বউদি বললেন, কী হল?
কিছু হতে হয় না। উনি দুর্বাসার বংশধর।
তোমার জীবনে দেখছি অশান্তির পর অশান্তি।
ঈশ্বরের পরীক্ষা।
তা যা বলেছ।
কাকাবাবু তার ঝোলা ব্যাগ নিয়ে আমাদের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলেন বীরের মতো। আমরা কেউ বাধা দিলুম না। টিপ আর বউদি দু’জনেই হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। শুনেছি ভদ্রলোক এইভাবেই একদিন সামান্য কারণে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছিলেন। আমার পিতার সামনে বিশেষ ট্যাঁ ফোঁ করতে পারতেন না। তার ব্যক্তিত্বের সামনে কেঁচো হয়ে থাকতেন। পৃথিবীতে এই ধরনের মানুষের জন্যে প্রয়োজন ভাল রকমের চাবকানির।
কিন্তু হঠাৎ আমার কী হল ভেতরে? রাগ আর ঘৃণার বদলে একটা ভালবাসার ভাব এল। প্রচণ্ড একটা দুঃখের বোধ। আহা! মানুষটার কেউ নেই। এত বড় পৃথিবীতে একেবারে একা। চাকরি অবসর দিয়েছে। যৎসামান্য পেনশন। একেবারেই অনিকেত। কলকাতার এক পরিবারে একটু আশ্রয় পেয়েছেন। এই মেজাজ নিয়ে কতদিনই বা সেখানে থাকতে পারবেন। এই বৃদ্ধ বয়েস। বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরছেন।
তিরবেগে দৌড়োলুম। যেমন একদিন দৌড়েছিলুম আমার পিতার পেছন পেছন। সে ছিল অদ্ভুত এক ঘটনা। নতুন এক কথা শেখার বিড়ম্বনা। সেইদিনই স্কুলে বাংলার শিক্ষকমহাশয় নতুন এক শব্দ শিখিয়েছিলেন, পরাকাষ্ঠা। বেশ নতুন ধরনের কথা। নিজেকে খুব ঐশ্বর্যশালী মনে হচ্ছিল। সেইদিনই সন্ধেবেলা বাড়িতে পুরোহিতমশাই এলেন, পিতা বললেন, প্রণাম করো। সঙ্গে সঙ্গে পরাকাষ্ঠা শব্দটি লাগাবার সুযোগ পেয়ে গেলুম। প্রণাম করতে করতে বললুম, প্রণামটাই ভক্তির পরাকাষ্ঠা নয়। পিতা গুম মেরে গেলেন। পুরোহিতমশাই চলে গেলেন। হঠাৎ বামুনদি এসে বললেন, তুমি কী বলেছ, ছোটবাবু বেগে বেরিয়ে গেলেন! নির্বোধ কিশোরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। পনপন করে। ছুটলুম বাজারের দিকে। রাতের অন্ধকার রাস্তা, গুচ্ছের সাইকেল, রিকশা। দৃকপাত নেই। তিনি ফিরে এলেন, কিন্তু পুরো একটা মাস বাক্যালাপ বন্ধ রইল। কাকাবাবুকে ধরার জন্যে ছুটছি, আর সেই অতীত ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই একই হাঁকপাক ভাব। বেশ কিছুটা যাবার পর কাকাবাবুকে দেখতে পেলুম। খাড়া হেঁটে চলেছেন। একমাথা এলোমেলো পাকা চুল। বাঁ দিকে দুলছে সাইড ব্যাগ। রাস্তার দু’পাশের লোক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার ছোটার দিকে।
মোটরবাইক আরোহী সার্জেন্ট যেভাবে আইনভঙ্গকারী গাড়ির পথ অবরোধ করেন, আমিও সেইভাবে কাকাবাবুর সামনে গিয়ে পড়লুম। হাপরের মতো হাঁপাচ্ছি। কথা বলতে পারছি না। তার। হাতদুটো ধরে আবেগে কেঁদে ফেললুম। কোনওরকমে বললুম, ক্ষমা করুন। ফিরে চলুন আপনি। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
রাস্তার একপাশে সরে এলুম আমরা। কাকাবাবু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি ফুলছি ক্রমশই। কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, কে কাকে ক্ষমা করে! আমিও তো এক পাঠা। চলো চলো, বাড়ি চলো।
সাতসকালেই রাজপথে এক নাটক। সকলেরই চোখে প্রশ্ন। উৎসুক মানুষের মধ্য দিয়ে আমরা দু’জনে ফিরে এলুম। বাড়িতে ঢুকেই কাকাবাবু বললেন, আমি তোমার ওপর কেন অমন রেগে গেলুম। বলো তো, ছোটলোকের মতো?
বউদি বললেন, থাক ওসব ফয়সালা। মুখহাত ধুয়ে ফেলুন। সকালের চা-টা হয়ে যাক আগে। কাকাবাবু দু’হাতে আমার কাধদুটো ধরে, সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমিই হরিশঙ্করদার ছেলে হবার উপযুক্ত। বোম্বাই আম গাছে বোম্বাই আমই হয়। আসল ব্যাপারটা কী। জানো, তোমাকে আমি বোধহয় সর্বাধিক ভালবাসি। আমারও তো কিছু আশা ছিল। শান্ত সংসার, তোমার মতো একটি ছেলে, হরিশঙ্করদার মতো ভাই। সবই তো মরীচিকা হয়ে গেল। ভালবাসার। কোনও ব্যাখ্যা হয় না পিন্টু। ইট ফ্লোজ। যেমন করে ধমনিতে রক্ত প্রবাহিত হয়। তোমাকে এত, ভালবাসি বলেই তোমাকে অন্য কেউ অধিকার করলে আমার অভিমান হয়। হোয়াট ক্যান আই ডু? আই অ্যাম হেলপলেস।
এক প্রবীণ আর এক নবীন দু’জনে দু’জনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সময় যেন থমকে গেছে। আমরা কত অসহায়! ভেতরে শূন্যতার তেপান্তর। কারওই কেউ নেই। সকলেই সকলকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছি। চাঁদের বাইরে মায়াবী আলো। সে আলোও আবার ধার করা আলো। চাঁদের পিঠে বীভৎস যত গর্ত। প্রাণহীন এক মহাশ্মশান। বউদি আর টিপ দু’জনেই রান্নাঘরে। হঠাৎ আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। মনে হওয়ামাত্রই রাতের শ্মশানের দৃশ্য আবার ভেসে উঠল। স্যার ওয়াল্টার র্যালের কথা, পৃথিবীটা কী? বিশাল এক কারাগার। প্রতিদিনই কিছু কিছু কয়েদিকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা আর ফেরে না।
কাকাবাবুকে বললুম, আপনি একটু হাসুন। তা না হলে আমার মন ঠিক হবে না।
হাহা করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। বউদি ছুটে এলেন, কী হল?
কাকাবাবু বললেন, ভয়ের কিছু নয় বউমা। জীবন বেলাইন হয়ে গিয়েছিল, আবার তাকে লাইনে ভেড়ানো হল। সুর কেটে গিয়েছিল না!
বারান্দার টিনের চালে এক ঝাক পায়রা এসে বসেছিল। কী কারণে সবকটা ফটফট করে উড়ে গেল। কিছু পরেই কারণটা বোঝা গেল। সেই বাঘা বেড়ালটা ছাত থেকে লাফ মেরে টিনের চালে নেমেছে। বড়ই আফসোস। একটাকেও যমের বাড়ি পাঠাতে পারল না।
.
দুপুর এল। মুকুর শাড়িটা বউদি তার থেকে তুলে পাট করে রেখে গেছেন। কোনও মেয়েলি ব্যাপার আর চোখে পড়ার উপায় নেই। বর্শার ফলার মতো রোদের রেখা নতুন টিনের চাল থেকে ঠিকরে। চোখে এসে লাগছে। নারী শূন্য বাড়িতে অনেকদিন পরে আমার শৈশবকে যেন ফিরে পেলুম। কেউ তখন ছিল না। আমি আর পিতা হরিশঙ্কর। আমাদের ঘিরে ছিল উচ্চ আদর্শ, ত্যাগ আর তিতিক্ষা। ছিল এসরাজ, হারমোনিয়ম, তানপুরা, বাঁয়া-তবলা। একটা আশ্রমিক পরিবেশ। পিতা যেন বাঘছাল পরা, ত্রিশূলধারী মহাদেব। তিনটে জিনিসকে শূলে বিধে হত্যা করা হয়েছিল কাম, ক্রোধ আর লোভ।
