লেখাটা কাকাবাবুকে দিলুম। তিনি পড়লেন। পড়ে অহংকারীর মতো বললেন, আমার ঘড়ি সুইস-মেক। অলওয়েজ গিভস কারেক্ট টাইম।
সন্ন্যাসী আবার স্মিত হাসলেন। প্যাডে লিখলেন, আই কেম ফর ইউ। কলকাতায় সাত দিন আছি। পারলে, পার্শ্বনাথজির মন্দিরে সকালের দিকে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। তোমার জীবনে ভাল সময় আসছে। ইউ আর স্ট্যান্ডিং অন দি গ্লেসহোল্ড। অ্যাভয়েড দিস ম্যান। হি ইজ বেসিক্যালি কুড। আমার হাত থেকে এক গেলাস জল নিলেন। আলগোছে খেয়ে গেলাসটাকে টেবিলের ওপর না রেখে ঘরের এককোণে রেখে, ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন। দেখছি রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন আত্মস্থ হয়ে। যেন একটি জ্যোতির্বলয় চলে গেল।
ওপরে উঠে আসতেই কাকাবাবু বললেন, প্যারাসাইটস। কত টাকা দিলে প্রণামী?
প্রণামী? অমৃতফলের প্রভাব কি না জানি না, ভীষণ হাসি পেল। আমি হাহা করে হাসতে। লাগলুম। নিজের হাসি দেখে নিজেই অবাক। এত জোরে আমি কখনও হাসিনি।
কাকাবাবু বললেন, অমন ইডিয়টের মতো হাসছ কেন?
এতেও আমার রাগ হল না। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, তামসিক একটা মানুষের অবয়ব খসে পড়েছে। ধসে পড়ছে অহংকারের ইমারত। সেই তূপের ওপর কুচকুচে কালো একটা ডিম।
কাকাবাবু বললেন, এইভাবে হাসাটা একটা মহা অসভ্যতা। হরিদার ছেলেকে এটা মানায় না। যাও চা করে আনো। আমাদের এইবার প্রস্তুত হতে হবে। খাওয়াটা তো মাটি করেই দিয়েছ, এইবার মনটাও খিঁচড়ে দিলে। চা-টা একটু কড়া করে কোরো। যেন সিস্টেমে অনেকক্ষণ থাকে।
ঘরের একপাশে টুলের ওপর ছোট্ট একটা কুঁজো ছিল। গলাটা ধরে নিজের মুখে জল ঢালতে লাগলেন। এমন হিপোপটেমাসের মতো হাঁ আমি খুব কমই দেখেছি। মানুষ যে সমস্ত পশুর সমাহার, কথাটা মিথ্যে নয়।
.
সন্ধে নেমে গেছে। আকাশ এখন লাল-কালো। মাঠ পেরিয়ে আমরা চলেছি থানার দিকে। দিদি এইবার আসবেন।
২.২৪ Who can go out without using the door
একটা খাট তো কিনতে হবে। কিছু ফুল। কয়েক প্যাকেট ধূপ। আবার কাধ দেবার জন্যেও তো কয়েকজনকে চাই। একা তো পারব না। ভীষণ অসহায় বোধ করছি। আশ্চর্য করে দিলেন মেনিদা। পাড়ার কেউ না, এগিয়ে এলেন তিনিই। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার তিন ছেলেকে।
মৃদু হেসে বললেন, অবাক হচ্ছ? সন্দেহ হচ্ছে, তাই না? ভাবছ আমার মতো একটা ইতর লোক আবার কী মতলবে এসেছে! কোনও মতলব নেই পিন্টুচন্দ্র। আমি নির্ভেজাল এক বাঙালি। জানো। তো, বাঙালির কান বড় হয়। পরের কথা শুনতে ভালবাসে। বাঙালির জিভ চেরা হয়। সাপের মতো ছোবল মারতে পছন্দ করে। কিন্তু বাবা হৃদয়টা খুব নরম হয়। আর একটা কী গুণ বলো তো? বিস্মৃতিপ্রবণ। ভুলে যায়। মনে রাখে না কিছু। তুমি আমাকে চড় মেরেছিলে। ভুলে গেছি। মনে। রাখিনি। কেন এসেছি জানো? তোমার পিতামহ ছিলেন আমার শিক্ষক। তাকে ভোলা যায় না। তার নখের যোগ্য তোমরা হতে পারোনি। আর ওই যে দেখছ আমার তিনটে দামড়া, ওদের আমি মানুষ করতে পারিনি, কিন্তু অমানুষ করতে পেরেছি। একালের মানুষের ডেফিনিশন কী জানেন? যে যার সে। তার। কেউ কারও নয়। মানুষ হলে, ওরা আমার কথায় ওঠ-বোস করত না। তোমার জন্যে ছুটেও আসত না। বক্তৃতাটা একটু লম্বা হয়ে গেল। এটাও বাঙালির লক্ষণ। কাজ কম, কথা বেশি। দাও, ওদের এখন টাকাপয়সা বুঝিয়ে দাও। সব কিনে আনুক। তোমার ভয় নেই, পাইপয়সার হিসেব বুঝিয়ে দেবে। পকেটে নিয়ে বেরিয়েছ তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বুদ্ধিমান ছেলে তুমি।
কত লাগবে বলে মনে হয়?
শ’দুয়েক ছেড়ে দাও। অত লাগবে না। তবু কাছে থাক।
ছেলে তিনটিকে এখন আর মোটেই খারাপ লাগছে না। অথচ এরাই একদিন মুকুকে লক্ষ করে অশ্লীল কথা বলেছিল। আমাকে একদিন রাস্তায় ধরে শাসিয়েছিল। বলেছিল, আমার খোলনলচে আলাদা করে দেবে। দাঁতগুলো খুলে মালা করে আমার গলায় পরিয়ে দেবে। যা হবার তা হয়ে গেছে। এরা এখন সম্পূর্ণ অন্য চরিত্র। দুশো টাকা নিয়ে তারা চলে গেল। মন এমনই এক জিনিস, বারেকের জন্য সন্দেহ খেলে গেল, কেটে পড়বে না তো!
অক্ষয় কাকাবাবু অফিসারের ঘরে গিয়ে বসেছেন। ছেচল্লিশের দাঙ্গার কথা হচ্ছে। সুরাবর্দি সরকারের কেচ্ছা চলেছে নতুন করে। থানার পাশেই চায়ের দোকান। মেনিদা আর আমি বসে আছি। পাশাপাশি। জিজ্ঞেস করলুম, চা খাবেন?
তুমি খাবে?
তা একটু খেতে পারি।
চায়ের অর্ডার দিলুম দু’গেলাস। মেনিদা হঠাৎ বললেন, মানুষ কেন এমন হয় বলো তো?
কীরকম বলুন তো?
এই আমার মতো। জটিলে কুটিলে টাইপ। সবাই ঘেন্না করে, সন্দেহ করে। দুরদুর করে। মানে অধমেরও অধম। অথচ দেখো লেখাপড়া শিখেছি। সারাজীবন ভাল চাকরি করেছি। দেশবিদেশ ঘুরেছি। কেন এমন হয়? রক্তের দোষ। তাই না?
কী করে বলি বলুন? আমার তো তেমন জ্ঞান নেই।
দেখো সংসার করেছি। এতগুলো ছেলেমেয়ে, তবু কিন্তু কাম গেল না। আড়ে আড়ে তাকাই। ঘেঁকছোঁক করি। অসভ্যতার চূড়ান্ত। যেন হেগো রুগি। আমার মতো জ্ঞানপাপীকে তুমি কী বলবে? যেখানে যখন গেছি সেইখানেই একটা কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বসেছি। তোমার বউদি তো আমাকে সারাজীবন উঠতে ঝাটা বসতে কোস্তা মেরে এল। এখন তো ফিরেও তাকায় না। বলে, আমি নাকি তাকে উঁটার মতো সারাজীবন চিবিয়েছি!
চা এসে গেল। মেনিদা এক চুমুক খেয়ে আঃ করে একটা প্রকাণ্ড শব্দ করলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একে বলে পরিতৃপ্তির শব্দ। একধরনের অসভ্যতা। কী আর করা যাবে বলো, যার যেমন স্বভাব।
