হঠাৎ আমার সন্দেহ হল, সাহস করে জিজ্ঞেস করলুম, আপনি কি কিছু খেয়েছেন আজ?
মেনিদা লাজুক লাজুক হেসে বললেন, এক ডেলা মোদক।
মোদক আবার কী?
সে কী! এত বড় ছেলে তুমি, মোক কাকে বলে জানো না? ভেরি পাওয়ারফুল অ্যাফ্রোডিসিয়াক। বুড়োরা খায়। খেলে শক্তি খুব বাড়ে। যৌবনশক্তি। বিজ্ঞাপন দেখোনি? মদনানন্দ মোক। কবিরাজি দাওয়াই। সিদ্দির অংশই বেশি। ভীষণ টেস্টফুল।
আপনি এইসব খান কেন?
খাব না? যৌবন চলে যাবে, আর আমি বসে বসে দেখব হেপলেস হয়ে। আমার থিয়োরি, যতদিন দেহ, ততদিন ভোগ।
তা হলে সকালে হরিনাম করেন কেন?
বাঃ, পাপীদের জন্যই তো মহানামের বিধান। রাতে পাপ করি, সকালে ইরেজার দিয়ে ইরেজ করি। পাপও হল না, পুণ্যও হল না। নিউট্রাল। মেনি মেনিই রইল। না হুলো, না পুষি!
মোদকের নেশায় আত্মবিশ্লেষণ হচ্ছে। তার মানে এই নয় যে মানুষটির চরিত্র বদলাচ্ছে। কুকুরের বাঁকা লেজ কি সোজা হয়! গঙ্গায় স্নানে নামলে, পাপ দেহ ছেড়ে গাছের ডালে উঠে বসে থাকে। স্নান সেরে ওঠামাত্রই ঝুপঝাঁপ লাফিয়ে পড়ে ঘাড়ে।
মেনিদার ফ্লো এসে গেছে, এই দেখো না আমার কেমন রেপুটেশন! আমি খুব ভাল মনেই প্রতিবেশীর বউকে হয়তো জিজ্ঞেস করলুম, বউমা, ছেলে কেমন আছে গো? সে অমনি ফোঁস করে। উঠবে, কেন বলুন তো? আপনার বুঝি ঘুম হচ্ছে না? তারপরেই রটিয়ে দেবে–আমি কোনও কু প্রস্তাব দিয়েছি। আচ্ছা জ্বালা বাবা!
যখন জানেনই, আপনার ওই আদিখ্যেতার কী দরকার?
বাঃ, বেশ বললে যা হোক। প্রতিবেশী হয়ে প্রতিবেশীর খবর নোব না! বেশ করব নোব। তাতে তোমার কী?
তা হলে বদনাম হোক।
হবেই তো। এর মধ্যে একটা-দুটো কেস তো অন্যরকম আছে। কেউ না-জানুক আমি তো জানি। আমার চরিত্র তো ধোয়া তুলসীপাতা নয়। জীবনভর অনেক কেচ্ছাই তো করেছি।
আচ্ছা এইসব কথা আপনি আমাকে কেন শোনাচ্ছেন?
তুমি ভাল শ্রোতা বলে। তোমারও তো জানা উচিত মানুষের সংসারে কতরকম পাপ আছে। মানুষ কীভাবে তিলে তিলে নিজেকে দগ্ধ করে! চিরটা কাল নাবালক হয়ে থাকবে নাকি! জীবনে অনুশোচনারও প্রয়োজন আছে। সাপ ছোবল মারে বলেই মানুষ সাপ থেকে সাবধান হয়। সাপ আর পাপ এক জিনিস। শোনো, জ্ঞানপাপীর নাম জানো?
সে আবার কে?
এই যে তোমার পাশে বসে আছে। নাম তার মেনি। অনেক আগে পড়েছিলুম, এখনও মনে আছে। কী সুন্দর কথা দেখো, In his errors a man is true to type. Observe the errors and you will know the man. আমাকে চিনতে তোমার কোনওদিন অসুবিধে হবে না, কারণ আমার অপকর্ম। কিন্তু ভায়া, তুমি নিজেকে কোনওদিন চিনতে পারবে না। এ এক মজার কল। আমারই আমি অথচ আমিই চিনি না। আচ্ছা গ্যাড়াকল শালা!
মেনিদা মেয়েলি গলায় গান ধরলেন, কথা কয় রে দেখা দেয় না/ নড়ে চড়ে হাতের কাছে/ খুঁজলে জনম-ভর মেলে না/ খুঁজি তারে আসমান-জমি/ আমারে চিনিনে আমি/ একী বিষম ভুলে ভ্রমি/ আমি কোন জন, সে কোন জনা।
তাল মারতে গিয়ে গেলাস উলটে গেল। ভাগ্য ভাল ভাঙেনি। মেনিদা বললেন, একসময় আমি মনোহর সাঁই কীর্তন করতুম। সিল্কের পাঞ্জাবি। গলায় ফুলের মালা। পায়ের ওপর কেঁচা লুটোচ্ছে। এতখানিখানি চুল। কপালে নাকে তিলকসেবা। সে এক ফাটাফাটি কাণ্ড। যাঃ শালা, যৌবনটাই চলে গেল। আবার জন্মব, আবার তবে যৌবন ফেরত পাব। সে এখনও বহুত দেরি। শোনো, যৌবনটাকে প্রপারলি ইউটিলাইজ করো। বড় ক্ষণস্থায়ী। অবশ্য তুমি ঠিকই করছ।
তার মানে?
আবার কেন প্রশ্ন করছ? বুঝতে তো পারছই, অন্যায় তো কিছু নয়, এই তো বয়েস।
এতক্ষণ তো বেশ হচ্ছিল, আবার কেন উলটোপালটা কথা বলছেন?
ওই তো, ওইটাই তো আমার রোগ। পেট-পাতলার মতো মন-পাতলা। চিন্তা লিক করে যায়। ওই রোগেই তো ঘোড়া মরেছে। তবে হ্যাঁ, মেয়েটি একেবারে চোখা, সারের সার। আমার চোখ কেড়েছে। তা হলে বুঝতেই পারছ?
এই কথাটা বলা কি সভ্যতা হল! এখন একটা সত্য কথা বলুন তো, ওরা কি টাকাটা মেরে পালাল?
তুমি কি ওদের অতটাই অসভ্য ভাবো?
দু’হাঁটুর ওপর দুটো হাত টানটান করে রেখে মেনিদা বসে আছেন। মুখে সবসময় যে ভুবনমোহিনী হাসিটি লেগে থাকে সেই হাসি। আমার নিজের মন নিদাঘের প্রান্তরের মতো শূন্যাকার হয়ে আছে বলেই মানুষটিকে এতক্ষণ সহ্য করতে পারছি। সবসময়েই একটা ভয় খেলা করছে, যেন পরীক্ষার ফল বেরোবে। হঠাৎ যদি আইনের প্রভুরা বলে বসেন, না মশাই এটা হত্যা, আত্মহত্যা নয়। গলায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে। হয়ে গেল! কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারছি না, তা কেন বলবে! মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, আমিই যেন খুনি। কেসটাকে সেইভাবে যদি সাজায়। মাঝে যে একটা লোভ ঢুকে আছে। একটা হার। গগনের অস্তিত্ব শুধু আমার মনে। সে যে এসেছিল, এমন। কোনও প্রমাণ আমার কাছে নেই। আমার কথা ছাড়া। আমাকে ফাঁসিয়ে কার কী লাভ! সে কি বলা যায়! অক্ষয় কাকাবাবুরও লাভ হতে পারে। ওই বাড়িতে আঁকিয়ে বসে গেলেন হয়তো। জড়িবুটির কারবার করেন। সেইটাই আরও ফলাও হবে। মুকুর ওপর রাগের অনেক কারণ থাকতে পারে। তার একটা হয়তো, মুকুকে তিনি নিজেই একটু নেড়েচেড়ে দেখতে চান। আকর্ষণটাই বিকর্ষণের কারণ। মানুষের মন দুর্গম অরণ্যের মতো। কত জন্তুজানোয়ার যে লুকিয়ে আছে! এমন ঘৃণা দেহবাসনা থেকেই আসে।
