মুকু বাঁ হাতে কোনওরকমে আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে নিল। মুকুর চুল বেশ কেঁকড়ানো কোকড়ানো। দু’জনের আহার বেশ জোরকদমে চলেছে। অম্বুলের রুগি হলে কী হবে, মেসোমশাই বেশ ভালই টানছেন। এক এক গ্রাসে, এক একখানা লুচি উড়ে যাচ্ছে।
দেয়ালে পিঠ দিয়ে বসে আছি। দু’বোন আমাকে কোনও কাজই করতে দেবে না। পিতা পাত থেকে মুখ তুলে বললেন, কী বুঝলে তা হলে?
বোকার মতো তাকিয়ে রইলুম ঘুমঘুম চোখে। কোন বোঝার কথা বলছেন?
একটি নধর পটল আঙুল দিয়ে ফুটো করতে করতে বললেন, সেই ছাগলের ঘটনা মনে আছে। নিশ্চয়ই।
ওরে বাবা, খুব মনে আছে। অনেকটা এই ভুলোর মতোই ব্যাপার। পিতাপুত্রে বাজার সেরে ফেরা হচ্ছে। আমার হাতে বিশাল দুটো কপি। চারপাশে লতাপাতা ঝুলছে। পথের পাশে একটা ছাগল শুয়ে ছিল। হঠাৎ মনে হল কপির পাতা তো কাজে লাগবে না। আহা কৃষ্ণের জীব খাইয়ে যাই। কপিসমেত পাতা মুখের সামনে ধরলুম। নে, খা, পাতা খা। ছাগলটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আচমকা এক টান মেরে কপিদুটো হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মার দৌড়। দু’জনেই ছুটছি ছাগলের পেছনে। হইহই রইরই ব্যাপার। ছাগল এক খানা টপকাবার জন্যে মারলে লাফ। কপি ছিঁড়ে পড়ল নর্দমায়। পাতা-মুখে ছাগল পালাল ওপারে। রাস্তার লোকের সে কী আনন্দ! মানুষ বোকা বনে গেলে তার চেয়ে আনন্দের আর কী আছে! পিতার চোখমুখ রাগে লাল। বাড়ি ফিরে বললেন, ছাগলটাকে চিনতে পারলে? ভালমানুষের মতো বললুম, আজ্ঞে না।
আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। দেখতে পাবে।
সামান্য দুটি কথা; কিন্তু কী অসম্ভব জ্বালা। শুনেছি, শয়তানের মুখ নাকি ছাগলের মতোই।
মুগের ডালের তারিফ করতে করতে পিতা বললেন, তোমার জন্যে আমি এক সেট ‘সারমন অন দি মাউন্ট’ তৈরি করে দিয়ে যাব। প্রথম সারমন হল, সবসময় ভাববে আমি মানুষ নই, একটা গাধা। পৃথিবীর অন্য সমস্ত জীবজন্তুর বুদ্ধি আমার চেয়ে ঢের বেশি।
মেসোমশাই ভরাট মুখে বললেন, সেই লেটারবক্সের ঘটনার পর আমিও নিজেকে তাই মনে করি।
পিতা কুচুরমুচুর করে লুচি খেতে খেতে বললেন, গ্রেট গাধাজ থিঙ্ক অ্যালাইক। হ্যাঁ, আপনার কী হয়েছিল?
সেই লেটারবক্স। তখন তো বলা হল না। কোর্টে যাবার পথে একদিন একটা চিঠি পোস্ট করার ছিল। এই অবদি শুনেই কনক কুঁক কুঁক করে হেসে উঠল। মেসোমশাই মেয়েকে সমর্থন করলেন, হাসিরই কথা। ভাবলে আমার নিজেরই এখনও হাসি পায়। চিরকাল শুনে আসছি চিঠি ঠিকভাবে না ফেললে লেটারবক্সের টাগরায় আটকে থাকে। তাই হাঁটু ভেঙে ডান পাশে কাত হয়ে হাতটাকে যতদূর পারা যায় ততদূর ঠেলে দিলাম ভেতরে। প্রায় কাধ পর্যন্ত ঢুকে গেল। চিঠিটা টুক করে ছেড়ে দিলুম। এইবার যত হাত টানি, হাত আর বেরোয় না। লেটারবক্সের জিভ আছে। আপনি কি তা জানেন হরিদা?
খুব জানি। লেটারবক্সও প্রাণী। সে থিয়োরি আমি আপনাকে পরে বলব।
যতবার হাত টানি মুখের সেই ফ্যালফ্যাল ফ্ল্যাপে কোটের ওপর হাতটা আটকে যায়। হাত আর বেরোয় না। তেমন জোরে টানতেও সাহস হচ্ছে না। কোট তো ছিড়বেই। সেই সঙ্গে একখানা। মাংসও যাবে। ইতিমধ্যে দু’-একজন এসে গেছেন চিঠি ফেলতে। তারা কেবলই জিজ্ঞেস করেন, কী। হল আপনার? আপনি কি নিজেকে পোস্ট করতে চাইছেন? তা হলে চিঠির বাক্সে নয়, পার্সেলের বাক্সে গিয়ে পড়ুন, হয়তো ধরে যাবে। লজ্জায় বলতেও পারছি না, আটকে গেছি। শেষে বলতেই হল, দাদা হাত টেনে ধরেছে। হইহই ব্যাপার। ঠিকুর রোদে বেলা বারোটা পর্যন্ত সেইভাবে ঝুলে রইলুম। মজা দেখার জন্যে শহরের ছেলেবুড়ো সব ভেঙে পড়ল। এজলাসে মামলা মুলতুবি রইল। জায়গাটার নামই হয়ে গেল, উকিলমারি। সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেছি, ডাকবাক্সে আর কখনও হাত ঢোকাব না।
চিঠিটা নিশ্চয়ই একটু ক্ষতিকারক ছিল!
তা একটু ছিল। উকিলের চিঠি তো! কারুর সর্বনাশ, কারুর পোষ মাস।
সেই কারণেই লেটারবক্স হাত কামড়ে ধরেছিল। মরামাছ প্রতিশোধ নেয় জানেন কি?
কীরকম?
এই তো কয়েকদিন আগে সঁাত আর মাড়ির ফাঁকে আড়াআড়ি ঢুকে গেল কাটা। কিছুতেই বেরোয় না। আঙুলে ধরা যায় না। কাঠি দিয়ে খোঁচানো যায় না। জিভ দিয়ে ঠেলা যায় না। মাড়িতে পুঁতে গেল। ধারালো একটি খোঁচা বেরিয়ে রইল। সারাদিন কসরত। শেষে ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে ফেঁড়ে বার করতে হল। মানুষ অপঘাতে মরলে ভূত হয়। মাছও তাই। মরে মেরে গেল।
ওটা জাস্ট একটা দুর্ঘটনা।
তা হলে শুনুন, দেয়াল কীভাবে প্রতিশোধ নেয়। পেরেক পুঁতছেন। ইয়া গজাল। হাতুড়ি পড়ছে টাই উঁই। কে বলেছে দেয়ালের প্রাণ নেই! যার কান আছে, তার প্রাণও আছে। হাতুড়ির সঙ্গে ইশারায় কথা হয়ে গেল। ব্যস, পরের ঘায়ে বুড়ো আঙুলের মাথাটা ছেতরে গেল। পৃথিবী কি সহজ জায়গা মশাই! এখানে কী আছে আর কী নেই! কী হয় আর কী হয় না, বলা ভারী শক্ত।
একটি রসগোল্লা মুখে পুরলেন। এ হেঃ প্রায় ঠান্ডা হয়ে এসেছে। গরম রসগোল্লা দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে খেতে হয়। নিন নিন, টপাটপ মুখে পুরুন। তা হলে তোমার দর্দ বাড়বে। হিন্দিতে দর্দ মানে যন্ত্রণা।
ঘড়ি খাড়াড়াক করে উঠল। সাড়ে এগারোটা বাজবে। তিনমাথার মোড়ে কুকুর মড়াকান্না শুরু করেছে। মাঝরাত এগিয়ে আসছে। এইবার ভূত বেরোবে। আমাদের চিলের ছাতে পাচা ডাকবে চা চাঁ করে।
