ব্যাঙ্কের কাউন্টারে গিয়ে চেক জমা দিয়ে হাতে একটা টোকেন নিয়ে ঘিজিমিজি ভিড়ে বেঞ্চের একপাশে সরে এসে বসে আছি জড়োসড়ো হয়ে। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সারারাত ঘুম নেই। দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা। ডাক পড়ল। চেক ফিরে এসেছে। সই মেলেনি। আবার সই করুন। চেকটা হাতে নিয়ে একপাশে সরে এসে ভাবছি, জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে কী সই ছিল, পুরো নাম, না ইনিশিয়াল! একা একা এই আমার প্রথম টাকা তোলা।
পাশে এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। প্রথমে গ্রাহ্য করিনি। হাতের ওপর ফরসা একটা হাত এসে পড়ল। অবাক কাণ্ড, মুকু। তুমি! তুমি এলে কী করে?
সাইকেল রিকশা করে। বাড়ি চলল। তোমার টাকা পাওয়া গেছে। তুলতে হবে না।
কোথায় ছিল?
আস্তে! আস্তে কথা বলো। চলো, বলছি।
২.২২ ভীষণ তৃষ্ণার্ত আমি
সবই অদ্ভুত। কোথা থেকে কী হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। টাকাটা বেরোল কোথা থেকে? আলমারিতে কাপড়ের ভাজে ছিল না। ছিল রান্নাঘরের তাকে, একটা খালি কৌটোর ভেতরে। কারণটা কী? কে সরিয়েছিল ওখান থেকে এখানে!
মুকু আর আমি দু’জনেই এলিয়ে পড়েছি বারান্দার মেঝেতে। সামনেই বিবর্ণ রেলিং। গাছপাতার আড়ালে আড়ালে ফালি ফালি নীল আকাশ। আমাদের শরীরে আর এক বিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট নেই। মনের জোরটাই এখন আমাদের মেরুদণ্ড। আলগা হয়ে গেলেই শুয়ে পড়ব। হরিশঙ্করের ছেলে বলেই বসে আছি। মুকু বসে আছে হরিশঙ্করকে গুরু বলে মানার ফলে। সেই শক্তির নদী থেকে আঁজলাভর তুলে পান করেছে বলে।
দু’জনে দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছি। যেন আকাশ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আমার মনে যে অনুভূতি খেলা করছে তা বড় অদ্ভুত। যেন আমরা দুজনে স্বামী-স্ত্রী। এইমাত্র আদালতের রায় আমাদের হাতে এসেছে–বিবাহবিচ্ছেদের রায়। একটু পরেই আমাদের সম্পর্ক, সংসার সব ভেঙে যাবে। দুদিনের তরে মিলেছিলুম। দু’দিনের খেলা শেষ।
মুকু বললে, আমার কী মনে হচ্ছে জানো, দিদি ছিলেন এক অসাধারণ চরিত্রের মহিলা। তিনি আমাদের বাঁচাতেই চেয়েছিলেন। গগনকে যখন পাখা দিয়ে পেটাচ্ছিলেন তখন ওই টাকাটা গগনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। টাকাটা গগনই আলমারির তালা ভেঙে হাতিয়েছিল। আর গগনই দিদিকে কায়দা করে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। আমরা আমাদের বন্ধুকে শত্রু ভেবে কী অন্যায়টাই করে ফেললুম! আর তো তাকে ফেরানো যাবে না।
সদর খোলাই ছিল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। একজোড়া পা উঠে আসছে ওপরে। প্রথমে টিপ। পেছনে টিপের মা। পা টিপে টিপে দু’জনে এগিয়ে আসছেন। কারও মুখে কোনও কথা নেই। উদ্বেগ-মাখানো মুখ। কোনও শব্দ না করে নিঃশব্দে দু’জনে মুকুর দু’পাশে বসলেন। আমি কোনওরকমে সামান্য একটু হাসি আনার চেষ্টা করলুম। ফল হল উলটো। এতক্ষণের জমাট কান্না গলে বেরিয়ে এল। কিছুতেই আর থামাতে পারলুম না নিজেকে। টিপের মা এগিয়ে এসে আমার কাঁধে একটা হাত রাখলেন। কমলালেবু রঙের শাড়ি। সবে স্নান করেছেন। পিঠে ছড়িয়ে আছে এলো চুল। ছোউ কপালে সিঁদুরের টিপ। চুলের তেলের মিষ্টি গন্ধ। ফরসা হাতে মোটা শাখা। মনে হল আমার মা এসেছেন। তিনি কোনওরকম সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন না। তার নরম ভারী হাত আমার পিঠ বেয়ে নামছে আর উঠছে। আর আমার ভেতরটা ফেটে যাওয়ার মতো হচ্ছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। শাড়ির আঁচলের একটা কোণ দিয়ে তিনি আমার চোখ মোছাতে লাগলেন। বহুকাল পরে এই প্রবল দুঃখের মুহূর্তে আমি যে স্নেহ পেলাম, তা যেন নদীর মতো। ভোরবেলা মুকুলিত। আম্রকুঞ্জে গেলে যে অনুভূতি হয় সেইরকম এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে আমার মনে। শীতল পূর্ণচন্দ্রের দিকে তাকালে এমন হয়। বহু ক্রোশ হেঁটে ক্লান্ত সন্তান ফিরেছে মায়ের কোলে। মনে হচ্ছে, কোলে মাথা রেখে তলিয়ে যাই গভীর ঘুমে। যেমন করে ঝিনুক তলিয়ে যায় সমুদ্রের অতলে।
এমন একটা নীরব সভা তছনছ হয়ে গেল। মূর্তিমান দৈত্যের মতো উদিত হলেন অক্ষয় কাকাবাবু। এগিয়ে আসতে গিয়ে থমকে গেলেন। এত মেয়ের মাঝে কেন বসে আছি আমি? আমাকে জড়িয়ে ধরে আছেন এক মহিলা। এ তো ভয়ংকর অপরাধ! অক্ষয় কাকাবাবুর হাতে একটা ব্যাগ। ব্যাগটা নতুন। ব্যাগ কিনে বাজার করে ফিরেছেন। কাঁধে একটা নতুন গামছা। কোনও কথা না বলে একপাশ দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন রাগরাগ মুখে।
টিপের মা সরে বসলেন। টিপই প্রথম কথা বললে, আমরা ছুটে এসেছি রান্নাবান্নার ব্যবস্থা দেখতে। এই অবস্থায় তো আপনারা কিছু করতে পারবেন না। উঠুন, চানটান করুন। সকালে চা-টা। কিছু খেয়েছেন?
প্রথমে মনে হল মিথ্যে কথাই বলি। মুকু কিছুই খায়নি, আমি থানায় পাঁচনের মতো এক কাপ চা কোনওরকমে গিলেছি। উত্তর আর আমাকে দিতে হল না। কাকাবাবু গম্ভীর গলায় ডাকলেন, এদিকে উঠে এসো। নষ্ট করার মতো সময় নেই। আসল কাজই বাকি। সারারাত শ্মশানে জাগতে হবে।
টিপের মা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কে উনি?
আমি ফিসফিস করে বললুম, আমার বাবার বন্ধু। আজই হঠাৎ এসেছেন। আসায় খুব উপকার হয়েছে। আমরা তো খুব বিপদে পড়েছিলুম।
আমরা তো কিছুই জানি না। এইমাত্র শুনলুম। শুনেই ছুটে এসেছি। রান্নার ব্যবস্থা করব, আগে একটু চা খাবে?
আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, জানি না। আমরা এখন কাকাবাবুর হাতে।
ওঁকে জিজ্ঞেস করব?
