যিনি মহারাজা, বিশ্ব যাঁর প্রজা, জানো না রে মন আমি পুত্র তাঁর।
সন্ধ্যার ছায়ান্ধকারে, সেই অরণ্যপ্রান্তরে পর্বতরাজি ক্রমশ আকাশের গায়ে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেত। পিতা হরিশঙ্করের বর্ণনা তবু থামত না। শিখরে বাতাস কেমন মসলিনের মতো, সুরার মতো, কেমন তার ফিনফিনে শব্দ, কতটা শীতল। ঊর্ধ্ব থেকে অধের দৃশ্য কেমন খেলাঘরের মতো। কত বর্ণের রেখা টানা মসৃণ পাথর। ফাটলে ফাটলে তুলোঘাস। যেন কোনও ঋষির শ্বেতশ্মশ্রুমণ্ডিত বিশাল এক সমাহিত মুখ আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে। আবার নাকি একটা কালো কুচকুচে সাপও দেখেছেন। সিল্কের কর্ডের মতো মসৃণ আর সরু। এত সব দেখার বৃত্তান্ত দিতে দিতেই নেমে আসত ঘোর অন্ধকার। দূর দূর দেহাতি গ্রামে বলের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে উঠত লণ্ঠনের আলো। চুলার ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে উঠত অশরীরী প্রেতের মতো। বনভূমির মাথার ওপর ভেসে উঠত হালকা কুয়াশার রেখা। নাকে এসে লাগত বোটকা একটা গন্ধ। পিতা হরিশঙ্কর হঠাৎ অতিশয় সচকিত হতেন। বলতেন, চলো চলো, মনে হয় বাঘ বেরিয়েছে কাছাকাছি কোথাও। তাড়াতাড়ি পা চলবে। কী করে! তারার আলো ছাড়া তো আর কোনও আলো নেই। গাছগাছালির গন্ধ। ঝিল্লির রব। ভাসমান জোনাকির আলো। তিনি শক্ত করে আমার হাত ধরে বলতেন, কী ভয় করছে বুঝি! ভয় কীসের? আমি তো আছি। সেই হাত, সেই ধরার হাত খুলে গেছে, কিন্তু আমার সামনে উদার বুক মেলে দাঁড়িয়ে আছেন সেই একই ঘরানার আর এক মানুষ।
চটকা ভেঙে গেল। অতীত থেকে ফিরে এলুম বর্তমানে। কাকাবাবু বলছেন, আপনার কথা শুনে আমার একটা গল্প মনে পড়ছে। গল্পের নায়ক ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ। তার জীবনের ঘটনা। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে এক ব্রাহ্মণ আসা-যাওয়া করত। বাইরে বেশ বিনয়ী ছিল। কিছুদিন পরে ঠাকুর কোন্নগরে গেছেন। সঙ্গে রয়েছেন ভাগনে হৃদয়। নৌকো থেকে নামছেন, দেখলেন গঙ্গার ঘাটে সেই ব্রাহ্মণ বসে আছেন। বোধহয় হাওয়া খাচ্ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে ব্রাহ্মণ বলছেন, কী ঠাকুর। বলি, আছ কেমন? তার কথার স্বর বলার ধরন দেখে ঠাকুর বললেন, ওরে হৃদে! এ লোকটার টাকা হয়েছে, তাই এইরকম কথা। তা মশাই, আপনার ধরন-ধারণ দেখে আমারও তাই মনে হচ্ছে, আপনার টাকা হয়েছে। অবেলায় মদ চড়িয়েছেন। সেই অবস্থায় এসেছেন মেয়ের খোঁজ নিতে!
ভদ্রলোক প্রথমটায় একটু ঘাবড়ে গেলেন। পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে বললেন, আমাদের সোসাইটিতে এটা কোনও ব্যাপার নয়। একে আমরা বলি, হেলথ ড্রিঙ্ক। আমি জানতে চাই আমার মেয়ে মুকু কোথায়?
কাকাবাবু ঠিক অনুরূপ ভঙ্গিতে বললেন, আমি জানাতে চাই মুকু এখানে নেই। ছিল, কিন্তু চলে গেছে।
হোয়াট ডু ইউ মিন! সে হস্টেলে নেই, সে এখানে নেই, তা হলে গেল কোথায়? কে তাকে হস্টেল থেকে ফুসলে এখানে এনেছিল! ফোঁসলানো একটা পেনাল অফেন্স। ভারতীয় দণ্ডবিধির কোন ধারায় পড়ে আপনি জানেন?
ঘোড়ার ডিম ধারায়। মেয়ে নিজের ইচ্ছেয় এসেছিল, নিজের ইচ্ছেয় চলে গেছে। ধারাপাত আপনি পড়ুন। আমাদের আর পড়ার বয়েস নেই।
জেনে রাখুন, আপনাদেরও পড়তে হবে। আমি লোকাল থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করে আসি। তখন পড়বেন। কত ধানে কত চাল তখন বুঝবেন!
আপনার মেয়ের বয়েস কত?
অ, আপনি ওই রাস্তায় যেতে চান? অ্যাডাল্ট! মাইনর নয়! তাকে যে ফ্লেশ মার্কেটে পাচার করা হয়নি কে বলতে পারে? আপনার যেরকম যমদূতের মতো চেহারা! খুন করলেও অবাক হবার কিছু নেই।
আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন থানাতে যান। সেইখানেই আবার দেখা হবে। কথা হবে। এমনি তো হবে না। সাক্ষীসাবুদ চাই। কী বলেন?
আমার ভেতরে আবার একটা ভয় গুড়গুড় করে উঠল। মনে পড়ে গেল, ছেলেবেলায় আমাদের ক্লাবের ক্যাপ্টেন দীনবন্ধুদাকে পুলিশ কীরকম নারীঘটিত ব্যাপারে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্য দিবালোকে নিয়ে গিয়েছিল। আমারও সেই একই অবস্থা হবে?
ভয়ে ভয়ে বললুম, আপনি এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? আপনি তো আমাদের আত্মীয়!
সো হোয়াট! আমার সঙ্গে তোমার যা সম্পর্ক, তাতে আমার মেয়েকে বিয়ে করা যায়।
বিয়ের কথা আসছে কেন?
অ, তুমি বিয়ের নামে ফুর্তি করবে? আই বিয়িং এ ফাদার সেটা রেলিশ করব!
হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আপনি কী করছেন?
ভদ্রলোক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। একেবারে ফিউজ। সঙ্গে সঙ্গে আমি আর এক ডোজ দিয়ে দিলুম, মুকু আপনাকে বাবা বলতে ঘৃণা করে। বড় মেয়েকে তো বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। সে তো পালাল। আজ হঠাৎ বোতল টেনে এখানে এসে বাবাগিরি ফলাচ্ছেন! মুকুকে সময়মতো টাকা পাঠান? চিঠি লেখেন? আপনি তো চরিত্রহীন। আমার কাকিমায়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন। হাত
বলে থাবা বলাই ভাল।
কাকাবাবু এইবার একটা পাঞ্চ ঝাড়লেন, বাপ হয়ে কী করে বলতে পারলেন, মেয়েকে বেশ্যালয়ে বিক্রি করা হয়েছে? রাবিশ। ভালগার। জেনে রাখুন, এই পিন্টুর আর মুকুর বিয়ে হবে। হরিদা ফিরে এলেই হবে। কারও বাবার ক্ষমতা নেই আটকায়!
মেসোমশাই একটু টাল খেলেন। চোখদুটো কাতলা মাছের মত ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমন একজন মানুষকে শ্বশুরমশাই বলে মেনে নিতে হবে ভাবলেই মন বিদ্রোহ করে! এমন একজন মানুষের অমন সুন্দর দুটি মেয়ে হল কী করে! মাসিমার রূপে। আমার জ্যাঠাইমার রূপ তো আমি দেখেছি। দুই ব্রাহ্মিকা। কোথায় লাগে একালের আধুনিকা!
