কাকাবাবু আর দারোগাসায়েব কেউই অফিসঘরে নেই। সেকেন্ড অফিসার বললেন, দুজনেই কোয়ার্টারে। যান না, চলে যান। পাশের গলিতে ঢুকলেই দোতলার সিঁড়ি।
বারান্দায় বসে আছেন দু’জনে মুখোমুখি। কাকাবাবুর হাতে সেই পরিচিত লেন। দরজার সামনে এক রাগী চেহারার ভদ্রমহিলা। দারোগাবাবুর স্ত্রী। মাঝে মাঝেই স্বামী সম্পর্কে একটা-দুটো মন্তব্য ছুড়ছেন। প্রথম যেটা কানে এল তার ভাবার্থ, গাধারাও নাকি ওই ভদ্রলোকটির চেয়ে বুদ্ধিমান।
কাকাবাবুর কানে কানে বললুম, একটা চিঠি পেয়েছি।
চিঠিটা তার হাতে দিলুম। টেবিলের আড়ালে কোলের ওপর রেখে দ্রুত পড়ে নিলেন।
কানে কানেই বললুম, আর টাকা দেওয়ার প্রয়োজন আছে? হারটাও চেয়ে নিন।
কাকাবাবু চিঠিটা এগিয়ে দিলেন অফিসারের দিকে। দিয়ে বললেন, কেসটা মনে হয় একটু সহজ হল। এটা হত্যা নয়, আত্মহত্যাই। আর হারটাও আমাদের সম্পত্তি।
দারোগাবাবু চিঠিটা পড়লেন ভুরু কুঁচকে। তারপর একটা প্যাঁচ মারলেন, দিদি কে? নাম কোথায়? সবাই তো দিদি। কোন দিদি? এই চিঠিটা তো ম্যানুফ্যাকচার্ড হতে পারে!
কাকাবাবু বললেন, হাতের লেখা মেলান।
হাতের লেখা পাব কোথায়? বেশ বললেন যা হোক!
আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। বললুম, পুঁটলিতে একটা পকেট গীতা আছে। তার মধ্যে। হাতের লেখা থাকতে পারে।
দারোগাসায়েব হেসে বললেন, অশান্তি করে লাভ কী? কেস তো ফয়সালা হয়েই গেছে। তবে হারটা আমাদের কাস্টডিতেই থাকবে। ওটার জন্যে সেপারেট ইনভেস্টিগেশন। অমন একটা মূল্যবান জিনিস এমন একজন রেচেড মহিলার অধিকারে আসে কী করে? একটা সাধারণ সাদামাটা হার হলে কিছু বলার ছিল না। তা ছাড়া এর পেছনে আর একটা আনোন লোকের কানেকশন আছে। দেখতে হবে কোনও থানায় কোনও কেস জমা পড়ছে কি না? উই আর টু ওয়েট। আমাদের একটা রেসপন্সিবিলিটি আছে। নিন আমার স্ত্রীর হাতটায় ঝপ করে একবার চোখ বুলিয়ে নিন।
কাকাবাবু বললেন, টাকাটা কি তা হলে দেওয়ার প্রয়োজন আছে?
অবশ্যই আছে। খরচ নেই? কত খরচ! গলায় দড়ি কি যে-সে জিনিস মশাই? ক’টা গলায় দড়ি দেখেছেন?
কাকাবাবু আমার হাত থেকে টাকাটা নিয়ে ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেটা চালান করে দিলেন স্ত্রীর হাতে। যেমন দ্যাবা তেমনি দেবী। তিনি যেন কপ করে মিড অনে একটা ক্যাচ ধরলেন। মুকুর দেড় হাজার আউট হয়ে গেল। ওই টাকাটা এখুনি আমাকে যেমন করেই হোক জোগাড় করে মুকুকে ফিরিয়ে দিতে হবে। একমাত্র উপায়, ব্যাঙ্কে চলে যাওয়া।
দারোগাসায়েব আমাকে জানালেন, আপনি এখন আসতে পারেন, আমাদের একটু অ্যাস্ট্রলজি হবে।
কাকাবাবু আমাকে ইশারায় জানালেন, সরে পড়ো। ফিরে এলুম স্বগৃহে। মুকু ভীষণ ভেঙে পড়েছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে, চিরকুটে কী লেখা ছিল?
আর জেনে কী হবে?
আমার ওপর রাগ করেছ? তোমাদের ব্যাপারে নাক গলিয়েছি বলে? রাগ করিনি মুকু।
আমার ভীষণ অভিমান হয়েছে একজনের ওপর, তিনি হলেন আমার পিতা। তিনি যদি আমাকে পরিত্যাগই করবেন ভেবেছিলেন, তা হলে সেই শৈশবেই ফুটপাথে বসিয়ে দিয়ে এলেই পারতেন! জীবনটা ভিখিরি হয়েই শুরু করতুম। তার নিজের অতীতটাও কেন আমার ঘাড়ে চাপিয়ে গেলেন। আমার অতীত আমিই তৈরি করে নিতুম। এই বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে আমার। কোনও ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।
মুকু ছলছলে চোখে বললে, তোমার ভবিষ্যৎ থেকে আমি নিজেই সরে দাঁড়াতে চাই। মনে হয় । আমি একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলছি।
দিদি আমাদের একটা জবরদস্ত আঘাত দিয়ে গেলেন। ওই হারটা চোরাই নয়। ওটা দিদিরই। হার। গগনের গ্রাস থেকে বাঁচাবার জন্যে ময়দার তালের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। চিরকুটে সব লিখে দিয়ে গেছেন। চিরকুটে আছে, হারটা আমি মুকুকে দিয়ে গেলুম, বিয়ের উপহার। সেই হার এখন পুলিশের গ্রাসে। আমাদেরই পাকামোর ফল। নিজেকে সবজান্তা ভাবা উচিত নয়। সবসময় ইনটিউশন কাজে লাগে না। অহংকার বেড়ে যায়। মাঝখান থেকে কপর্দকশূন্য হয়ে গেলুম। পাঁচ-পাঁচ হাজার টাকা হাওয়া হয়ে গেল। তোমার কাছে ধার হয়ে গেল দেড় হাজার। তা ছাড়া এই আশ্রয়টুকুও গেল। এ বাড়িতে থাকব কেমন করে? কেবলই মনে পড়ে যাবে একটা মৃতদেহ ঝুলছে। কেবলই শুনতে পাব পায়ের শব্দ, একটা গলার আওয়াজ। ওপরে উঠে আসার সময় তিনি আমাকে করুণ গলায় বলেছিলেন, পিন্টু, আমি তো তোমার আশ্রয়ে এসেছিলুম। বড় বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে। গেছে মুকু। নিজেকে দৈবশক্তির অধিকারী ভাবলে এই হয়! ঠাস করে গালে এক চড় মেরে ভগবান উচিত শিক্ষা দিয়ে যান!
মুকু আমার হাতদুটো ধরে বললে, ক্ষমা করে দাও। আজই আমি চলে যাচ্ছি।
ভীষণ রাগ হয়ে গেল। রণে ভঙ্গ দেওয়াটাই সহজ কাজ। বললুম, তা তো যাবেই। সব লন্ডভন্ড। করে দিয়ে চলে যাওয়াটাই সহজ কাজ, বুদ্ধিমানের কাজ। এক মুহূর্তও সময় লাগে না। তোমার যা মন চায় তাই করো, আমি এখন ব্যাঙ্কে যাই। এ বাড়িতে তো আর হাঁড়ি চাপবে না। কাগজপত্র নিয়ে নেমে এলুম পথে। গলগলে রাস্তা রোদে ভাসছে। সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছে চোখে প্রশ্ন নিয়ে। রাষ্ট্র হতে আর বাকি নেই। মাননীয় হরিশঙ্কর। ততোধিক মাননীয় তার পিতা। ঊনবিংশ শতকের নামী এক শিক্ষাবিদ। সুপণ্ডিত। সুলেখক। সাধকোপম এক চরিত্র। সেই বাড়িতে বিধবা রমণীর আত্মহত্যা! সেই বাড়িতে পুলিশ! আমার মনে হচ্ছে মাথায় ঘোমটা দিয়ে হাঁটি। একটা মানুষ নয়, পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে মানুষের একটা খোলস। মন না মতিভ্রম! কবিতা আর রোমান্টিক উপন্যাস পড়ে প্রেমিক হতে চেয়েছিলে জানোয়ার! শ্রীরাধার সন্ধানে কলির কেষ্ট! রাসলীলা হচ্ছিল। এইবার তুমি মরো। তোমার মানসম্মান পথের ধুলোয় লুটোতে লুটোতে যাক। এ তো বিবস্ত্র হয়ে যাবার মতোই একটা ঘটনা।
