তোমার কৃপায় এই মেনি, হাড়হাবাতে এই মেনি তোমার সৃষ্টির এই লীলা দেখে ধন্য হয়েছে। কী বিরাট, স্বরাট, মহারাজ। একটা গাছকে জড়িয়ে ধরে আমার কঁদতে ইচ্ছে করছে। কী বিশাল বিচিত্র এই সৃষ্টি! কোথায় তুমি বসে আছ মহারাজ? কেন তোমাকে দেখতে পাই না! তোমার সৃষ্টির পথ। রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী।
মেনিদা ঝরঝর করে কাঁদছেন। আশ্চর্য চরিত্র! আমাদের বাঁ পাশে গঙ্গা। বড় বড় অশ্বথ আর বট গাছ। আকাশের গা থেকে অন্ধকারের নির্মোক একটু একটু করে খুলে পড়ছে। দ্রুত ধাবমান ট্রেনের জানলায় যেমন একটি-দুটি নিরীহ আত্মভোলা মুখ দেখতে পাওয়া যায়, সেইরকম একটি কি দুটি তারা আকাশের চাদোয়ায়। গাছের পাতায় বাতাসের ভিজে জাল টানার শব্দ। মেনিদা অবরুদ্ধ। গলায় বলে চলেছেন,
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত
তার তরে রাখোনি গোপন রাত্রি
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ
সে যে চিরস্বচ্ছ
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চিরসমুজ্জ্বল
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু
এই নিয়ে তাহার গৌরব
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে
কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভাণ্ডারে
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার।
মেনিদা একটা দম নিলেন বড় করে। চোখ মুছলেন জামার হাতায়। ভিজেভিজে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এক্সকিউজ মি। বিশ্রী একটা ভাব এসে গিয়েছিল। আসলে আমি তো খুব দুঃখী মানুষ। কেন মাঝে মাঝে বজ্জাতি করি জানো? তুমি কি শেকসপিয়ারের রিচার্ড দি থার্ড পড়েছ?
আজ্ঞে না।
তোমরা কেন লেখাপড়া করো না বলো তো, ইয়াংম্যান? আরে, আমরা একজায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। সেই থেকে! ছেলেরা কোথায় গেল?
এগিয়ে গেছে।
চলো চলো, সর্বনাশ! ভিজে কাপড়ে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।
আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি আমি। কী করে বুঝলেন আমি বিয়ে করব? আমার কোন রকমসকম দেখে আপনার এই ধারণা হল!
ও তুমি এখনও ওইটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছ? প্রথমত, দেখো তোমার চুল। একেবারে এ-ক্লাস বাবরি। শিল্পী-শিল্পী ভাব। দ্বিতীয়ত, তোমার সাজপোশাক। তুমি স্টিমলন্ড্রিতে জামাকাপড় কাঁচাও। সবসময় ফিটফাট ধোপদুরস্ত। তৃতীয়ত, তুমি রোজ দাড়ি কামাও, মুখে স্নো-পাউডার মাখো। গায়ে সেন্ট মাখো। চতুর্থত, তুমি মেয়ে ছাড়া থাকতে পারো না। আর পঞ্চম, নরানাং মাতুলক্রমঃ, তোমার মামার ধারায় রয়েছে গান, সিনেমা, নায়িকাসঙ্গ। এইবার তুমিই বলো। নিজেকে নিজেই বিচার করো। তোমার ভেতরে প্রেম জাগছে।
আমরা হনহন করে হাঁটছি। একজন-দু’জন জ্ঞানার্থী গঙ্গার দিকে চলেছেন নিদ্রার আলস্য নিয়ে। হঠাৎ মেনিদা পাকা ওস্তাদের গলায় গান ধরলেন, ওগো! কেমনে বলো না ভাল না বেসে থাকি গো তোমায়!
ভদ্রলোকের মাথায় একটা কিছু হয়েছে। কত রকমের ভাব খেলা করছে। মেনিদা কিছু দূর আমার সঙ্গে এলেন, তারপর বিদায় নিলেন। নিত্যকর্ম করবেন। পথে পথে নামগান গেয়ে বেড়াবেন। মেনিদার গুরু বলেছেন, মেনি, নাম ছেড়ো না। নামেই মুক্তি।
বাইরের রকে অক্ষয় কাকাবাবু গুম মেরে বসে আছেন। সদরের চাবি আমার কাছে। ঢুকতে পারেননি। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না, তবু প্রশ্ন করলুম, কখন চলে এলেন?
জানো না?
আজ্ঞে না। খেয়াল করিনি।
এতই যখন বেখেয়াল তখন আর জেনে কী হবে?
আশ্চর্য কথা বলছেন আপনি! নিজেই উদাস হয়ে বসে রইলেন দলছাড়া হয়ে, আমাদের পেছন দিকে। এক ফাঁকে টুপ করে উঠে চলে এলেন। কেমন করে জানব? আপনার রাগের কারণটা কী?
সে আর তোমার জেনে কাজ নেই। দয়া করে দরজাটা খোলো, আমার জিনিসপত্তর নিয়ে সরে পড়ি। খুব শিক্ষা হয়েছে আমার।
কাকাবাবু, অত রাগ ভাল নয়। এই রাগের জন্যেই আপনি আজ সংসারছাড়া।
শুকনো ঘাসে আগুন পড়লে যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে, কাকাবাবুও সেইরকম দপ করে জ্বলে উঠলেন, শোনো পিন্টু, বয়সকে সম্মান দিতে শেখো। জানি তোমার অনেক ইয়ারবকশি জুটেছে। ইহকাল-পরকাল দুটোই চিবিয়ে শেষ করবে। তোমার অধঃপতনে আমি অবাক।
বেশ কড়া একটা জবাব জিভে এসেছিল। হঠাৎ মনে পড়ল, সন্ন্যাসী আমাকে অমৃতফল খাইয়েছিলেন। সহজে বিচলিত হলে তো চলবে না। সঙ্গে সঙ্গে জিভে লাগাম চড়ে গেল। রাগ রাগ ভাবে তালাটা খুলতে যাচ্ছিলুম। সংযত ভাব এল। ধীরে দরজা খুললুম। সঁাতাতে একটা বাতাস ঝাঁপটা মেরে চলে গেল। পেছন থেকে কে খুব মিষ্টি গলায় ডাকল, পিন্টুদা।
টিপ আর টিপের মা। টিপের হাতে একটা নিমডাল। বউদির হাতে গঙ্গাজলের ঘটি। মিষ্টির বাক্স। হাঁ করে তাকিয়ে আছি। বউদি বললেন, কী দেখছ অমন করে?
আপনারা? আপনারা এলেন আমার জন্যে?
হ্যাঁ এলুম। দেখো ঠিক সময়ে এসে গেছি। দাঁড়াও, ঢোকার আগে নিমপাতা চিবোও। কাকাবাবু বসেই আছেন। বউদি বললেন, চান করেননি আপনি?
না, আমি আমার সময়ে চান করব।
শ্মশানে যাননি?
গিয়েছি।
তা হলে?
শ্মশানেই আমার ঘরবাড়ি। আমার চানের দরকার হয় না।
কাকাবাবু ভেতরে চলে গেলেন। টিপ বললে, মনে হচ্ছে, কোনও কারণে বেশ রেগে আছেন।
