মুকুর কী হবে?
তুমি কি মুকুকে বিয়ে করে ফেলেছ?
তার মানে?
মানে, রেজিস্ট্রি।
আজ্ঞে না। মুকু আমার মতো মেয়েছেলেকে বিয়ে করবে না। মুকু হল শক্তি, মুকু ভৈরবী। মুকুকে খুঁজে দেবার দায়িত্ব আমি নিয়েছি।
আর হরিদাকে খোঁজার দায়িত্ব কার ওপর দিয়েছ?
স্তব্ধ হয়ে বসে রইলুম কিছুক্ষণ। সত্যিই তো। কী করেছি তার জন্যে! শুধুই জল্পনা।
কাকাবাবু বললেন, জেনে রাখো, ঠিক তিন দিনের মাথায় আবার একটা ঘোরতর সমস্যা আসছে।
২.২৭ The man that runs away
সিঁড়ির শেষ ধাপে একটা পোস্টকার্ড উলটে পড়ে ছিল। পিয়ন কখন দরজার ফাঁক দিয়ে খুস করে ঠেলে দিয়ে গেছে, কেউ খেয়াল করেনি। আমাদের নীচেটা অন্ধকার-অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে। সদর থেকে পেছন পর্যন্ত টানা একটা রক। সার সার তালা বন্ধ ঘর। ডাচ আমলের কুঠিবাড়ি এইরকমই ছিল। ঘরগুলোয় সেই দূর অতীতে মুহুরিরা বসতেন। একটা ঘরের জানলার গরাদ থেকে লম্বা। একটা চেন ঝুলছে। অতীতের স্মৃতি। এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের দুটি মজার শখ ছিল। এক, কুকুর পোষা, দুই, মানুষ পোষা। শেষ কুকুরটি ছিল বিশাল এক হাউন্ড। ধবধবে সাদা। নাম ছিল জিম। এই চেনটা দিয়ে জিমকে বাঁধা হত। চেনটাকে রোজ আমি পরিষ্কার করি আর একটি কুকুরের অস্তিত্ব অনুভব করি। আমার জ্যাঠামশাইয়ের মৃত্যুর পর কুকুরটি ইচ্ছামৃত্যু বরণ করে। মানুষ পারবে?
চেনটার পাশে বসে পড়লুম। পেছনে জানলা। সাবেক কালের চল্লিশ ইঞ্চি পুরু দেয়াল। ভেতরে কটা আনারকলি আছে কে জানে! পোস্টকার্ডে চোখ রাখলুম ভয়ে ভয়ে। কার চিঠি? পরিষ্কার হাতের লেখা। চিঠিটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলুম কিছুক্ষণ। আবার এক খেলা! দোতলায় এসে কাকাবাবুর সামনে চিঠিটা ফেলে দিলুম, এই নিন, পড়ুন। আর এক বিপদ আসছে। যা বলেছিলেন, সব অক্ষরে অক্ষরে মিলছে।
কাকাবাবু পড়ে বললেন, এইবার কী করবে?
দোতলার বারান্দার মেঝেতে বসে পড়লুম। বেলা ঝুলে পড়েছে। আকাশের নীল শীতল হয়েছে। ছোটপিসিমার চিঠি। পিসেমশাই বেশ কিছুদিন গত হয়েছেন। তিনটি ছেলেমেয়ে। জেলা-শহরে জীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। পুঁজি নিঃশেষ। মাঝে মাঝে অনাহার চলছে। হয় মৃত্যু, না হয় এইখানে আশ্রয়। ছেলেমেয়েরা নাবালক। আত্মীয়স্বজনদের অত্যাচার ও ভীতিপ্রদর্শন। কেটে ফেলব, মেরে ফেলব। কারণ সামান্য কিছু ভূসম্পত্তি আছে, তার ভাগ শ্বশুরবাড়ির মহামানবরা দিতে প্রস্তুত নয়। আমার চিন্তা দেখে কাকাবাবু বললেন, হরিদা থাকলে হাসিমুখে বুক ফুলিয়ে বলতেন, চলে এসো। আমার এক মুঠো জুটলে তোমাদেরও জুটবে। হরিদা তো গৃহী সন্ন্যাসী, অবধূত। সাগরের মতো মন। সেই পিতার পুত্র তুমি। বিশাল এক পরিবার প্রতিপালনের। জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারবে? ভেবে দেখো। তোমার যা রোজগার তা ভাগ করে নিতে হবে। দারিদ্র্য আসবে। অশান্তি আসবে। আয়েশ ঘুচে যাবে। রোজগার বাড়াতে হবে। তিনটি ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রাইভেট টিউশনি করে আয় বাড়াবার ফিকির করতে হবে। এই আদুরে সুখী জীবন আর থাকবে না তোমার। তোমাকে হরিদার মতো ফাঁইটার হতে হবে। পারবে তুমি? আমার সন্দেহ আছে যথেষ্ট। তোমার মেটাল আমি চিনি। তুমি কল্পলোকবিহারী। তোমার চরিত্রে আছে বিরোধ। ত্যাগের কথা ভাবো, কাজে তুমি ভোগী। দ্বিতীয় পথই তোমার পথ। পত্রপাঠ জানাও, আসবেন না। এ বাড়িতে কেউ থাকছে না। তালা ঝোলাও, সরে পড়ো। অথবা লেখো, যেখানে আছেন সেইখানেই থাকুন, আমি মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাব।
টাকা কী করে পাঠাব কাকাবাবু? আমি তো আশ্রমে যেতে চাই!
তা হলে তো হয়েই গেল। সেইটাই লিখে দাও। কে বাঁচল, কে মরল তোমার দেখার দরকার নেই। সংসার হল মায়া। তাই তো? সন্ন্যাস মানেই তো বেদান্ত। ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ, নায়ং ভূত্বাইভবিতা বা ন ভূয়ঃ। আত্মা। জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই। চুকে গেল লেঠা। লোকে বলবে, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, নীচতা, পলায়নী মনোবৃত্তি। ওসবে তুমি কান দিয়ো না। দিনকতক অ্যাডভেঞ্চার করে এসো। তারপর গেরুয়া ফেলে গৃহী। কী বলো? ভাবো। ভেবে দেখো।
এটা কোনও পরামর্শ হল? এ তো ব্যঙ্গ! প্রতিটি কথা যেন দু’মুখো ছুরি! এদিকেও কাটে, ওদিকেও কাটে। ভদ্রলোকটিকে বোঝা দায়। ক্ষণে ক্ষণে রূপ পালটান। এই বন্ধু, তো পরমুহূর্তেই শত্রু। কাগজপত্র গুছিয়ে কাকাবাবু উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীরমুখে বললেন, আমাকে এইবার যেতে হচ্ছে। আমার নিজস্ব কিছু কাজ আছে। সামান্য ক’টা টাকার পেনশনে তো দিন চলবে না। যত দিন বাঁচব তত দিন আমাকে খাটতে হবে। কে খাওয়াবে! কেউ তো নেই আমার!
কেন, আমি?
কাকাবাবু নাটকীয় ভঙ্গিতে তাকালেন আমার দিকে, দেখো পিন্টু, যে কথা বিশ্বাস করো না, সেকথা বোলো না। কোনটা কথা আর কোনটা কথার কথা বুঝতে শেখো। এ যুগে আপনই পর হয়ে যাচ্ছে, পর হবে আপন? ডোন্ট বি সিলি।
গোলার আঘাতে দুর্গ ভেঙে পড়ার মতো আমিও ভেঙে পড়লুম। কথার কথাই বলেছি। ফাঁকা কথা। ধরা পড়ে গেছি। ঠোঁট কাটা মানুষ। অভিনয় করতে জানেন না বলেই এমন তীব্র ধাক্কা মারতে পারলেন। অন্য কেউ হলে গলে গিয়ে বলতেন, ওরে আমার সোনা রে!
নিজেকে সামলে নিয়ে বললুম, আমাকে ফেলে চলে যাবেন?
