আমি উঠে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। বিশাল শরীর। একসময় প্রচণ্ড ব্যায়াম করতেন। তাঁর হাতদুটো ধরে বললুম, ঠিকই বলেছেন, আমার মনে পাপ ঢুকেছে। আপনি যা বলবেন, আমি তাই করব। তর্ক করেছি বলে ক্ষমা চাইছি।
দুকাপ চা নিয়ে টিপ ঢুকছে। আমাদের নাটক থেমে গেল। টিপ চায়ের কাপ হাতে তুলে দিতে দিতে বললে, একেবারে খালি পেটে চা খাবেন? কিছুই যে আর খুঁজে পেলুম না।
কাকাবাবু টিপের মাথায় হাত রেখে বললেন, তুমি বড় ভাল মেয়ে, সর্বসুলক্ষণা। তোমার চন্দ্র তুঙ্গী। তোমার লেখাপড়া খুব ভাল হবে। তোমার মন সরল। সেখানে সবসময় উচ্চ চিন্তা খেলা করবে।
টিপ ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে রইল কাকাবাবুর মুখের দিকে।
কাকাবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, তোমার মা সংসারের লক্ষ্মী। বলশালী মঙ্গল। লটারি পাবার সম্ভাবনা আছে।
টিপ আমতা আমতা করে বললে, মাকে ডাকব?
আজ নয়। একদিন তোমাদের বাড়িতে গিয়ে ভাল করে সব দেখে, যা বলার বলব। শুধু শুনে রাখো, তোমরা দু’জন যেখানে থাকবে, সেই জায়গা স্বর্গ হয়ে থাকবে।
কথা বলতে বলতে কাকাবাবু কেঁদে ফেললেন। এমন আবেগপ্রবণ মানুষ আমি দেখিনি। প্রশ্ন করলুম, কাকাবাবু, আপনি কাঁদছেন কেন?
আনন্দে। ভাল কিছু দেখলে আমার ইমোশন আমি সামলাতে পারি না। এই মেয়েটির চুল দেখেছ, মুখের গড়ন দেখেছ, বাদামের মতো চোখ, ভুরু দেখেছ, হাতের আঙুল দেখেছ, পায়ের পাতা দেখেছ, শরীরের শ্রী দেখেছ? জ্যান্ত সরস্বতী।
কাকাবাবুর চোখে আবার জল এসে গেল। আমার শরীর জ্বলতে লাগল। কাকাবাবুর এই উচ্ছ্বাসের কারণ আমি জানি। আমাকে প্রকারান্তরে জানাতে চাইছেন, তোমার মুকু টিপের পায়ের নখের যোগ্য নয়। টিপের সব ভাল। লক্ষ্মী সরস্বতী কমবাইন্ড। মুকুর সবটাই অলক্ষণের। মুকু অপয়া, টিপ পয়া। তুমি দেখে দেখে এমন এক মেয়ের পাল্লায় পড়লে কেন? এখুনি ওকে বিদায় করো। বেরিয়ে এসে ওর খপ্পর থেকে। সমস্ত তিরই ছোঁড়া হচ্ছে আমাকে লক্ষ্য করে। আমাকে লজ্জা দেবার জন্যে। আমার অপদার্থতা প্রমাণ করার জন্যে। এইসব কায়দা আমার জানা আছে। আমি আর বসতে পারলুম না, ঘরের বাইরে চলে এলুম। এই মানুষটির অদ্ভুত জীবন আমি বুঝতে পারি না। নিজের সংসার ফেলে অন্যের সংসার সামলাতে ছোটেন। অযাচিত উপদেশ দেন সব মানুষকে।
চা শেষ করে কাকাবাবু রান্নায় লেগে গেলেন। মুকুকুটনো কুটে বাটনা বেটে একটু সাহায্য করতে চেয়েছিল। হাঁ হাঁ করে তেড়ে গেলেন, কোনও প্রয়োজন নেই, কোনও প্রয়োজন নেই। কোনও কোনও শাশুড়ি পুত্রবধূকে এইভাবে খেদিয়ে দেন। মুকুকে অপমান করা মানে আমাকেই অপমান করা। মুকু আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকাল। এ-ও সেই চোখ, যে-চোখে দিদি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আমি তো তোমারই আশ্রয়ে এসেছিলুম ভাই। তফাত এই, মুকু আমাকে একটা কথাও বললে না। পরিস্থিতির কাছে কীভাবে আমি বিকিয়ে গেছি! কাকাবাবুকে আমি জোর গলায় বলতে পারছি না এ বাড়ি আমার, সংসার আমার, হু আর ইউ! দিদির ডেডবডি আসবে। সৎকারের পরেও ঝামেলা শেষ হবে না। হারের সমস্যা। হার হাড় হয়ে গলায় ফুটে আছে। আমি অসহায়।
মুকু ঘরে গিয়ে সুটকেস গুছোচ্ছে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি মাত্র। হয়তো বলতেও চেয়েছিলুম, মুকু, কিছুক্ষণের জন্যে একটু সহ্য করো। মুকু আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিলে। খুবই খারাপ লাগল। আমি যেন একটা পিংপং বল। একবার এ এদিক থেকে মারছে, তো ও ওদিক থেকে। মুকুর অন্তত বোঝা উচিত ছিল, আমি কোন অবস্থার শিকার।
ঘরের বাইরে চলে এলুম। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা আর করব না। এবার যা কিছু ঈশ্বরের সঙ্গে। বিশ্বাস কোনও বুদ্ধিগ্রাহ্য মানসিক অবস্থা নয়। ফেথ ইজ নট ইন্টেলেকচুয়াল। পাহাড় চূড়া থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ মারার মতো একটা সমর্পণ। যা করার তুমি করো। মানুষকে আর তেল দেব না। মানুষের অনেক বাহানা, অনেক বায়নাক্কা। টিপ আর বউদি দু’জনেই এইবার যাবে। মুকুর সঙ্গে দেখা করতে চায়। মুকু ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। দুজনেই মনমরা হয়ে সিঁড়িতে নামছে। টিপ আমার ডান হাতটা ধরে বললে, আমরা আবার আসব।
আমি কোনওরকমে ঘাড়টা নাড়লুম মাত্র। মনের পিত্ত হয়েছে। জীবনটা তেতো লাগছে। সবকিছু অর্থহীন তামাশা। একটু পরেই মুকু বেরিয়ে এল, শাড়িটাড়ি পরে একেবারে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত। হাতে সুটকেস।
আমি পথ আগলে বললুম, চললে কোথায়?
তোমার জানার কোনও প্রয়োজন নেই।
কেন নেই?
তুমি বেশ ভালই জানো, কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি?
এই সময় রাগারাগিটা না করলেই নয়?
কেন? এটা কোন সময়?
তোমাকে বোঝাতে হবে? আমার কে আছে বলো?
কেন? তোমার ওই কাকাবাবু আছেন। তোমার সর্বসুলক্ষণা টিপও আছে, তার মা আছে, তুমি নিজে আছ। প্রশ্নটা বরং আমারই করা উচিত নিজেকে। আমার কে আছে?
আমি আছি।
তুমি? তুমি হলে এ যুগের হ্যামলেট। সারাটা জীবন শুধু টু বি অর নট টু বি করে যাও। তুমি হলে নাচের পুতুল। ঝড়ের এঁটো পাতা।
এঁটো পাতা শব্দটা তিরের মতো ফুটল। আমি এঁটো পাতা! হরিশঙ্করের পুত্র আমি। যাও তোমার যেখানে যেতে ইচ্ছে করে সেইখানেই যাও। সারাজীবন অনেকের কাছে অনেক নাকে কেঁদেছি। পায়ে পায়ে ঘোরার চেষ্টা করেছি লেজ-তোলা বেড়ালের মতো। মন দেখার মতো কেউ নেই। সবাই বাইরেটা দেখে। আমার বলতে ইচ্ছে করছিল, মুকু, ভালবাসা বোঝো? তারপরেই মনে হল, প্যানপ্যানে শোনাবে। ভালবাসা শব্দটাই ভালবাসার শত্রু। ভালবাসা একটা ভাবমিশ্রিত, সেবা, সাহচর্য, অবস্থিতি, সহ্যশক্তি। হাত ধরে নীরবে হাঁটা। ওটা বোধের ব্যাপার, বলার নয়।
