মেনিদা বললেন, ভেবে মরছ কেন? আরে আমি তো রয়েছি তোমার সঙ্গে। লোকটা জাতখচ্চর। সে আমি জানি। অনেকদিন পরে একটা গলায়-দড়ি কেস পেয়েছে। চেষ্টা করবে নেংড়াবার। আমিও কাঠপিঁপড়ে। সহজে ছাড়ছি না। লোকটা আমায় হাড়ে হাড়ে চেনে। এই বসেছি, ডেডবডি নিয়ে উঠব। আর এক দলা মোদক মেরে দিই। এক গেলাস চা বলো তো। স্ট্রেংথ কমে আসছে।
হাত চেপে ধরে বললুম, প্লিজ, আর মোদক খাবেন না। চা খান কোনও ক্ষতি নেই।
তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? এ হল মহাদেবের নেশা। ভভম ভভম ববম ভাল/ ঘন বাজে শিঙ্গা ডমরু গাল/ রুদ্ৰতালে তাল দেয় বেতাল/ ভৃঙ্গী নাচে অঙ্গ ভঙ্গিয়া।–বুঝলে? লিঙ্গেশ্বর জেগে ওঠেন।
বিরক্ত হয়ে বললুম, কিছুক্ষণ চুপ করে বসুন না, কথা না বলে।
তা হলেই তোমার যে দুশ্চিন্তা বেড়ে যাবে ভায়া। আমি যে তোমার কারণেই বকরম বকরম করছি গো। এও দেখো মেনির বরাত। যার জন্য চুরি করি সে-ই বলে চোর।
কালো রঙের বিশাল একটা গাড়ি ঝাড়াং ঝাড়াং শব্দ করতে করতে থানার সামনে এসে দাঁড়াল। মেনিদা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন, যাক এসে গেছে।
কিন্তু খাট কোথায়?
ওই তো, আসছে পেছন পেছন। তোমার দুটো দুশ্চিন্তাই দূর হল।
একটু লজ্জাই পেলুম। একটু আগে চোর ভেবেছিলুম। মধ্যবিত্ত বাঙালি তো! সবেতেই সন্দেহ। সকলকেই সন্দেহ। অসম্ভব একটা ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললুম। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন কাকাবাবু। আমার ডাক পড়ল। দারোগামশাই বেশ আয়েশ করে বসে আছেন। দুপুরে মাংস খেয়েছেন। দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচছেন। আর ফুঃ ফুঃ করছেন। এঁর আগের অফিসারের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। বড় সুন্দর মানুষ ছিলেন তিনি। আমার মামার গানের ভক্ত।
অফিসার বললেন, যাও, লাশ এসে গেছে। বেশি নাড়াচাড়া কোরো না, পেট খুলে মাল বেরিয়ে পড়বে। ওরা কোনওরকমে ট্র্যাক সেলাই দিয়ে ছেড়ে দেয়। যাও নিয়ে গিয়ে চাপিয়ে দাও। কাগজপত্তর সব সই করো। পকেটে টাকা আছে?
ফস করে বেরিয়ে গেল, আবার টাকা?
হেসে বললেন, হ্যাঁ টাকা। অনবরত টাকা। যারা তোমার জন্যে সারাটা দিন এত করল, তাদের একটু মিষ্টিমুখ করাবে না! তিনজন আছে, তিনশো হলেই চলবে।
তিনশোটা টাকা তার হাতে দিতে গেলুম, তিনি ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠলেন, আমাকে না আমাকে না। গাড়ির ড্রাইভারকে।
সব ঝামেলা মেটাতে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগল। দিদিকে নিয়ে এসেছে চট দিয়ে মুড়ে। পাতলা মুখ আরও পাতলা হয়ে গেছে। রংটা কালচে। রক্ত জমে গেছে। দড়ি দিয়ে ঝোলার সময় ঘাড়টা ভেঙে গেছে, লটরপটর করছে। মৃত্যু যেন অদৃশ্য বাঘ। কখন যে ঝাঁপিয়ে পড়বে ঘাড়ে! কেউ জানে না। জানতেও পারে না। চটের রং দেখে আমার ভীষণ ঘেন্না করছিল। রক্তের দাগ। ময়লা। আঁশটে একটা গন্ধ। এই মৃত্যুর মধ্যে কোনও শোভা নেই। পবিত্রতা নেই। জীবন থেকে বেরিয়ে যাবার দরজা দিদি খুঁজে পেয়েছিলেন, তবে সদর দরজা নয়, খিড়কির দোর।
মেনিদার ছেলেরা মেনিদার মতোই। কোনও ঘেন্নাপিত্তি নেই। দু’দিক থেকে দু’জন ধরে ঝপ করে তুলে ফেলল।
আমি বললুম, সাবধান, পেট খুলে যাবে।
একজন বললে, আবার প্যাক করে দেব।
কারও কথাই আমার ভাল লাগছে না। কোথাও কোনও দুঃখ নেই, এক ফোঁটা চোখের জল নেই। একজন মানুষের চিরতরে চলে যাওয়াটা কি কিছুই নয়! চারদিকে চড়া চড়া আলো জ্বলছে। টেলিফোনের কর্কশ বাদ্য। উচ্চকণ্ঠের হ্যালো। জিপগাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দ। এ যেন এক ধাতব জান্তব পৃথিবী। হাতকড়ার ক্ল্যাং আওয়াজ। ইউনিফর্মের বিকট গন্ধ।
প্রায় একটা বোঝার মতো দিদিকে খাঁটিয়ার ফেলা হল। কোনওরকমে চাপিয়ে দেওয়া হল কিছু ফুল, একটা মালা। সবই আমার হাতের বাইরে চলে গেছে। আমি এক দর্শক মাত্র। তিন জন তিন দিকে। আর একটা কাঁধের দরকার ছিল। সেই কাঁধ আমার। চাপা হরিধ্বনি। দিদি চললেন। এখানে বাঁচতে এসে মরে গেলেন। জীবন খুঁজতে এসে পেয়ে গেলেন মৃত্যুকে। চিরমুক্তি। মেনিদার পকেট থেকে বেরোল করতাল। তিনি আসছেন সবার পেছনে, নাম করতে করতে।
শ্মশানে গিয়ে এক নাটক হয়ে গেল। কাকাবাবু চাইলেন, কোনওরকমে চিতায় তুলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিতে। অনুষ্ঠানাদির কোনও প্রয়োজন নেই। নিজের দোষে মারা গেছেন। পাপী। যেমন কর্ম তেমন ফল। যাবে তো নরকেই, তার আবার অত কী!
মেনিদা রুখে দাঁড়ালেন। মৃত্যু আর আগুন দুটোই মানুষকে পবিত্র করে। প্রথা যা তা পালন করতেই হবে। লেগে গেল দু’জনের ঝটাপটি। কাকাবাবু রেগে একপাশে সরে গেলেন। আমাকে একটু খোঁচা মেরে গেলেন, তোমার দেখছি আপন লোকের অভাব নেই। এখন মনে হচ্ছে আমি উড়ে এসে জুড়ে বসেছি।
এসব এত বাইরের কথা, আমার আর কানে নিতে ইচ্ছে করল না। শ্মশানের পুরোহিত এগিয়ে এলেন। শুরু হল যাবতীয় অনুষ্ঠান আর মন্ত্রপাঠ। চিতা জ্বলে উঠল। কিছু দূরে বটতলায় এসে বসলুম। কাকাবাবু ওপাশে ধ্যানস্থ। আমাদের মুখদর্শন করবেন না তিনি। মনে হল কিছু একটা জপ করছেন। এক এক মানুষের এক এক রকম বিচার। আচরণ।
দিদির লম্বা লম্বা চুল বিদ্যুতের মতো লিকলিকে হয়ে জ্বলে কিছু সূক্ষ্ম ছাই আকাশের দিকে উড়িয়ে দিল। পশ্চিমে গঙ্গা। বাতাস আসছে হুহু করে। ঈশ্বরের কী অপূর্ব খেলা! সংসার ছাড়াবার আগে শ্মশানটা একবার দেখিয়ে দিলেন। মানুষের অনিবার্য পরিণতি দেখছি চোখের সামনে। পুড়ে ঝুল কালো হতে হতে দপ করে জ্বলে ওঠা। এক কিশোর মায়ের চিতাভস্ম গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে গলায় কাছা নিয়ে এগিয়ে আসছে টলতে টলতে। মেনিদার তিন ছেলে সিনেমার গল্প করছে। চিতা জ্বলছে দাউদাউ করে। বিশাল চেহারার এক মানুষ খাটের বাঁশ খুলে নিবে-আসা একটা চিতা দমাস দমাস করে পেটাচ্ছে। আগুনের ফুলকি উড়ছে।
