সুধন্যবাবু মেসোমশাইকে ধরে টাল সামলাতে সাহায্য করলেন। ভদ্রলোক বললেন, জামাইবাবু, আপনি পুরো ব্যাপারটাকে এমন ঘুরপাক খাইয়ে দিচ্ছেন কেন? তিলকে তাল করছেন!
জামাইবাবু! তার মানে শ্যালক। কোন শ্যালক? দ্বিতীয়পক্ষের ভাই?
কাকাবাবু বললেন, আগেও দেখেছি, সমস্ত ব্যাপারটাকে উনি সবসময় একটা সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে চান। গ্রহ-বৈগুণ্য। মঙ্গলটা বেয়াড়া জায়গায় বসে আছে। মানুষের সব কথা বলতে আছে মৃত্যুর কথা বলতে নেই, কিন্তু আজ আমি সেই নীতিবিরুদ্ধ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি, এই তেঁটিয়া ভদ্রলোকের অপঘাতে মৃত্যু হবে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
সুধন্যবাবু বললেন, আপনি অ্যাস্ট্রোলজার?
ফুটপাথের নই। এই নিয়ে আমি রীতিমতো রিসার্চ করছি। আমার অবিশ্বাসকে আমি বিশ্বাসে নিয়ে আসছি। জীবনের কতভাগ ভাগ্যের দখলে আর কতভাগ পুরুষকারের দখলে, এই রেশিয়োটা আমি বার করতে চাই। রহস্যটা প্রায় ধরে ফেলেছি। মৃত্যু, অসুখ, এইটাই আমার রিসার্চের বিশেষ দিক।
মেসোমশাই চোখদুটো বড়বড় করে বললেন, আপনারা কি বলতে চাইছেন, আমার মেয়ে, আমার কোনও দুর্ভাবনা থাকবে না? এত বড় একটা শহর, মেয়েটা কোথায় গেল আমি জানতে চাইব না! আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই, আমাকে অভিশাপ দিচ্ছেন অপঘাতে মৃত্যু হবে। হয় হবে, সব মানুষকেই একদিন-না-একদিন মরতে হবে। আপনিও মরবেন আমিও মরব। আপনার মেয়ে থাকলে বুঝতেন মেয়ের বাপের কী দুশ্চিন্তা! এতটুকু একটা ছেলে আপনার সামনে আমাকে দুশ্চরিত্র বললে। আপনি শুনলেন, কিছু বললেন না!
ইকোয়াল জাস্টিস। আপনি প্রথমেই তাল ঠুকে বললেন, ফুসলে এনেছে, তারপরে বললেন ফ্লেশ-মার্কেটে বেচে দিয়েছে। কোনও ভদ্রলোক এমন কথা বলে?
তার মানে আমি ছোটলোক?
আপনি মেয়ে চান, না ঝগড়া চান?
হঠাৎ পিতা হরিশঙ্কর আমাকে ভর করলেন। কানের কাছে স্পষ্ট তার কণ্ঠস্বর, ফিনিশ ইট, ফিনিশ ইট। ডোন্ট ওয়েস্ট ইয়োর টাইম, সান। ট্যাকল ইট।
আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত জোড় করে বললুম, আমাকে ক্ষমা করবেন। মুকুকে আমি খুঁজে বের করে দোব। নিশ্চয় কোনও বন্ধুর বাড়িতে আছে। কাল ক্লাসে গিয়ে ধরব। আপনার ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যান।
মিষ্টি কথায় কাজ হল। ভদ্রলোক কাঁপা কাঁপা হাতে ঠিকানা লিখলেন। মদ স্নায়ুকে ধরেছে। মদ এইবার মানুষটিকে খেতে শুরু করেছে। কাগজটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। ঢেলা ঢেলা। চোখদুটো জলে ভরে এসেছে। আবেগরুদ্ধ গলায় বললেন, দেখো বাবা, সিনসিয়ারলি একটু দেখো। সকলের ঘৃণা নিয়ে বেঁচে আছি। টাকাপয়সায় কী হয়! কেউ কেউ দু’বার বিয়ে করতে বাধ্য হয়, তাতে চরিত্র কেন খারাপ হবে? মায়ের আসনে আর-একটা মাকে বসাতে পারলে না ওরা, সে দোষ আমার! কীভাবে যে মেন্টাল টর্চার করছে আমাকে। আর তো সহ্য হচ্ছে না। আমার তো আর কোনও ছেলেমেয়ে হয়নি। কে দেখত আমাকে? তোমরা দেখতে! সন্ধের অন্ধকারে পাহাড়ি ভাল্লুকের মতো দু’হাত বাড়িয়ে বার্ধক্য এগিয়ে আসছে। মি লর্ড, আই অ্যাম কাস্টিগেটেড। আই অ্যাম ওলড়, এ হ্যাঁগার্ড হায়না, হাউলিং ইন দি ডাস্ক অফ মাই লাইফ। নো হোয়ার, নো রেসপাইট। মি লর্ড আপ ইন ইয়োর ডোম, ইউ আর এ সাইলেন্ট অবজার্ভার। ইউথ ইজ এ ব্লান্ডার। ম্যানহুড এ স্ট্রাগল। ওলড় এজ এ রিগ্রেট। আর আমি আসতে চাই না ইন ইয়োর কিংডম। মি লর্ড হ্যাং মি বাই দি নেক। আমি শুনেছি তার বাঁশি। বাঁশি বাজে দূর বনে। ভুল, ভুল। লাইফ ইজ অ্যান ইনকিয়োরেবল ডিজিজ। উই অল লেবার অ্যাগেনস্ট আওয়ার ওন কিয়োর, ফর ডেথ ইজ দি কিয়োর অফ অল ডিজিজেস।
নেশা চড়ছে। এজলাসে যেন সওয়াল করছেন এক প্রবীণ আইন ব্যবসায়ী।
আবেগের জগৎ থেকে কঠোর রুদ্র বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে আমার প্রস্তাব, চা খাবেন? পিতা হরিশঙ্করের এই সময়টাই ছিল টি-টাইম। নিজের তৈরি ধবধবে সাদা একটি লুঙ্গি পরে, গায়ে অনুরূপ সাদা গেঞ্জি, পায়ে ভবীচরণ দাসের দোকানের চপ্পল, ফটফট আওয়াজ তুলে এই বারান্দায় পায়চারি করতেন আর মাঝে মাঝে ফিনফিনে পাতলা চায়ের কাপে চুমুক দিতেন। পেছন পেছন ফিরত দার্জিলিং চায়ের বিশিষ্ট গন্ধ। দেখে মনে হত দক্ষিণ ভারতীয় মহাসাধক রমণমহর্ষি পায়চারি করছেন। সৎজীবনের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব মিলিয়ে পঞ্চাশটি মৃত্যুর চিতা জ্বলছে বুকে। বৃহৎ একটা আমগাছের মতো ছিল এই যৌথ পরিবার। ডালে ডালে প্রিয়। আম ঝুলছে। দক্ষিণের বাতায়ন খুলে এমন একটা ঝড় এল, সব আম ঝরে পড়ে গেল। একটি ডালে দুটি মাত্র আম। পিতা আর পুত্র। কে যায় কে থাকে! ভবে কে বলে কদর্য শ্মশান। পরম পবিত্র মহাযোগের স্থান। হেথা এলে পরে যায় মায়া সব।
চা খেয়ে ভেঙেপড়া কপিধ্বজের মতো মেসোমশাই চলে গেলেন শ্যালক সুধন্যর হাত ধরে। কাঠের কারবারি। আসামের বড় টিম্বারমার্চেন্ট। চলে যেতেই কাকাবাবু বসলেন আমাকে নিয়ে। বললেন, কেমন হল? তোমাকে আমি ওই কারণেই সাবধান করি। একেবারে অরক্ষিত। মেয়েদের থেকে শতহস্ত দূরে থাকাই উচিত। এই সেই বয়েস, ফিউম আর পারফিউম দুটোই তোমাকে আকর্ষণ করবে। একটা আদর্শ ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে বয়েসটা পার করে দাও। সামনে হ্যাপি-ভ্যালি। হরিদার জীবন থেকে কি কোনও শিক্ষাই নিতে পারলে না? কামজয়ী মহামানব। যে বয়সে তোমার মা মারা গেলেন, সেই বয়েসটা একবার ভাবোবা! আর দেখলে তো দ্বিতীয় পক্ষের অবস্থা! আর কোনও কথা নয়, এইবার কিছুদিনের জন্যে পালাও। অ্যাস্ট্রোলজিক্যালি এই সময়টা তোমার মোটেই ভাল নয়। ছ’টা বছর কোনওরকমে পার করে দাও। এইটাই হল যৌবনের টিথিং টাইম।
