আজ যেন সেই অতীত সাঁতার কেটে বর্তমানের পইঠায় উঠে পড়েছে। শুধু কাকাবাবুকে পিতা ভেবে নিলেই হল। ভদ্রলোক এই মুহূর্তে কঠিন এক অঙ্ক নিয়ে পড়েছেন। হরিশঙ্করের জন্মসময় আর সাল-তারিখ নিয়ে হিসেব চলেছে। কোথায়, কোন দিকে যেতে পারেন? সবার আগে দেখা দরকার। বেঁচে আছেন কি না! ছক পড়ে গেছে। গ্রহনক্ষত্রের ডিগ্রি বেরিয়ে গেছে। দশা-অন্তর্দশার হিসেব চলছে।
দূর থেকে মানুষটির তন্ময়তা দেখছি। কেটলিতে চায়ের জল ফোঁটার সিসি শব্দ। একটু আগে কাজের মহিলা এসে জবাব দিয়ে গেছে। কাজ করতে পারবে না। আসলে ভূতের ভয়। গলায় দড়ি। সাংঘাতিক এক ব্যাপার। না আসে, না আসবে! সিদ্ধান্ত হয়েই গেছে, বাড়িতে কিছুদিন তালা পড়বে। সংসার গুটিয়ে রাখা হবে গালচের মতো। আমরা একটা পরিক্রমায় বেরোব। হরিশঙ্করকে যেভাবেই হোক উদ্ধার করে আনতে হবে। কাকাবাবু মুখ তুলে তাকালেন, শোনো, কী করছ ওখানে একা একা! ও, চা বসিয়েছ? গুড বয়। আচ্ছা হরিদার কি হারপিস হয়েছিল? হারপিস জোস্টার? এনি ফর্ম অফ ভাইরাল ইনফেকশন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, হারপিস জোস্টার।
বাঃ বাঃ, কী আনন্দ! কাকাবাবু উল্লাসে আটখানা, সে ফাইভ ইয়ারস ব্যাক?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ওইরকমই হবে।
মিলছে মিলছে। আচ্ছা, এনি অ্যাকসিডেন্ট? অ্যা
সিডে পুড়ে গিয়েছিলেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, দ্যাট আই ক্যান রিমেম্বার। তা হলে তো লং লাইফ! তিনি আছেন। বেঁচে আছেন। আচ্ছা দেখি সন্ন্যাসযোগ আছে কি না! নাউ হি ইজ পাসিং থ্রু স্যাটার্ন।
কাকাবাবু আবার ঝুঁকে পড়লেন। বাইরে একটা গাড়ি থামার শব্দ হল।
২.২৬ অন্তরে লভেছি সত্য, ভ্রমণের ফলে
গাড়ি থামার শব্দে চমকে গেছি। এখন গাড়ি মানে পুলিশের গাড়ি। দুটো দুর্বল জায়গায় এখনও আঘাত আসার সম্ভাবনা আছে। দিদি কীসের ওপর দাঁড়িয়েছিলেন? ঘরে উঁচু কোনও জিনিস পাওয়া যায়নি। এইটা একটা লুজ-এন্ড। দ্বিতীয় দুর্বল জায়গা হল, ওই হার। যার কাছে অমন মূল্যবান একটা হার, তিনি কেন ভিক্ষা করতে বেরোবেন! হারটা বিক্রি করলেই তো রাজার হালে থাকা যেত! সদরের কড়া নড়ল। ভয়ে ভয়ে কাকাবাবুর দিকে তাকালুম। তিনি বললেন, দেখো, কে এলেন!
যদি পুলিশ আসে?
আসে আসবে। অত ভয়ের কী আছে!
এই ভয়ই তো আমাকে মেরেছে। সব ব্যাপারেই ভয়। আমার পিতাকে ভয় করতে করতে ভয়টা জীবনের সর্বস্তরে ছড়িয়ে গেছে। সদর দরজা খুলেই চমকে উঠলুম। ইনি কোথা থেকে এসে হাজির হলেন! আরও মোটা হয়েছেন। দুটো চোখের তলায় অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত স্ফীত ভাব। খ্যাসখেসে গায়ের রং। এই সেই মেসোমশাই। সঙ্গে আর একজন ভদ্রলোক। দেখলেই মনে হয় অতিশয় চালিয়াত।
দরজার ভেতরে একটা পা, দরজার বাইরে একটা পা। মেসোমশাই থমকে আছেন, সেই ত্রিশঙ্কু অবস্থাতেই প্রশ্ন, মুকু কোথায়?
যেন আমি মুকুকে কিডন্যাপ করে এনেছি।
মুকু মুকুর হস্টেলে।
ধমকের সুরে মেসোমশাই বললেন, না, সেখানে নেই। এই বাড়িতেই আছে। হস্টেল ছেড়ে দিয়েছে।
আবার হস্টেলেই ফিরে গেছে।
না যায়নি। আমি জানতে চাই, কেন সে এখানে? হোয়্যার ইজ হরিশঙ্করবাবু?
তিনি নেই। বেশ কিছুদিন হল কলকাতার বাইরে।
অ্যাঁ, তার মানে তোমরা দু’জনে এই বাড়িতে সংসার পেতে ফেলেছ? টেরিবল!
আপনি ভেতরে আসুন না মেসোমশাই!
এখনও মেসোমশাই আছি না বাবা হয়ে গেছি? টেরিবল, টেরিবল। সুধন্য, হোয়াট ইউ সে! সঙ্গের সাথীটির নাম সুধন্য। কে জানে কে, কী সম্পর্ক!
গম্ভীর গলায় বললুম, মেসোমশাই, ওপরে চলুন।
সে তো যাবই। কিন্তু আমার দুটো মেয়েই কী বোকা, পারফেক্ট ফুল। আমার মেয়ে বলে মনেই হয় না। রোমান্টিক ফুল। ইডিয়টস, ইডিয়টস।
সিঁড়ি দিয়ে প্রথমে উঠছেন মেসোমশাই, পেছনে সুধন্য কাপ্তেন, তার পেছনে আমি। মিষ্টি একটা মদের গন্ধ নাকে আসছে। অবেলাতেই এক রাউন্ড চড়ে গেছে। সুধন্যবাবু এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বললেন, বনেদি বাড়ি, কিন্তু শ্রীহীন। মেন্টিনেন্স ভাল নয়। তেমন নজর নেই। খিলানের কাজ দেখেছেন? এসব কাজের মিস্ত্রি আর নেই।
মেসোমশাই বললেন, এসব কাজের আর দরকারও নেই। মার্টিন বার্নকে দিয়ে তোমাদের লেটেস্ট যে বাড়িটা করিয়েছ, সেটা এর চেয়ে ফাংশানাল। মডার্ন ইজ মডার্ন।
তা হলেও এসব বাড়ির ইজ্জত আলাদা।
তর্ক কোরো না সুধন্য। তর্ক কোরো না।
দু’জনেই ঘোঁত করে থেমে গেলেন। সামনেই পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কাকাবাবু। মেসোমশাই থতমত খেয়ে বললেন, ইনি কে?
কাকাবাবু বললেন, চিনতে পারছেন না! এরই মধ্যে ভুলে গেলেন!
চেনাচেনা মনে হচ্ছে।
কাকাবাবুর ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। বিশাল বুক। ভাল্লুকের মতো লোম। একসময় গোবরবাবুর আখড়ায় কুস্তি করতেন। গোপালবাবুর বন্ধু। রায়াটের সময় দু’জনে কলকাতা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। চেহারা দেখে যে-কোনও মানুষই থতমত খাবেন। সে একটা যুগ চলে গেছে এ দেশবাসীর জীবনের ওপর দিয়ে। আমার পিতৃদেব ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নিত্য ব্যায়াম করতেন। মাতামহ ছিলেন মল্লবীর। পিতামহ যোগী। আমি নেংটি ইংদুর। পরের প্রজন্মের আমরা একেবারে ওয়ার্থলেস। আমার মাতুল ফিনফিনে পলতোলা গেলাস। আমাদের কোনও আয়তনই নেই। ডিসপেপটিক ইন্টেলেকচুয়াল। মেয়েছেলেরই পুং সংস্করণ। একালের নানা সাজসজ্জা দিয়ে রক-ক্লাইম্বিং শুরুর ঢের আগেই পিতা হরিশঙ্কর ক্লাইম্বিং শুরু করেন। মালকোঁচা মারা ধুতি। গায়ে টুইলের শার্ট। পায়ে কেডস। ডালপালা, গাছের শেকড়, পাথরের খাঁজ ধরে ধরে খাড়া পাহাড়ে উঠছেন। আমি নীচে দাঁড়িয়ে দেখছি। ভয়ে দমবন্ধ। কেউ কোথাও নেই। বাতাসের শনশন শব্দ। মজা নদীর বুকে বালি আর নুড়ি পাথর। গোরুর কঙ্কাল। হয়তো বাঘেই মেরেছিল। নীরব প্রার্থনা, হে ভগবান! ফেলে দিয়ো না। একসময় হারিয়ে গেলেন। আর দেখাই যাচ্ছে না। সময় যাচ্ছে। এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা। কিশোর কাঁদছে ভয়ে। একসময় পাহাড়চূড়ায় মানুষটিকে দেখা গেল। বিন্দু মতো। একটা সাদা। রুমাল নাড়ছেন। পিন্টু! এই ডাক ধ্বনি, প্রতিধ্বনি হয়ে সেই নিরালায় ভেসে বেড়াল। সূর্য অস্তে চলেছেন। নামছেন না কেন! এখুনি তো অন্ধকার হবে। আমি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছি, বাবা, নেমে আসুন। বাবা ডাকটাই, বা বা শব্দে সন্ধ্যার ঘরেফেরা পাখির মতো ঝটপট ঝটপট করে উড়তে লাগল। ছরছর শব্দে নেমে এল একটা পাথর। হঠাৎ একসময় তিনি আমার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। কোন দিক থেকে কীভাবে নেমে এলেন কে জানে! হাতের পায়ের দু’-একটা জায়গা ছিঁড়ে, ঘেঁচে গেছে। সে ব্যাপারে কোনও মাথাব্যথাই নেই। মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত। রাজমহল পর্বতমালার অজানা এক শৃঙ্গে আরোহণের অপরিসীম আনন্দ। কোনও সংবাদ হবে না। গলায় মালা পরাবার জন্যে কেউ ছুটে আসবে না। কিশোর পুত্রকে সাক্ষী রেখে দুঃসাহসী পিতার ভয়ংকর অভিযান। মাতামহ যে-গানটি গাইতে গাইতে আত্মহারা হয়ে যেতেন, সেই গানের একটি কলি গেয়ে উঠলেন, পর্বত-সুমেরু ওহে হিমাচল গ্রীবা উন্নত করি কী দেখিছ বলো, দেখিছ কি সেই গুণাকর রূপ। কেউ কোথাও নেই। শুকনো নদী, উপত্যকার জঙ্গল, গোরুর আস্ত কঙ্কাল, পোড়া ইটের মতো লাল আকাশ। চারপাশে পাহাড়ের দেয়াল। তার সেই অক্ষত নেমে আসার আনন্দে একটি কিশোরের ক্রন্দন আরও প্রবল হত। বুঝে ফেলত, পৃথিবীতে পিতা ছাড়া কেউ নেই। তিনি এসে হাত না ধরলে সব মানুষই বড় অসহায়। মানবপিতাকে উপলক্ষ করে জগৎপিতার ধারণা মন স্পর্শ করে যেত। মাতামহের উদাত্ত সংগীত আরও অর্থবহ হত:
