মুকু নামছে সিঁড়ি দিয়ে। কাঁধের কাছে হাত রেখে কোনওরকমে বললুম, আমাকে ছেড়ে এইভাবে চলে যাচ্ছ মুকু? আমার যে কেউ নেই।
মুকু এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। জল-ভরা দুটি চোখ। পাতলা ঠোঁটদুটি থিরথির করে কাপল কয়েকবার। কোনও বাণী ফুটল না। যেন পাখির ছানা, ওড়ার চেষ্টা করেও উড়তে পারল না।
২.২৩ If your only tool is a hammer
অসহায় শিশুটির মতো সদরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম মুকুর চলে যাওয়া। বিলিতি সুটকেস হাতে সোজা হেঁটে চলেছে রিকশা স্ট্যান্ডের দিকে। মনে হচ্ছিল ছুটে গিয়ে জাপটে ধরি পেছন দিক থেকে। শিশু যেভাবে জড়িয়ে ধরে মায়ের কোমর। জীবনের অক্ষমতা কাঁদিয়া করিব নিবেদন,/মাগিব অনন্ত ক্ষমা। হয়তো ঘুচিবে দুঃখনিশা,/তৃপ্ত হবে এক প্রেমে জীবনের সর্বপ্রেমতৃষা। অভিমান এক দুর্ভেদ্য পাঁচিল। মুকু রিকশায় উঠে বসল, পায়ের কাছে সুটকেস, দু’হাতে হাতলটা ধরে রেখেছে সামনে সামান্য ঝুঁকে। চওড়া পিঠ। আকাশি রঙের ব্লাউজ। এলো খোঁপা। তাকানো মাত্রই ভেতরের নিবে-আসা আগুন আবার জ্বলে উঠল। অসম্ভব! মুকুকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য, অর্থহীন। সিঁড়ি-ছাড়া বহুতল বাড়ির মতো। রিকশা চলতে শুরু করামাত্রই আমি ছুটতে শুরু করলুম। একটা সাইকেল পেছন দিক থেকে আমাকে প্রায় ধাক্কা মেরেই চলে গেল। রিকশাটাকে থামালুম।
মুকুর হাতটা চেপে ধরলুম। গায়ে হাত রেখেই বুঝলুম, মুকুর বেশ ভালই জ্বর হয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। নাকের ডগায় মতিচুরের মতো ঘামের বিন্দু। মধ্যদিনের দীপ্ত সূর্য ঝলসে দিচ্ছে চারপাশ।
মুকু দাতে দাঁত চেপে বললে, রাস্তায় নাটক কোরো না। ইচ্ছে থাকলে অনেক আগেই আমাকে আটকাতে পারতে!
ভেতর থেকে একটা হাহাকার বেরিয়ে এল, আমার কেউ নেই মুকু। তুমি ছাড়া।
রিকশার চালক সিটে বসে আছে একটু তেরছা হয়ে। প্রবীণ মানুষ। আমার চেনা। নাম, জগাদা। জগাদা আড়চোখে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হঠাৎ বললে, কাজটা ভাল হচ্ছে না।
কোন কাজ! প্রশ্ন করার সময় নেই। মুকু বললে, হাত ছাড়ো। বেরিয়ে যখন পড়েছি আর ফেরাতে পারবে না।
ওই ভদ্রলোকের ব্যবস্থা আমি করছি।
কিছুই করতে পারবে না, কারণ লাঠি ছাড়া তুমি চলতে পারবে না। মনের দিক থেকে তুমি পঙ্গু।
জগাদা বললে, তা হলে আমি চালাই!
মুকু বললে, হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন। এখুনি লোক জড়ো হয়ে যাবে।
রিকশার চাকাটা আমার পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেল। মুকু একবার ফিরে তাকাল না! এই হয়। এরই নাম জগৎ। এরই নাম দুনিয়াদারি! সামান্য পান থেকে চুন খসলেই সব সম্পর্ক ফরদাফাঁই। মুকুর যত রাগ আমার ওপর। এই কি রাগ করার সময়! বেশ রাগই না হয় করলে, তা বলে ছেড়ে চলে যাবে? সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। রাজপথ নির্জন। খাঁখা রোদ। বন্ধ দোকানের রকে ছায়ায় শুয়ে হাহা করছে একটা কুকুর। অসহায় অনাথ বালকের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। পায়ের পাতার ওপর দিয়ে রিকশা চলে গেছে। জ্বালা করছে ভীষণ। আশ্চর্যই বটে। হায় মন, পিতা হরিশঙ্কর চলে যাওয়ায় এতটা অসহায়বোধ করিনি। হঠাৎ শূন্য মনে ভেসে উঠল একটা কবিতা :
বাসনার লক্ষ্যে তুমি যাত্রী? তবে থেমো না নিখিলে,
স্বয়ং লাইলি যদি সঙ্গী হয় বোসো না মহফিলে।
তুমি ঝরনা বয়ে চলো, তূর্ণগতি নদী হও তুমি,
তীর যদি পাও, তবু ছুঁয়ো নাকো সেই তীরভূমি।
হারিয়ে যেয়ো না, তুমি এ বিশ্ব-মন্দির মাঝে কোথা,
চিরমুক্ত তুমি বন্ধু, আসরেতে বোসো না অযথা।
কুকুরটা হঠাৎ ঝাড়াঝুড়ি দিয়ে রক থেকে নেমে এসে, আমার সামনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে লাগল পুটুসপুটুস করে। এই তো আমার ব্যথার ব্যথী। চিনতে পেরেছে। একজন ফেরিঅলা ধুঁকতে ধুঁকতে চলে গেল আমার পাশ দিয়ে। কোনওরকমে হাঁকছে, পানি ফলঅ, পানি ফলঅ।
ধীরে ধীরে ফিরে এলুম বাড়িতে। দোতলায় উঠতেই অক্ষয় কাকাবাবু বললেন, অতটা নরম হোয়ো না। পেছন পেছন ছোটার প্রয়োজন ছিল কি?
একজন না খেয়ে এই ভরদুপুরে চলে যাচ্ছে!
তাতে কী? ডোন্ট মেক ইয়োরসেলফ সো চিপ।
পিতা হরিশঙ্করও ঠিক এই কথাই বলতেন; কিন্তু তার একটা বিশাল হৃদয় ছিল। মানুষের দুঃখ বুঝতেন। অসহায়কে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। কারওকে অপদস্থ করতেন না। রাজসিক অহংকার ছিল। তামসিক নয়। আমার সামনে শ্মশ্রুমণ্ডিত ছ’ফুট যে দৈত্যটি পঁড়িয়ে আছেন, তাঁকে চেনা খুব কঠিন।
আমি নীরবে সরে এলুম। হুড়হুড় করে অক্ষয় কাকাবাবুর চান শুরু হল। সঙ্গে সংস্কৃত স্তোত্র। ভারী গলার আওয়াজে বাড়ি কাঁপতে লাগল। প্রবল একটা শক্তি। সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল আহার-পর্ব। সে এক বিশাল ব্যাপার। ভদ্রলোক একাহারী। সেই কারণে– সবই বেশিবেশি। ডাল-ভাতের তাল দেখে মাথা ঘুরে গেল। যেন ছোট মাপের একটা বল। এই সেই মানুষ, যিনি আগে নিমন্ত্রণ বাড়িতে এক বালতি পোলাও অক্লেশে মেরে দিতেন। তারপর সারারাত ছাদে চিত হয়ে শুয়ে মুখে ড্রপারে করে ফোঁটা ফোঁটা জল ঢালতেন। জলের মাত্রা বেশি হলে পেট ফেটে যাবে। পিতা হরিশঙ্কর বলতেন, এইভাবেই একদিন অকালে মরবে, বেশি খেতে চাও তো কম খাও, আর কম খেতে চাও তত বেশিই খাও! খাওয়াটাই অক্ষয় কাকাবাবুর বীরত্ব।
আমিও বসেছি, কিন্তু মুখে কিছু তুলতে পারছি না। দিদির কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে মুকুর কথা। মেয়েটা কেমন একা একা চলে গেল! সকাল থেকে একফোঁটা জলও তার মুখে পড়েনি। কোথায় গেল? আবার কি সেই হস্টেলে? না কোনও বন্ধুর বাড়িতে? কে এক সত্যেনের নাম কয়েকবার তার মুখে শুনেছি। সহপাঠী। জমিদারের ছেলে। আলিপুরে বাগানবাড়ি। তার ঠাকুরদা ছিলেন বিখ্যাত শিকারি। সত্যেনের বাবা একালের একজন বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। মুকু কি সেই সত্যেনের বাড়িতে গেল! একটু যেন প্রেম-প্রেম ভাব আমার মনে হয়েছিল। তা না হলে সত্যেনের অত প্রশংসা করবে কেন? যিশুর মতো রূপ। শিশুর মতো মন। ভাল না বাসলে মানুষ মানুষের নির্ভেজাল প্রশংসা করতে পারে না। মুকু ইদানীং আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিল।
