মেনিদা বসে ছিলেন আমার পাশে। শান্তশিষ্ট হয়ে। হঠাৎ ফোঁসফোঁস করে কেঁদে উঠলেন। মাথার ওপর বাতাস কাঁদছে বটের পাতায়। তলায় কাঁদছেন মেনিদা। আমি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলুম, কাঁদছেন কেন?
কাঁদব না? শ্মশানে কেউ হাসে! তোমার দিদিকে আমি ভালবেসে ফেলেছিলুম।
সে আবার কী? আপনি দেখলেন কবে?
এই তো আজ সকালে। আমার নিজের দিদির কথা মনে পড়ে গেল। এমনি পাতলা পাতলা চেহারা ছিল। চোখা মুখের গড়ন। দেখেই চমকে উঠেছিলুম, এ কে? এই তো আমার দিদি। জানো
তো আমার দিদি মাত্র আঠাশ বছর বয়সে টিবিতে মারা গিয়েছিলেন। আর আমার মহাবিষয়ী কৃপণ বাবা বলেছিলেন, যাক বাবা বিয়ে দেবার খরচটা বেঁচে গেল। সেই বাপের ছেলে আমি। তুমি যে আমাকে চড় মেরেছিলে, বেশ করেছিলে।
কেন আমাকে বারেবারে লজ্জা দিচ্ছেন?
লজ্জা দেবার জন্যে বলিনি। আমার নিজের ওপরে নিজেরই বিশ্রী একটা ঘৃণা এসে গেছে। কবে যে এই স্টেশনে এসে টিকিট কাটব। এ এমন এক স্টেশন যেখান থেকে ট্রেন শুধু ছেড়েই যায়, ফিরে আর আসে না। ওই গানটা আমি কান খাড়া করে শুনি, যেথায় গেলে হারায় সবাই ফেরার ঠিকানা গো, ডাক এসেছে আমার সে দেশ থেকে বিদায় নেব একটিবার শুধু তোমায় দেখে। মেনিদার গলা ধরে এল আবার। মাথা নিচু করলেন। পিঠের দিকটা ফুলছে। হঠাৎ আমার হাতদুটো খামচে ধরে বললেন, জানো, পৃথিবীতে ভালবাসা ছাড়া কিছু নেই। ভালবাসা হিরের চেয়েও দামি। তুমি আমাকে কোহিনুর দিতে চাইলে আমি বলব, ভালবাসা দাও। এ লিটল লাভ। এবারের বাঁচাটা গেঁজিয়ে গেল। পরের বার আসছি একটু ভাল ঘরে। সাত্ত্বিক পিতামাতার সন্তান হয়ে। আমারও দিন আসবে টুডে অর টুমরো।
চিতাটা ভুসভুস করে ধসে গেল। জোনাকির মতো চারপাশে উড়ে গেল একরাশ ফুলকি।
মেনিদা বললেন, যাও, বাকি কাজটা করে এসো।
অনেকক্ষণ একভাবে বসে থাকার ফলে, পায়ে ঝিনঝিন ধরে গেছে। দাঁড়ানোমাত্রই উলটে পড়ে যাচ্ছিলুম। মেনিদা ধরে ফেললেন, সামলে ভাই সামলে।
চিতায় জল ঢালা হল। ধোঁয়ায় সোঁদাসোঁদা গন্ধ। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এত বছরের বেঁচে থাকা একমুঠো ছাই মাত্র! নাভিটা খুঁজে খুঁজে বের করল মেনিদার বড় ছেলে। একতাল গঙ্গামাটিতে পুরে বললে, চলো, গঙ্গায় ফেলতে হবে।
মাঝরাতের গঙ্গার কী শোভা! যেন তরল মৃত্যু। কুলকুল করে বয়ে চলেছে। কিন্তু অক্ষয় কাকাবাবু কোথায়!
২.২৫ Life is like an Onion
কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না মানুষটিকে। আমরা সিক্ত বস্ত্রে সিক্ত পদে শ্মশান ছেড়ে বাইরে চলে এলুম। পুব আকাশে জবাফুলের রং ধরেছে। মেনিদা বললেন, প্রমাণ করে দিলুম, রাজদ্বারে আর শ্মশানে যে সঙ্গী হয় সে-ই প্রকৃত বন্ধু। আমরা তোমার শাস্ত্রসম্মত বন্ধু। তোমার সেই ঘটোৎকচ, দেখলে তো, কোন এক সময় কেটে পড়েছে খুস করে! দ্যাটস ভেরি ব্যাড, অফুলি ব্যাড।
আমাদের অনুসরণ করে আসছে আমাদেরই ভিজে কাপড়ের সপাত সপাত শব্দ, আর পায়ের ছাপ। মেনিদা আমার পাশে পাশে আসছেন কথা কইতে কইতে। হঠাৎ বললেন, তোমার খুব একা লাগে, না? বাবা চলে গেলেন, তোমার সেই মেয়েটিও চলে গেল। যা-ও বা একটা দিদি এসেছিল, সে-ও সরে পড়ল। এইবার তুমি কী করবে! একেবারে একা একা পৃথিবীতে বাঁচা যায়?
আমার কথা বলতেই ইচ্ছে করছে না। কোনওরকমে বললুম, হুঁ।
মেনিদা বললেন, কোনওদিন অচলাকে দেখেছ?
অচলা? কে অচলা?
অচলা আমার মেয়ে। নিশ্চয় দেখেছ। তাকে না দেখে উপায় নেই। তার যা রূপ, যে-কোনও ছেলেকে তাকাতেই হবে। উঠতি বয়সের ছেলে। আর তা না হলে বুঝতে হবে কোনও অসুখ আছে। আমি নিজেই অনেক সময় হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। একটা পারফেক্ট ক্রিয়েশন। সিনেমাঅলারা পেলে একেবারে খামচাখামচি করবে। ওকে বেশিদিন আর এইভাবে ফেলে রাখাটা সেফ নয়। ধামায় করে প্রেমপত্তর ফেলতে হয়। তাই ভাবছি তোমাদের দু’জনকে গেঁথে দিয়ে চলে যাব। তোমাকে কিছু করতে হবে না, শুধু একটু সাবধানে রাখবে, যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়! ঠিক এই সময় কথাটা কেন বলছি জানো? ইংরেজি প্রোভার্ব, স্ট্রাইক দি আয়রন হোয়াইল ইট ইজ হট। তোমার মনটা এখন সম্পূর্ণ ফঁকা হয়ে আছে। ফঁকা দেয়ালেই ছবি ঝোলাতে হয়। ঝুলিয়ে দিলুম, তুমি এইবার তাকিয়ে থাকো। রুমাল দিয়ে মোছো। ভাব আনো মনে। একটা অভাববোধ। এরই মাঝে টুক করে একদিন অচলাকে পাঠিয়ে দোব। সে তোমার মন মেরামত করে দেবে।
কেমন করে বুঝলেন আমি বিয়ে করব?
তোমার হাবভাব রকমসকম দেখে।
সে আবার কী?
তুমি পায়রা দেখেছ? পায়রার মেটিং!
আজ্ঞে না, সুযোগ হয়নি, ইচ্ছেও নেই।
নেচারকে অবজার্ভ করবে, স্টাডি করবে, দেখবে কত কী জানতে পারবে। পুরুষ পায়রা গালগলা ফুলিয়ে পেখম ছেতরে, একবার এদিক যায়, একবার ওদিক যায়। কোঁক কেঁক শব্দ করতে থাকে। গায়ের রংটং আরও উজ্জ্বল হয়ে যায়। স্ত্রী-পায়রা তখন বুঝতে পারে। প্রকৃতির সে এক অদ্ভুত লীলা। তুমি সাপের মেটিং দেখেছ?
আজ্ঞে না। আমি তো ন্যাচারালিস্ট নই। আর মেটিং দেখা উচিত না। অসভ্যতা।
মেনিদা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললেন, তোমার মাথা! মানুষ ছাড়া আর কিছু চতুষ্পদ ছাড়া, প্রাণীজগতের মেটিং স্বর্গীয় দৃশ্য। কী আর্ট! কী বিউটি! জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঝকঝকে পিচের রাস্তা চলে গেছে। ফটফট করছে চাঁদের আলো। আমরা একটা গাড়ি করে যাচ্ছি। বসেছি সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে। সামনে চাঁদের আলোয় ধোয়া পথ। আহা! হোয়াট এ ম্যাগনিফিশিয়ান্ট সাইট! ড্রাইভার ঝপ করে ব্রেক কষে দিল। ঠিক হাত-কুড়ি দূরে একজোড়া শঙ্খচূড়। মেল সাপটা পেছনের লেজে ভর রেখে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়েছে আর ফিমেলটা তার সারাশরীর পেঁচিয়ে ওপরে উঠেছে, দুটো মাথা হেলছে-দুলছে, যেন অদৃশ্য কোনও সংগীতের তালে তালে। এ একবার ছোবল মারে তো, ও একবার। দড়ির ফঁসের মতো জড়িয়ে গেছে দুটো শরীর। একটা সার্কল করে দু’জনের শরীরের নীচের অংশ খেলে বেড়াচ্ছে। সাপ দুটোর শরীর যেন ফসফরাসের মতো জ্বলছে। আর একটা সুগন্ধ, যেন কেউ কোথাও কামিনীভোগ চালের পায়েস রাঁধছে। আর একটা ঝুনঝুন শব্দ। দু’জনের শরীরের কাটার মতো হাড়ের শব্দ। উঃ সে কী দৃশ্য! গড, আই অ্যাম গ্রেটফুল টু ইউ।
