশে পাটকরা একটা সাদা রুমাল। নিয়ে যাননি। পড়ে আছে। বসে বসে দেখছি, সব বাড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে। হরিশঙ্কর ইমনে একটি সুন্দর গান গাইতেন, নিশি এল দেখে চোখেরি পলকে শূন্য কে সাজাল দীপমালায়/ঘরে ঘরে আলো দেখে লাগে ভাল, আমার হৃদিগেহ অন্ধকারে কালো। তখন ছিল গান, এই মুহূর্তে আমার উপলব্ধি। চারপাশে কেমন সব সুখের সংসার, আমি বসে আছি শ্মশানে। হঠাৎ মনে হল, দিদি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছেন। মনে হওয়ামাত্রই, শরীরে একটা কাঁপুনি খেলে গেল। অদ্ভুত একটা ভয়। এক মুহূর্ত আর এবাড়িতে থাকা যায় না। ভয়ংকর। কিন্তু, যাই কোথায়? কাকে গিয়ে বলি, আজকের রাতটা আমাকে থাকতে দেবেন আপনারা দয়া করে? প্রথমেই মনে পড়ল টিপের কথা। পরমুহূর্তেই এমন ঘোটলোক মন, ভাবতে বসল মেনিদার মেয়ে অচলার কথা। অচলাকে আমি দেখেছি। না দেখে কোনও উপায় নেই, এমনই তার আকর্ষণ!
অশরীরী আত্মার ভয়ে আলো জ্বাললুম। অন্ধকার ঘরে আলোটা লাফিয়ে পড়ার মুহূর্তে মনে হল খাটে কেউ বসে ছিলেন। আলো পড়ামাত্রই অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ভয় যে কত শীতল সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলুম। মাইনাস দশ-কুড়ি ডিগ্রিও হতে পারে। শরীরে একটা কাঁপুনি ধরে গেল। ওজন মনে হচ্ছে আড়াই মন।
নীল একটা আলো ঝলসে উঠল। কী ব্যাপার? পৃথিবীটা কি বিজ্ঞানের বাইরে চলে গেল! মেঘ ডাকার শব্দে বিজ্ঞান ফিরে এল। বিদ্যুৎ চমকেছে। খেয়াল করিনি, পশ্চিমের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। মনে হয় ঝড় আসছে। আবার একবার মেঘ ডাকল। দমকা হাওয়ায় টেবিলের ওপর থেকে ফড়ফড় করে কিছু কাগজ উড়ে গেল। আর কোনও উপায় নেই। রাতটা এই কফিনেই আটকে গেলুম।
যাই হোক, তবু একটা কিছু এসেছে। ঝড় এসেছে বৃষ্টি নিয়ে। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করলুম। সগর্জনে বৃষ্টি এসে গেল কেটল ড্রাম বাজিয়ে। হিটলারের প্যানজার বাহিনী মার্চ করছে। ঈশ্বরের কী খেলা! এমন এক ব্যবস্থা করেছেন, যদি কারও আসার ইচ্ছাও থাকত সে আর আসতে পারবে না, যেমন টিপ, বউদি, কি অন্য কেউ। খেলা জমে গেল। এরই নাম বেঁধে মারা। যেমন বৃষ্টি, তেমনি বাতাস। জানলা দরজা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ঘনঘন বজ্রপাত। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছে। কেঁদে কেঁদে। যতটা চেষ্টা করছি মনটাকে ঘোরাতে, মন ততই চলে যাচ্ছে ঝুলন্ত একটা মৃতদেহের দিকে। দুলছে। ঘুরছে। বিদ্যুতের আলোয় নীল হয়ে উঠছে।
খাটের তলায় কিছু একটা পাশ ফিরছে। চোরটোর ঢুকে বসে আছে নাকি? শব্দ করে কী একটা গড়িয়ে গেল। আজ রাতে সব জড়বস্তুই কি প্রাণ পাবে? নৃত্য করতে থাকবে আমাকে ঘিরে? জড়জগতে একটা চক্রান্ত শুরু হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নিচু হয়ে দেখলুম, কী থাকতে পারে খাটের তলায়! সাদা কাপড়ের একটা ব্যাগ। তলা দিয়ে বাতাস এসে ব্যাগটাকে কাত করে দিয়েছে। খালি একটা কৌটো গড়িয়ে গেছে।
দিদির ব্যাগ। মনে পড়ল সঙ্গে একটা ব্যাগও এনেছিলেন। ব্যাগটাকে টেনে বের করে আনলুম। বাইরে থেকে স্পর্শ করে মনে হচ্ছে দু’-একটা বই আছে। একটা চশমার খাপ। ছোট ছোট কয়েকটা পুঁটলি। একটাতে কিছু পয়সা আছে বলে মনে হচ্ছে। টিনের কৌটোটা অনেক চেষ্টা করেও খুলতে পারলুম না। ভেতরে একটা কিছু আছে। ঠকাস ঠকাস করে নড়ছে। ব্যাগটির সমস্ত জিনিস উলটে দেখতে ইচ্ছে করছে। সংকোচও হচ্ছে। জানলা দিয়ে জল ঢুকে মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। এই বাড়ির এইটাই দোষ। জল আটকানো যায় না। পিতা হরিশঙ্করের বিজ্ঞানও হার মেনেছে।
