যদি রেগে যান?
রাগবেন কেন?
বউদি উঠে গেলেন। সোজা কাকাবাবুর সামনে গিয়ে পা স্পর্শ করে নমস্কার করলেন। কাকাবাবু আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে হাত তুললেন।
বউদি বললেন, উনুন ধরিয়ে আগে আপনাদের একটু চা করে দিই।
আমি জানি কাকাবাবু চা ভীষণ ভালবাসেন। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, মুখের ভাব নরম হল। প্রশ্ন করলেন, আপনি কে?
আপনি বলবেন না। তুমি বলুন। আমার স্বামী পিন্টুকে ভীষণ ভালবাসেন।
কাকাবাবু বললেন, বুঝেছি। একটু চা হলে মন্দ হয় না। আমি উনুনটা ধরিয়ে দিই।
আমরা থাকতে আপনি উনুন ধরাবেন? আপনি শান্ত হয়ে একটু বসুন। আমরা সব করে দিচ্ছি। রান্নাও আমরা করে দেব।
কাকাবাবু বললেন, ওইখানেই আমি একটু গোলমাল করে রেখেছি, স্বপাক ছাড়া আমি কিছু খেতে পারি না। আমার গুরুর নির্দেশ। একটু আগে থানার দারোগা আমাকে খুব চিকেন মাটনের লোভ দেখাচ্ছিলেন।
বউদি বললেন, স্বপাক খুব ভাল। আমার বাবাও স্বপাকে খান। তবে ভাত ছাড়া তরকারি অন্যের হাতে খাওয়া চলে।
কাকাবাবু এইবার হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, বউমা, রান্না করতে আমার কোনও কষ্ট হয় না। রাঁধতে আমি ভালই বাসি। তুমি চিন্তা কোরো না। তুমি চা করো। বাকিটা আমরাই করে নোব।
কাকাবাবু ইশারায় আমাকে ডেকে ঘরে নিয়ে গেলেন। মুকুর দিকে তাকাচ্ছেনই না। আমার খুব খারাপ লাগছে। সে এমন কী করেছে যে তাকে এইভাবে হেয় করতে হবে। একটা চেয়ারে তিনি বসলেন। আমাকে বললেন, বোসো।
দু’জনেই চুপচাপ বসে রইলুম কিছুক্ষণ। হঠাৎ কাকাবাবু বললেন, তোমার প্ল্যানটা কী?
প্ল্যান মানে?
তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাটা কী?
কোনও উত্তর দিতে পারলুম না। আমার তো কোনও পরিকল্পনাই নেই। ঘটনা যেদিকে নিয়ে যায় ঠেলতে ঠেলতে।
কাকাবাবু বললেন, তোমার পরিকল্পনা হল, ডেস্ট্রাকশন ধ্বংস। তুমি ক্লীব হয়ে যাচ্ছ। মেয়েদের সঙ্গে অষ্টপ্রহর থাকলে পুরুষ ক্রমশ ভেড়া হয়ে যায়। আমার কথা শুনবে?
বলুন।
ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করো, সে এখানে কেন আছে? কীসের জন্যে আছে? একটা যুবক ছেলে একটা যুবতী মেয়ে একসঙ্গে রয়েছে, বাড়িতে তৃতীয় আর কোনও প্রাণী নেই। এ কেমন কথা? এতটা অনাচার, এতটা স্বাধীনতা কি ভাল? তোমার কী মনে হয়?
আমি মনে মনে হাসলুম। ভদ্রলোক কিছুই জানেন না। মুকুর চরিত্র সম্পর্কে মানুষটির কোনও ধারণা নেই। মানুষের চিন্তা বাঁধা রাস্তা ধরেই চলে। সহজ হিসেব, দুই আর দুয়ে চার।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আপনি কিছু জানেন না।
বলেই চমকে উঠলুম, উত্তরটা বড় উদ্ধত হল। ভয়ংকর অসম্মানজনক। তাই তাড়াতাড়ি যোগ করলুম, মুকুর চরিত্র আমার বাবার চেয়েও কঠোর। সে এখানে আছে, তিনি নেই বলে। আমাকে ধরে রেখেছে, যাতে আমি টলে না যাই।
স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ংকরী বলে একটা প্রবাদ আছে শুনেছ? নিজের সিদ্ধান্ত নিজে করার মতো বয়স তোমার হয়নি? তুমি কি এখনও নাবালক?
কাকাবাবু, ক’টা লোক নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে! পরামর্শ শব্দটা তা হলে আসত না।
মেয়েছেলের পরামর্শ!
কেন মেয়েরা কম কীসের?
জানো, মেয়েদের শাস্ত্রে অধিকার নেই।
কোন শাস্ত্র? সংসার-শাস্ত্রে মেয়েদের দ্বিতীয় আছে? বেদ-বেদান্ত নিয়ে কে মাথা ঘামায় কাকাবাবু?
শোনো, বাঁচতে যদি চাও ওকে বলো ওর জায়গায় ফিরে যেতে, আর তুমি বাড়িতে একটি তালা ঝুলিয়ে কিছুকালের জন্যে সরে পড়ো। তা না হলে বিপদে পড়ে যাবে। চাকরিবাকরি ছেড়ে দিয়েছ?
না ছাড়িনি, তবে ছাড়ব।
ছেড়ে?
দেখা যাক।
আমার ইন্টারফিয়ারেন্স তোমার ঠিক সহ্য হচ্ছে না, তাই না? হরিশঙ্করদার পরামর্শও তোমার পছন্দ হত না। জানো কি তোমার হাতে গার্ডল অফ ভেনাস আছে?
দেখুন জ্যোতিষে আমার তেমন বিশ্বাস নেই। যা আছে তা আছে। যা হবে তা হবে। আমি ভগবানকে বিশ্বাস করি। আত্মসমর্পণে বিশ্বাস করি। যা করার তিনি করবেন। তিনি করছেন।
তা হলে তুমি মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করো, চাকরিবাকরি ছেড়ে উচ্ছন্নে যাও, বিষয়সম্পত্তি বেচে দাও। ঘি আর আগুন পাশাপাশি থাকলে যা হয় তাই হোক। তুমি কি নিজেকে জিতেন্দ্রিয় ভাবো?
আমি জিতেন্দ্রিয় নই। মুকু জিতেন্দ্রিয়।
মেয়েদের তুমি কিছুই চেনো না। যখন ফেলে দেবে তখন আর উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা থাকবে না। তোমার অবস্থা এখন অরক্ষিত সীমান্তের মতো। হুহু করে শত্রু ঢুকছে। রাজত্ব দখল হয়ে গেল বলে।
দেখাই যাক না, আপনার জ্যোতিষী জেতে না আমার আত্মবিশ্বাস!
কাকাবাবু বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, বিপদ আর ধ্বংস আসার আগে মানুষ বুদ্ধিভ্রংশ হয়, তোমারও তাই হয়েছে। আমার কথা যখন শুনবেই না, তখন আমারই বা কী দরকার পড়েছে বৃথা সময় নষ্ট করার! আগে তুমি গুরুজনদের ভক্তিশ্রদ্ধা করতে। তোমার সেই ভাবটাও চলে গেছে। কাম এক প্রবল রিপু। তোমাদের এই বয়েসটা তো ভাল নয়, তায় মাথার ওপর কেউ নেই। সোনায় সোহাগা।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কাকাবাবু। নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, আমার তা হলে এখন কী করা উচিত? যেচে অপমানিত হওয়া, না কি নিজের মানসম্মান গুছিয়ে নিয়ে সরে পড়া!
এইবার আমি একটু ভয় পেয়ে গেলুম। থানার দৃশ্য ভেসে উঠল। সন্ধের সময় ডেডবডি আসবে। ডেলিভারি নিতে হবে। ডেথ সার্টিফিকেট, শ্মশান। দারোগা যদি আবার পাঁচ মারে! একেবারে একা আমি। চারপাশ থেকে হিমশীতল ভয় আমাকে ঘিরে আসছে। এতক্ষণ নেশার ঘোরে তর্ক করছিলুম। অক্ষয় কাকাবাবুর জীবন সন্ন্যাসীর জীবন। নিজের কোনও সংসার নেই। যে-সংসার যখন বিপদে পড়ে ছুটে গিয়ে হাল ধরেন। জীবনের রোজগার সবই পরার্থে। কোনও কিছুর ওপর নির্ভরশীল নন।
