অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলুম তার লেখাটির দিকে। পিতা যতদিন জীবিত, লক্ষ রাখো তার সন্তানের দিকে। তার মনের গতির দিকে। এইবার দেখো, তার পিতার মৃত্যুর পর সে কী করছে! যদি দেখা যায় টানা তিনটি বছর সে তার পিতার ধারা থেকে একটুও সরে আসেনি, তখনই বলা যাবে সে সুসন্তান।
কে এই সন্ন্যাসী! এঁর কোনও পরিচয়ই আমার জানা নেই। সামান্য সন্ন্যাসী নন। প্রভূত জ্ঞানী। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন। আমি একটু থমকে গেছি। পিতা জীবিত। আমি কী করতে চেয়েছি? ভোগ। দেহভোগ। যৌবনের নীচ আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি খুঁজেছি। দেহের বন্ধ কাঁচের জানলায় ডুমো মাছির মতো অবিরত ধাক্কা খেয়েছি। আর তিনি চলে যেতে-না-যেতেই তার ধারা, তার আদর্শ লোপাট করে দিয়েছি। এর নাম সুসন্তান! এ তো একটা রাসকেলের জীবন বৃত্তান্ত!
সন্ন্যাসী হাতের আঙুল তুললেন। চিন্তার আবর্ত স্থির হয়ে গেল। বোধহয় অভয় দিতে চাইলেন। বলতে চাইলেন হতাশ হয়ো না। তিনি হাত বাড়িয়ে প্যাডটা আবার টেনে নিয়ে স্থির হাতে লিখেছেন, When you make a mistake, do not be afraid of mending your ways.
ঠিক ধরে ফেলেছেন আমার চিন্তা কোন পথে ছুটছে। অদ্ভুত তন্দ্রালু চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আপনমনে আমার দিকে। পাঞ্জাবির পকেটে আবার হাত ঢোকালেন। বেরিয়ে এল শুকনো একটা ফল। ফলটা আমার হাতে দিয়ে ইশারায় বললেন, খেয়ে ফেলো।
আমি প্রথমটায় একটু ইতস্তত বোধ করেছিলুম। খাব? সন্ন্যাসী-প্রদত্ত ফল! যদি কিছু হয়ে যায়। বলা তো যায় না। যা থাকে বরাতে! মুখে ফেলে দিলুম। অপূর্ব স্বাদ। ক্ষীরের মতো গলে গেল। সুন্দর গন্ধ। প্রশ্ন করার আগেই সন্ন্যাসী লিখলেন, এর নাম অমৃত ফল। হিমালয়ের একটি মাত্র অঞ্চলে হয়। একমাত্র সাধু-সন্ন্যাসীরাই যেতে পারেন সেখানে। অনেক প্রতীক্ষায় পাওয়া যায়। এই ফল মানুষের মনে একটা সাইকোলজিক্যাল পরিবর্তন আনে। বিষণ্ণতা দূর করে। কুভাব আসতে দেয় না। ঈশ্বরের চিন্তা করো। কথাটা বলা সহজ, শোনা সহজ, করা শক্ত। একমাত্র অ্যামবিশন হওয়া উচিত, আমি হব, কী হব, কেমন হব?
Like bone cut, like horn, polished,
Like jade carved, like stone ground.
কাগজের লেখা ক্রমশই বাড়ছে। ক্রমশই দুর্লভ হয়ে উঠছে আমার সংগ্রহ। আকাঙ্ক্ষা তো আছেই আমার। সংস্কার যাবে কোথায়! আসলে সঙ্গদোষ। ঘেরাটোপে মানুষ। মাতামহ ঠাট্টা করে কতদিন বলেছেন, তুলোয়-রাখা আঙুর। মাকে পাইনি। ছেলেবেলা থেকেই যেসব মহিলার সংস্পর্শে এসেছি, তারা প্রায় সকলেই ছিলেন দেহল। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তারা আমার মধ্যে বিকৃত রুচি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাঁদের আলাপ-আলোচনা, দেহ-প্রদর্শন উঠতি বয়সের একটা ছেলের পক্ষে ক্ষতিকারকই ছিল। নিজের দুর্বলতা আমি জানি। শত্রু আমার অচেনা নয়। পরাভূত করতে পারি, কিন্তু শত্রুকে আমি ভালবেসে ফেলেছি গোলাপি নেশার মতো। মদ ক্ষতিকারক জেনেও লোকে মদ খায়।
সন্ন্যাসী আবার প্যাড টেনে নিয়ে লিখলেন। লেখাটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে,
A blemish on the white jade
Can still be polished away.
আমি তার দিকে তাকালুম। করুণা ঝরেছে চোখে। প্রশ্ন করলুম, আমার কিছু হবে?
তিনি সঙ্গে সঙ্গে লিখলেন, Heaven is author of the virtue that is in you.
কী অপূর্ব কথা! আমি হা করে তাকিয়ে রইলুম লেখাটার দিকে। যে-গুণ আমার মধ্যে রয়েছে তার লেখক হলেন ঈশ্বর। অথবা ঈশ্বরই আমার মধ্যে লিখবেন আমার গুণাবলি। অথবা যে-গুণ আমার মধ্যে আছে তার বিকাশ ঘটাবেন তিনি। তাকে ধরতে হবে। কেমন করে মন যাবে তার দিকে?
উত্তরে সন্ন্যাসী লিখলেন, সাইলেন্ট প্রেয়ার। কৃপা করো, কৃপা করো। জপই একমাত্র পথ। নাম জপ। ঈশ্বর আর নিয়তি দুটোকেই বোঝার চেষ্টা করো। ঈশ্বরের মর্জি বুঝতে হলে বুঝতে হবে, কেন তার এমন ইচ্ছে হল! কেন তিনি করলেন এমন? আর নিয়তিকে বুঝতে হলে জানতে হবে, আমাদের জীবনের অনেক কিছুই নিয়তির এক্তিয়ারে। নিয়তির হাতে যা, তার পেছনে না-ছোটাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। জন্ম আর মৃত্যু নিয়তির হাতে, ধন, মান, মর্যাদা, মোক্ষ ঈশ্বরের হাতে।
এতক্ষণ খুব আন্তরিক একটা নাসিকা-গর্জনের শব্দ আবহসংগীতের মতো আমাদের ঘিরে ছিল, হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। পাশের ঘরে নাক ডাকিয়ে দিবানিদ্রায় যোগস্থ ছিলেন কাকাবাবু। তিনি এইবার ঘরে এলেন। এলেন বললে ভুল হবে। আবির্ভাব হল। আসনে সন্ন্যাসীকে দেখে প্রথমটায় হকচকিয়ে। গেলেন। শেষে বুদ্ধিমানের মতো বললেন, আরে আপনি? হঠাৎ কী মনে করে? এবার কোন শিষ্যের বাড়িতে উঠলেন?
কাকাবাবুর কথা বলার ধরনটাই কেমন যেন। সন্ন্যাসী মৃদু মৃদু হাসছেন।
কাকাবাবু বলেই চলেছেন, বছরে একবার করে আপনাদের তো বেরোতেই হয় সংগ্রহে। আপনার শিষ্য-সামন্তের সংখ্যা কত হবে সাধুজি? লাখ না হাজার?
উত্তরটা আমাকেই দিতে হল, উনি মৌনী আছেন।
কাকাবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, সাধুদের অনেক লোকদেখানো কায়দা আছে। অবশ্য তা না হলে শিষ্যরা ভিড়ব কেন?
সন্ন্যাসী প্যাড টেনে নিয়ে লিখলেন, ভদ্রলোককে বলো, উনি কত জ্ঞানী। আরও বলো, আমার কোনও শিষ্য নেই। আমিই শিষ্য। শিষ্য হবার চেষ্টা করছি; কারণ গুরু মিলে লাখ, তো শিষ্য মিলে এক। সময় পেলে কলকাতায় আসি পার্শ্বনাথজিকে দর্শনের জন্যে। জিজ্ঞেস করো, ওঁর ঘড়ি ঠিক চলছে তো!
