কেবল তিরস্কার আর তিরস্কার। আমার সবই খারাপ। কাকাবাবু বিশাল একটা উদগার তুলে বললেন, দেহ আর মন। দুটোকে আলাদা আলাদা রাখার চেষ্টা করবে। দেহের এক ধর্ম, মনের এক ধর্ম। এখন দেহের ধর্ম পালন করো। রাতে কোনও খাবার জুটবে না। শ্মশানেই কাটবে। এখন একটু চেষ্টা করে খেয়ে নাও। মেয়েরা এক মোহ। শরীর নষ্ট করার শ্রেষ্ঠ কল। তোমাকে পেতনিতে ধরেছিল।
আর আমার বসতে ইচ্ছে করল না মানুষটির সামনে। এখনই হয়তো কঠিন কোনও কথা বলে ফেলব। বয়সের সম্মান রাখতে পারব না। থালা নিয়ে ঝ করে উঠে পড়লুম। ধ্যাততেরিকা খাওয়া! এই ভদ্রলোকই আমাকে গৃহছাড়া করবেন। উঠে দাঁড়ালুম। হাঁটুতে খট করে একটা শব্দ হল।
অক্ষয় কাকাবাবু সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করলেন, শনি। তোমার কোষ্ঠীটা একবার ভাল করে দেখতে হবে। মনে হয় শনির দশা চলেছে। নীচস্থ শনি। জয়েন্টের শব্দ। মানে দারিদ্র্য আসছে। সব যাবে এইবার। ধন-জন-গৃহসুখ। ঘোর অমানিশা আসছে এইবার।
এ তো অভিশাপ! আমার হাত থেকে থালাটা পড়ে গেল। ভাত তরকারি সব ছিটকে গেল। কিছু পড়ল কাকাবাবুর পাতে। ভদ্রলোক চমকে উঠেছেন, একী? ইচ্ছে করে ফেললে? আমার খাওয়াটা নষ্ট করে দিলে।
কোনও উত্তর না দিয়ে আমি সোজা ঘরের বাইরে। মুকুর নীল শাড়িটা তারে ঝুলছে। শাড়িটা সে ফেলে গেছে। কাকাবাবু ঘর থেকে হেঁকে বললেন, জায়গাটা তো পরিষ্কার করা দরকার।
একটু রাগের গলাতেই বললুম, যথাসময়ে হবে।
কাঁধে একটা গেরুয়া রঙের ভিজে গামছা ফেলে তিনি বেরিয়ে এসে বললেন, এখন বুঝতে পারছি হরিদা কেন পালিয়ে গেলেন! কারণটা তুমি। তোমার তমোগুণই তাকে গৃহছাড়া করেছে।
নিজের সংযমে নিজেই অবাক। কোনওরকম মন্তব্যই আমার মুখ দিয়ে বেরোল না। শুধু বললুম, বসুন, আমি আপনার খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
কোনও প্রয়োজন নেই। ভদ্রলোক বেশ রাগতভাবেই চলে গেলেন। মনে মনে বললুম, যা, যেখানে খুশি যা, আর জ্বালাসনি। বলেই মনে হল, অন্যায় করেছি। পিতার বন্ধুকে অসম্মান করার অধিকার নেই আমার। যা হচ্ছে সবই হচ্ছে তার ইচ্ছায়। এই খেলায় আমি এক দর্শক মাত্র। এদিক-ওদিক তাকিয়ে মুকুর শাড়ির আঁচলটা হাতের মুঠোয় ধরেই ভয়ে ভয়ে ছেড়ে দিলুম। দূরের তামাটে আকাশে তিনটে চিল উড়ছে। আকাশের আঁচলের আড়ালে যে-ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন, তাঁকে বললুম, আমার মুকুকে ফিরিয়ে দিন, সে যে আমার মায়ের মতো। কে আমাকে শাসন করবে প্রতি মুহূর্তে! হেসে ফেললুম মনে মনে, হরিশঙ্কর নয়, ফিরে আসুক মুকু! মুকুর জন্যে প্রাণ যত কাঁদছে, পিতার জন্যে কই কাঁদছে না তো! মুকুর হাত ধরে পিতাকে খুঁজে পেতে চাই।
এমন যদি হত, পিতা হরিশঙ্কর হঠাৎ ফিরে এলেন, সন্ন্যাসীর সাজে। দেহ বীরের মতো, মুখ প্রেমিকের মতো। আমি আর মুকু দু’জনে এগিয়ে যাচ্ছি। তিনি হাসিমুখে দু’হাত বাড়িয়ে বলছেন, এসো এসো। আমি তো এই ভবিষ্যৎই চেয়েছিলুম। তোমরা সুখী হও। তোমাদের সুখই আমার সুখ।
নীচে গভীর গম্ভীর গলায় কে যেন বললেন, হরি নারায়ণ।
কী ব্যাপার! স্বপ্ন বাস্তব হতে চলেছে বুঝি! দুদ্দাড় করে নেমে গেলুম। এক এক লাফে ডবল সিঁড়ি। সদর দরজা মনে হয় খোলাই ছিল। টকটকে গেরুয়াধারী এক সন্ন্যাসী। চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং। অবাক হয়ে গেলুম। সেই হরিদ্বারের সন্ন্যাসী। যার শরীর থেকে পবিত্র হোমের গন্ধ বেরোয়। বহুক্ষণের সাধ্যসাধনায় যাঁর কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয় একটিমাত্র কথা, হরি নারায়ণ। সেই কতকাল আগে এসেছিলেন, মাতামহের মৃত্যুকালে। চেহারা সেই একই রকম আছে। বয়স যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রণাম করামাত্রই মাথায় হাত রাখলেন আমার। সারাশরীর যেন অবসন্ন হয়ে গেল। আলসার-এর পেটে শীতল দুধ পড়লে যেমন স্নিগ্ধ একটা অনুভূতি হয় সেইরকম হল। তাপিত প্রাণে করুণাধারার মতো নীরব আশীর্বাদ। মনে হচ্ছিল, পায়ে মাথা ঠেকিয়ে পড়ে থাকি যতক্ষণ পারি। আর উঠব না। হিমালয়ের কোলে এইভাবেই শুয়ে থাকি। ভব-রোগ-বৈদ্য এসেছেন কৃপা করে।
সাদরে তাকে নিয়ে এলুম ওপরে। পায়ে সেই পরিচিত গেরুয়া রঙের ন্যাকড়ার জুতো। জুতোজোড়া একপাশে খুলে রেখে ঘরে ঢুকলেন। তাড়াতাড়ি একটা কম্বলের আসন বিছিয়ে দিলুম চেয়ারে। তিনি বসলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন জ্যোতির্ময় মুখে। গেরুয়া কুর্তার পকেট থেকে একটা প্যাড আর পেনসিল বের করে লিখলেন কী সব। বুঝলুম মৌনী হয়েছেন। লেখাটা আমার হাতে দিলেন। পরিষ্কার ইংরেজি ইউ আর গোয়িং থু এ ক্রাইসিস।
ইয়েস। লেখাটা এগিয়ে দিলুম তাঁর দিকে।
লিখে লিখেই আলাপ চলল। প্রশ্ন করলুম, হিমালয়ের কোনও তীর্থে আমার পিতাকে কি দেখেছেন?
ওভাবে তো দেখা হয় না। বিশাল জায়গা। বেশিরভাগ সময় আমি আমার ডেরাতেই থাকি।
আমার পিতা কি ফিরে আসবেন? তিনি কি জীবিত আছেন?
সংসার যে ছেড়ে যায়, মুক্তজীবনের স্বাদ যে একবার পায়, সে কি আর বদ্ধজীবনে ফিরতে চায়!
সাধুজি, আমি তা হলে কী করব?
তুমি তার আদর্শের প্রদীপটি ধরে রাখো। দেখো যেন নিবে না যায়!
সন্ন্যাসী লিখলেন : Observe what a man has in mind to do when his father is living, and then observe what he does when his father is dead. If for three years, he makes no changes to his fathers ways, he can be said to be a good son–Confucious.
